Image description

তানজিলা আফসানা

স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক পরও বাংলাদেশের রাজনীতি সংঘর্ষমুখী ও প্রতিহিংসামূলক কেন। কিন্তু আজ শুধু সাধারণ মানুষের নয়, বরং সচেতন নাগরিক, সমাজ বিশ্লেষক এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবা তরুণ প্রজন্মের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক জিজ্ঞাসা। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যপটের চরিত্র ও দলের নামগুলো বদলে যায় ঠিকই; কিন্তু মাঠের সহিংসতা আর প্রতিপক্ষকে দমন করার প্রবণতার কোনো পরিবর্তন হয় না।

যে দল যখনই ক্ষমতায় আসে, তারা বিরোধী দলকে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার এক অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখার পরিবর্তে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে। অন্যদিকে অনেক সময় মনে হয় বিরোধী দলগুলোর একমাত্র লক্ষ্য হলো ক্ষমতাসীনদের সব কাজের ভুল ধরা এবং যেকোনো সিদ্ধান্তের ঢালাও সমালোচনা করা। গঠনমূলক বিকল্প প্রস্তাব না দিয়ে শুধু ‘বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা’ করার এই সংস্কৃতি চলছেই। ফলে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সুস্থ নীতিভিত্তিক বিতর্কের টেবিল থেকে ছিটকে গিয়ে আছড়ে পড়ে মাঠের মারমুখী সংঘাত, পেশিশক্তি আর অস্ত্রের মহড়ায়। এটি কোনো সাময়িক রাজনৈতিক অস্থিরতা নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের রক্তে মিশে থাকা এক পদ্ধতিগত সংকটের বহিঃপ্রকাশ।

রাজনৈতিক সংস্কৃতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—জনগণের একটি বড় অংশের আচরণও অনেক সময় রাজনীতির এই সংঘর্ষমুখী চরিত্রকে আরও জটিল করে তোলে। প্রায়ই দেখা যায়, যে দলটি ক্ষমতায় থাকে, ক্ষমতা হারিয়ে বিরোধী দলে গেলে তখন তাদের অতীত কর্মকাণ্ডের সমালোচনায়ই অনেকে বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠে। সমালোচনা অবশ্যই গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ; কিন্তু যখন তা গঠনমূলক না হয়ে প্রতিহিংসাপ্রবণ বা একপেশে হয়ে যায়, তখন সেটি সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।

এ প্রবণতার ফলে একটি ‘অবিশ্বাসের চক্র’ তৈরি হয়। ক্ষমতায় থাকা দলটি বুঝতে পারে, আজ তারা যা-ই করুক, আগামীতে বিরোধী দলে গেলে সেটিকেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হতে পারে। ফলে অনেক সময় তারা এমন সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাগ্রস্ত হয়, যেগুলো হয়তো দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য প্রয়োজনীয়, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। অর্থাৎ ভবিষ্যতের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার ভয়ে বর্তমান সরকার অনেক ক্ষেত্রে সাহসী বা সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিতে পিছিয়ে যায়।

এখানে শুধু রাজনৈতিক দল নয়, সমর্থকগোষ্ঠী এবং সাধারণ নাগরিকদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। যখন সমর্থন অন্ধ আনুগত্যে পরিণত হয় এবং সমালোচনা হয় সম্পূর্ণ দলকেন্দ্রিক, তখন বাস্তব মূল্যায়নের জায়গাটি সংকুচিত হয়ে পড়ে। এতে ভালো কাজও অনেক সময় স্বীকৃতি পায় না, আবার ভুলগুলোও নিরপেক্ষভাবে সংশোধনের সুযোগ পায় না।

ফলে একটি ভারসাম্যহীন পরিস্থিতি তৈরি হয়। যেখানে ক্ষমতায় থাকলে চাপ, আর বিরোধী দলে গেলে প্রতিশোধের আশঙ্কা। এই চক্র ভাঙতে হলে প্রয়োজন আরও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণ, পাশাপাশি নাগরিকদের মধ্যেও সমালোচনার সংস্কৃতি গড়ে তোলা—যেখানে সমালোচনা হবে তথ্যভিত্তিক, গঠনমূলক এবং জনস্বার্থকেন্দ্রিক। অন্যথায় এই পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতি দেশের নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়াকে বারবার বাধাগ্রস্ত করবে, আর দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক কাঠামোকেও দুর্বল করে দেবে।

এই অন্তহীন বৈরিতার গভীরে মনস্তাত্ত্বিক চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে এক অদ্ভুত ‘শূন্য-সম’ বা ‘জিরো-সাম’ (Zero-Sum Game) মানসিকতা, যেখানে ধারণা করা হয়—এক পক্ষের রাজনৈতিক জয় মানে অন্য পক্ষের সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিনাশ। এই মনস্তত্ত্বের কারণে ক্ষমতার বিন্দুমাত্র অংশীদারিত্ব, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ বা পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের জায়গা তৈরি হতে পারে না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এখানে শুধু শাসনকাজ পরিচালনা বা জনকল্যাণের দায়িত্ব নয়; বরং তা অর্থনৈতিক সুযোগের একচ্ছত্র বণ্টন, সামাজিক আধিপত্য এবং সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার এক আইনি লাইসেন্স। এই ব্যবস্থায় ক্ষমতার বাইরে থাকা মানেই সব রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং এক চরম অনিরাপত্তার মুখোমুখি হওয়া। ফলে ক্ষমতা হারানোর ভয় যেমন রাজনৈতিক দলগুলোকে মরিয়া ও কঠোর করে তোলে, তেমনি যেকোনো মূল্যে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার বা তা দখলের তাড়নাও তীব্র ও সহিংস রূপ নেয়।

এই মরণপণ লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় বলি হতে হয় রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, আমলাতন্ত্র ও বিচারব্যবস্থার মতো স্বাধীন ও ভারসাম্য রক্ষাকারী স্তম্ভগুলোকে। রাজনৈতিক শক্তির অতিকেন্দ্রীকরণের ফলে যখনই এসব প্রতিষ্ঠান দলীয় প্রভাবের ছায়াতলে চলে যায়, তখন রাষ্ট্রের আইনি কাঠামো ও সাংবিধানিক ক্ষমতা হয়ে ওঠে বিরোধী মত ও ভিন্ন রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর দমনের সবচেয়ে সহজ হাতিয়ার। আর এভাবেই বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ক্ষেত্রে জুলুম, নির্যাতন, কোনো কোনো সময় জেলের দরজা উন্মুক্ত হয়; যা দীর্ঘমেয়াদে সমাজে এক গভীর রাজনৈতিক আস্থাহীনতা, আইনিব্যবস্থার প্রতি অনীহা এবং এক ভয়াবহ প্রতিশোধের সংস্কৃতির জন্ম দেয়। এক সরকারের আমলের নিপীড়ন অন্য সরকারের আমলে প্রতিশোধ নেওয়ার যৌক্তিকতা হিসেবে ব্যবহৃত হয়, ফলে এই চক্র চলতেই থাকে।

এই দমবন্ধকর পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যখন তরুণ প্রজন্মের উত্থান বা নতুন নেতৃত্বের কথা ওঠে, তখন স্বাভাবিকভাবেই সমাজমনসে আশা আর আশঙ্কার এক তীব্র দোলাচল তৈরি হয়। প্রচলিত একটি সরল বিশ্বাস রয়েছে যে, নতুন রক্ত বা তরুণ নেতৃত্ব হয়তো এই পুরনো জঞ্জাল সাফ করে এক নতুন যুগের সূচনা করবে। কিন্তু রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলে, রাজনৈতিক বাস্তবতা অত্যন্ত জটিল, প্রাতিষ্ঠানিক এবং কাঠামোগত। যদি কোনো ব্যবস্থার মূল প্রণালি, রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং সংস্কৃতির আমূল সংস্কার না করা হয়, তবে সেখানে শুধু বয়সের দিক থেকে তরুণ কোনো নেতৃত্ব এলেও তারা দীর্ঘদিনের চেনা স্রোতেই গা ভাসাতে বাধ্য হয়।

দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের চরম অভাব, ‘হাইকমান্ড’ সংস্কৃতির মাধ্যমে নেতৃত্বের অতিকেন্দ্রীকরণ এবং অন্ধ ব্যক্তিত্বপূজা ও প্রশ্নহীন আনুগত্যের যে সংস্কৃতি বছরের পর বছর ধরে লালন করা হয়েছে, তার প্রাতিষ্ঠানিক চাপ এতটাই শক্তিশালী যে অনেক সম্ভাবনাময় তরুণ নেতাও শেষ পর্যন্ত এই ঘূর্ণিপাকে পড়ে পুরনো ধারারই হিংসাত্মক ও বিভাজনের রাজনীতির হাতিয়ারে পরিণত হন। অর্থাৎ ব্যবস্থার পরিবর্তন না হলে শুধু ব্যক্তির পরিবর্তন রাজনীতির ভেতরের হিংসাত্মক চরিত্রটিকে বদলাতে পারে না।

তাহলে কি বাংলাদেশের রাজনীতি চিরকাল এমন এক অন্ধকার ও অন্তহীন চক্রেই আটকে থাকবে? ইতিহাস কিন্তু এই চূড়ান্ত হতাশার কথা বলে না। রাজনীতি কোনো জড়ো বস্তু বা অপরিবর্তনীয় ঐশ্বরিক লিপি নয়; এটি মানবঘটিত সামাজিক সম্পর্কের একটি গতিশীল রূপ, যা পরিবর্তনশীল। তবে এই পরিবর্তনের ধারা কোনো জাদুমন্ত্রে, রাতারাতি কোনো আকস্মিক বিপ্লবে বা কোনো অলৌকিক বীরের আগমনে স্থায়ী রূপ পায় না।

ইতিহাস তখনই স্থায়ীভাবে মোড় নেয়, যখন দীর্ঘমেয়াদি সহনশীলতার চর্চা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত সংস্কার এবং গণমানুষের সচেতনতা একবিন্দুতে এসে মেলে। তরুণ নেতৃত্ব যদি সত্যি কোনো ভিন্ন ভবিষ্যৎ উপহার দিতে চায়, তবে তাদের শুধু ক্ষমতার চেয়ার দখল বা দলীয় উত্তরাধিকার টিকিয়ে রাখার জন্য নয়, বরং রাজনৈতিক চিন্তা ও সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তনের মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে নামতে হবে। মতভেদ ও ভিন্নমতকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা বা শত্রুতা না ভেবে গণতন্ত্রের স্বাভাবিক ও সুন্দর চালিকাশক্তি হিসেবে গ্রহণ করা, মাঠের সহিংসতার বিপরীতে প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপকে রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তোলা এবং ব্যক্তিস্বার্থ বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে আইনের শাসন ও বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার মাধ্যমেই শুধু এই চিরস্থায়ী প্রতিশোধের রাজনীতিকে বিদায় দেওয়া সম্ভব। তাই রাজনীতি এমনই থাকবে কি না, সেই চিন্তায় স্থবির বা হতাশ না হয়ে, কীভাবে আমরা আমাদের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী, স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক করে গড়ে তুলতে পারি—সেই সুনির্দিষ্ট কাঠামোগত সংস্কারের সম্মিলিত উদ্যোগের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এই ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার আসল চাবিকাঠি।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী