Image description

নিয়াজ মাহমুদ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন কিছু বাক্য আছে, যেগুলো শুনতে যতটা আশাব্যঞ্জক, বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা ততটাই দুর্লভ। ‘মিথ্যা মামলায় কাউকে হয়রানি করা যাবে না’—প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে নির্দেশনা দিয়েছেন। তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের মাধ্যমে প্রকাশিত এই বার্তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কারণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় মামলা, গ্রেপ্তার, হয়রানি এবং আইনের অপব্যবহারের অভিযোগ নতুন কিছু নয়। বরং ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে এসব অভিযোগের পুনরাবৃত্তিই যেন আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে।

 

তাই সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে যখন বলা হয় যে, সুনির্দিষ্ট অপরাধ ছাড়া কাউকে মিথ্যা অভিযোগে হয়রানি করা হবে না, তখন সেটি অবশ্যই স্বাগত জানানোর মতো বক্তব্য। কিন্তু একইসঙ্গে প্রশ্নও উঠে আসে, এই নির্দেশনা কি কেবল একটি রাজনৈতিক বার্তা, নাকি এটি প্রশাসনিক ও বিচারিক বাস্তবতায়ও প্রতিফলিত হবে?

গণতন্ত্রের সৌন্দর্য কেবল নির্বাচনে নয়; গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি প্রকাশ পায় রাষ্ট্র তার বিরোধীদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে, সংখ্যালঘুদের কতটা নিরাপত্তা দেয়, ভিন্নমতকে কতটা সহ্য করে এবং আইনের শাসনকে কতটা নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ করে, তার মাধ্যমে। রাষ্ট্র যদি কেবল সমর্থকদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে, আর বিরোধীদের জন্য ভিন্ন মানদণ্ড প্রয়োগ করে, তাহলে সেটি গণতন্ত্রের চেহারা ধারণ করলেও তার ভেতরে গণতান্ত্রিক চেতনা থাকে না।

তথ্যমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেছেন, “এই প্রথম সাংবাদিকরা নিয়ন্ত্রণবিহীনভাবে সাংবাদিকতা করেছেন, সরকারি কোনো মহল থেকে চাপ ছিল না।” এটি একটি বড় দাবি। যদি বাস্তবতাও সত্যিই এমন হয়ে থাকে, তাহলে তা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। কারণ স্বাধীন সাংবাদিকতা কোনো সরকারের দয়া নয়; এটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা মানে সরকারবিরোধী সংবাদ প্রকাশের সুযোগ, ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা।

তবে স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রকৃত মূল্যায়ন হয় সংকটের মুহূর্তে। যখন কোনো সাংবাদিক দুর্নীতি উন্মোচন করেন, কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তথ্য প্রকাশ করেন, কিংবা সরকারের কোনো সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন, তখন রাষ্ট্রের আচরণই নির্ধারণ করে সংবাদমাধ্যম কতটা স্বাধীন।

এখানেই আসে আদ-দ্বীন হাসপাতালে সাংবাদিকদের ওপর হামলার প্রসঙ্গ। তথ্যমন্ত্রী বলেছেন, তিনি ঘটনাটি বিস্তারিত জানেন না। এটি একটি সতর্ক প্রতিক্রিয়া, কিন্তু একইসঙ্গে একটি প্রশ্নও তৈরি করে। সাংবাদিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি কি রাষ্ট্রের জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে? কারণ সংবাদকর্মীদের ওপর হামলা কেবল একজন ব্যক্তির ওপর আক্রমণ নয়; এটি জনগণের জানার অধিকারের ওপরও আঘাত।

বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে সাংবাদিকদের নিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। কারণ তারা রাষ্ট্র ও সমাজের আয়না। সেই আয়না ভেঙে দিলে বাস্তবতাও আড়াল হয়ে যায়। ফলে সাংবাদিকদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি গণতন্ত্র রক্ষারও পূর্বশর্ত।

তথ্যমন্ত্রীর আরেকটি বক্তব্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন, লাইভ সম্প্রচার যত বাড়বে ততই ভালো, কারণ এতে জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পায়। এই মন্তব্য নিঃসন্দেহে আধুনিক গণতান্ত্রিক চিন্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রযুক্তির যুগে তথ্য নিয়ন্ত্রণের পুরনো পদ্ধতি আর কার্যকর নয়। মানুষ এখন সরাসরি দেখতে চায়, শুনতে চায় এবং নিজের বিচার নিজেই করতে চায়। লাইভ সম্প্রচার সেই সুযোগ তৈরি করে।

কিন্তু এখানেও একটি বাস্তবতা রয়েছে। শুধু লাইভ সম্প্রচার বাড়লেই জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হয় না। জবাবদিহিতা তখনই কার্যকর হয়, যখন তথ্য প্রকাশের পর দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবস্থা গ্রহণ করে। দুর্নীতির খবর প্রচারিত হওয়ার পরও যদি তদন্ত না হয়, ক্ষমতার অপব্যবহারের তথ্য প্রকাশের পরও যদি বিচার না হয়, তাহলে তথ্যের প্রবাহ বাড়লেও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হয় না।

বাংলাদেশ বর্তমানে একটি পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংঘাত, দমন-পীড়ন, প্রতিশোধমূলক রাজনীতি এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে একটি দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন সরকার যদি সত্যিই আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দিতে চায়, তাহলে তাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে কথাকে কাজে রূপান্তর করা।

মিথ্যা মামলা বন্ধ করার ঘোষণা সহজ। কিন্তু প্রশাসনের নিচের স্তরে, থানায়, তদন্ত সংস্থায় এবং আদালতপাড়ায় সেই নির্দেশনার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা অনেক কঠিন। কারণ রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারিত হয় না কেবল প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে; নির্ধারিত হয় একজন সাধারণ নাগরিক থানায় গেলে কী আচরণ পান, একজন সাংবাদিক তথ্য চাইলে কী উত্তর পান, কিংবা একজন বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী তার সাংবিধানিক অধিকার কতটা ভোগ করতে পারেন, তার মাধ্যমে।

এখানে সরকারের জন্য একটি বড় সুযোগও রয়েছে। যদি তারা সত্যিই প্রমাণ করতে পারে যে আইন সবার জন্য সমান, যদি রাজনৈতিক পরিচয় নয় বরং প্রমাণ ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যদি বিরোধী মতকে শত্রু নয় বরং গণতান্ত্রিক অংশীদার হিসেবে দেখা হয়, তাহলে সেটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।

জনগণ এখন আর শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না; তারা ফলাফল দেখতে চায়। তারা দেখতে চায় মিথ্যা মামলায় কেউ হয়রানির শিকার হচ্ছেন কি না। তারা দেখতে চায় সাংবাদিকরা ভয়মুক্তভাবে কাজ করতে পারছেন কি না। তারা দেখতে চায় রাষ্ট্রের সমালোচনা করলেও নাগরিকের অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকে কি না।

গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য এখানেই—রাষ্ট্র তার সমর্থকদের নয়, বরং সকল নাগরিকের রাষ্ট্র হয়ে ওঠে। ধর্ম, বর্ণ, মতাদর্শ কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে যখন সবাই সমান অধিকার ও মর্যাদা পায়, তখনই গণতন্ত্র অর্থবহ হয়।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা তাই নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক সূচনা। কিন্তু ইতিহাস শেষ পর্যন্ত বক্তব্যকে নয়, বাস্তবতাকে স্মরণ রাখে। জনগণও এখন সেই বাস্তবতার অপেক্ষায়।

মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের একটি বিখ্যাত উক্তি এখানে প্রাসঙ্গিক “A government that is afraid of criticism cannot survive for long, because criticism is necessary to correct mistakes.” অর্থাৎ, “যে সরকার সমালোচনাকে ভয় পায়, সে দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না; কারণ ভুল সংশোধনের জন্য সমালোচনা অপরিহার্য।”

বাংলাদেশের গণতন্ত্রও আজ সেই পরীক্ষার মুখোমুখি, সমালোচনাকে কতটা স্থান দেয়া হয়, বিরোধী কণ্ঠকে কতটা সম্মান করা হয় এবং আইনের শাসন কতটা নিরপেক্ষভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে ভবিষ্যতের পথচলা।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট