Image description

 মন্‌জুরুল ইসলাম

আমাদের সমাজ এখন নানা রকম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি পরিবারে কান পাতলেই শোনা যায় নানান হাসিকান্নার কাহিনি।

হাসিটা অনেক ক্ষেত্রেই মেকি। ভিতরে চলছে সম্পর্কের অদৃশ্য টানাপোড়েন।
 
অনেক ঘটনা আছে যা সমাজকে ভিতর থেকে ভেঙেচুরে তছনছ,  দুর্বল করে দিচ্ছে। ঠিক যেন ক্ষয়ে যাওয়া হাড়ের মতো অবস্থা।

বউ-শাশুড়ির সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। যে ছেলে একসময় মায়ের হাতে ছাড়া খাবার খেত না, সে এখন মাকে দেখার সময় পায় না।

যে আদরের মেয়েটি উচ্চশিক্ষার জন্য উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী হয়েছেন, তার হাতে জ্বলন্ত সিগারেট! বন্ধুদের আড্ডায় অথবা জমজমাট পার্টিতে হাতে তুলে নিচ্ছেন নেশার পানীয়। মেধাবী ছেলে-মেয়ে বুঁদ হয়ে থাকছেন মাদকে, অনলাইন জুয়া বা আরও ভয়ংকর কিছুর পেছনে ছুটে শেষ হয়ে যাচ্ছেন। ভিন্ন ধর্মের বন্ধুকে বিয়ে করে পরিবার-স্বজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছেন। বাবা-মাও সন্তানকে শাসন করার সাহস হারিয়ে ফেলছেন।

যে যুবক সংসারে সচ্ছলতার জন্য ঋণ করে স্বপ্নের প্রবাসে রওনা হচ্ছেন, তাঁদের কারও লাশ পাওয়া যাচ্ছে সাগরে অথবা গহিন জঙ্গলে। নিঃস্ব হচ্ছে পরিবার। যাঁরা সঠিকভাবে যেতে পারেন, তাঁরা যখন ফিরে আসেন এসে দেখেন তাঁরা ইতোমধ্যে নিঃস্ব হয়েছেন। কেউ হারান বাবা, কেউবা মা। কখনো আবার বিদেশ থেকে পাঠানো কষ্টের টাকাপয়সা নিয়ে অন্যের হাত ধরে পালিয়ে যান স্ত্রী। উচ্চশিক্ষিত কর্মজীবী নারীদেরও নানান সমস্যা। কেউ ভুগছেন ফার্টিলিটি সমস্যায়, কেউবা সন্তান লালনপালনের দুশ্চিন্তায়। আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ডিভোর্স। মহামারির মতো বাড়ছে পরকীয়া। লিভ ইন রিলেশনশিপও বাড়ছে। ব্যক্তিগত সুন্দর জীবনকে মোবাইল ফোনের ভার্চুয়াল জীবন তিলে তিলে গ্রাস করছে। কেউ কারও মঙ্গল কামনা করছে না। প্রিয় বন্ধুটি ভয়ংকর শত্রুতে পরিণত হচ্ছে। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক নানান সংকট ও স্বল্প সময়ে ধনী হওয়ার প্রতিযোগিতা, বেকারত্ব, হতাশায় মারামারি-হানাহানি-খুনাখুনি তো নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। কাউকে গলা কেটে হত্যা করা হচ্ছে, কেউবা আত্মহত্যা করছেন। শিশু রামিসাকে গলা কেটে হত্যার ঘটনা সবাইকে শোকাহত করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষকরাও এখন শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ পিতৃতুল্য স্থান ধরে রাখতে পারছেন না। রাষ্ট্র থেকে পরিবার কোথাও মূল্যবোধ ও আদর্শ নেই।

বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থাকে সাধারণভাবে রক্ষণশীল বলা হয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহাসিক, ধর্মীয়, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট। হাজার বছরের সামাজিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলের মানুষ পরিবার, ধর্ম, প্রথা ও সামাজিক নিয়মকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। ফলে আধুনিকতার নানান প্রভাব এলেও সমাজের গভীরে এখনো রক্ষণশীলতার শক্ত ভিত্তি বিদ্যমান। বাংলার প্রাচীন সমাজ মূলত কৃষিনির্ভর ছিল। গ্রামকেন্দ্রিক ওই সমাজে মানুষের জীবন আবর্তিত হতো জমি, পরিবার ও ধর্মীয় আচার ঘিরে। কৃষিভিত্তিক সমাজে স্থিতিশীলতা ও সামাজিক শৃঙ্খলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় মানুষ পরিবর্তনের চেয়ে প্রচলিত রীতিনীতি অনুসরণ করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করত। পরিবার ছিল সামাজিক জীবনের কেন্দ্র। বয়োজ্যেষ্ঠদের সিদ্ধান্ত মেনে চলা, পারিবারিক সম্মান রক্ষা এবং সামাজিক মর্যাদা বজায় রাখা ছিল গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধ।

মধ্যযুগে মুসলিম শাসনের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বাংলার সমাজে ইসলামি সংস্কৃতির গভীর প্রভাব পড়ে। একই সঙ্গে হিন্দু সম্প্রদায়ের বর্ণভিত্তিক রীতিনীতিও সমাজে প্রভাবশালী ছিল। ফলে ধর্মীয় মূল্যবোধ সামাজিক আচরণের প্রধান নিয়ামক হয়ে ওঠে। পোশাক, নারী-পুরুষ সম্পর্ক, বিয়ে, উৎসব কিংবা পারিবারিক সিদ্ধান্ত সবকিছুতেই ধর্মীয় ও সামাজিক নিয়মের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। এ ধারাটি পরবর্তীকালে ঔপনিবেশিক সময়েও বহুলাংশে বজায় থাকে। ব্রিটিশ শাসনামলে পাশ্চাত্য শিক্ষা ও আধুনিক চিন্তার বিস্তার ঘটলেও তা মূলত শহর ও শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। গ্রামীণ বৃহৎ জনগোষ্ঠী তখনো ঐতিহ্যনির্ভর জীবনধারায় অভ্যস্ত ছিল। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে সমাজে আধুনিকতা প্রবেশ করলেও রক্ষণশীল সামাজিক কাঠামো পুরোপুরি ভাঙেনি।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে ধর্মীয় পরিচয় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থা ইসলামি পরিচয়কে রাজনৈতিক ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে। এর প্রভাব সমাজজীবনেও পড়ে। যদিও বাঙালি জাতীয়তাবাদ পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দেয়। তবু সামাজিক বাস্তবতায় ধর্মীয় মূল্যবোধ ও পারিবারিক রক্ষণশীলতা বহুলাংশে অটুট থাকে। স্বাধীনতার পর নগরায়ণ, শিক্ষার বিস্তার, নারীর কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ এবং বিশ্বায়নের কারণে সমাজে পরিবর্তন এসেছে। বিশেষত তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ব্যক্তিস্বাধীনতা, নারী অধিকার ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে পরিবারকেন্দ্রিকতা, সামাজিক লজ্জা-ভীতি, ধর্মীয় আবেগ এবং লোকসমাজের চাপ এখনো শক্তিশালী। ফলে বাংলাদেশের সমাজে এক ধরনের দ্বৈত বাস্তবতা দেখা যায়। একদিকে আধুনিকতার আকাক্সক্ষা, অন্যদিকে ঐতিহ্য রক্ষার প্রবণতা। দেশের সমাজব্যবস্থা রক্ষণশীল হওয়ার পেছনে শুধু ধর্ম নয়, বরং কৃষিভিত্তিক ঐতিহ্য, পরিবারকেন্দ্রিক সংস্কৃতি, ঔপনিবেশিক ইতিহাস, রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং সামাজিক নিরাপত্তাবোধ সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাব কাজ করেছে। বাংলাদেশের রক্ষণশীলতার আরেকটি কারণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তাবোধ। দীর্ঘদিনের দারিদ্র্য, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সামাজিক অস্থিরতার মধ্যে মানুষ পরিবার ও ধর্মকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে দেখেছে। তাই প্রচলিত মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুতি অনেক সময় সামাজিক ঝুঁঁকি হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে এ রক্ষণশীলতা স্থির নয়; সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজে পরিবর্তন ঘটছে এবং ভবিষ্যতেও ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মধ্যে এক ধরনের সমন্বয় তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

পরিবারে তবে সমাজ আজ এক অদ্ভুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাইরে থেকে সমাজকে এখনো দৃঢ় ও ঐতিহ্যনির্ভর মনে হলেও ভিতরে নানান সংকট তাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। পরিবার, মূল্যবোধ, সামাজিক আস্থা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের যে ভিত্তির ওপর সমাজ দাঁড়িয়ে থাকে সেই ভিত্তিগুলো ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। ফলে সমাজ যেন নীরবে ভেঙে যাচ্ছে ভিতর থেকেই। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে পরিবারব্যবস্থায়। একসময় যৌথ পরিবার ছিল সামাজিক নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি। এখন নগরায়ণ, অর্থনৈতিক চাপ এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনের কারণে পরিবার ছোট হয়ে গেছে। বাবা-মা, সন্তান কিংবা ভাই-বোনের মধ্যকার সম্পর্কেও দূরত্ব তৈরি হয়েছে। একই ছাদের নিচে থেকেও অনেক মানুষ মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন। পারিবারিক সংলাপ কমে গেছে, বেড়েছে একাকিত্ব। প্রযুক্তি ও সমাজমাধ্যমও সমাজ পরিবর্তনের বড় কারণ। মানুষ এখন বাস্তব সম্পর্কের চেয়ে ভার্চুয়াল জগতে বেশি সময় কাটায়। ফলে পারস্পরিক সহমর্মিতা ও মানবিক যোগাযোগ দুর্বল হচ্ছে। সমাজমাধ্যমে গালাগালি, বিদ্বেষ, অপমান ও বিভাজনের সংস্কৃতি স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। মতভেদকে এখন অনেক সময় শত্রুতা হিসেবে দেখা হয়। এতে সমাজে সহনশীলতা কমছে এবং মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে। অর্থনৈতিক বৈষম্যও সমাজ ভাঙনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। একদিকে অল্প কিছু মানুষের সম্পদ বিপুলভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে অনেক মানুষ জীবিকার অনিশ্চয়তায় ভুগছে। এ বৈষম্য থেকে জন্ম নিচ্ছে হতাশা, ক্ষোভ ও সামাজিক অসন্তোষ। যখন মানুষ দেখে পরিশ্রমের চেয়ে ক্ষমতা, দুর্নীতি বা প্রভাব বেশি কার্যকর তখন নৈতিকতার ওপর আস্থা কমে যায়।

রাজনৈতিক বিভাজনও সমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। ভিন্ন রাজনৈতিক মতের মানুষকে প্রতিপক্ষ নয়, অনেক সময় শত্রু হিসেবে দেখার প্রবণতা বেড়েছে। এর প্রভাব পরিবার, বন্ধুত্ব ও সামাজিক সম্পর্কেও পড়ছে। নষ্ট হচ্ছে পারস্পরিক সম্পর্ক। সমাজে যুক্তির চেয়ে আবেগ এবং সহনশীলতার চেয়ে প্রতিশোধের মনোভাব শক্তিশালী হলে সামাজিক ঐক্য দুর্বল হয়ে পড়ে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মূল্যবোধের সংকট। সততা, শ্রদ্ধাবোধ, সামাজিক দায়িত্ব কিংবা নৈতিকতা এসব এখন আগের মতো সামাজিক চর্চার কেন্দ্র নয়। দ্রুত সফল হওয়ার প্রবণতা অনেককে শর্টকাট পথের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে দুর্নীতি, প্রতারণা ও অসততা সামাজিকভাবে বিস্তার লাভ করছে। যখন সমাজে সৎমানুষের চেয়ে অসৎ ও চতুর মানুষকে বেশি সফল বলে মনে হয় তখন তরুণ প্রজন্মও বিভ্রান্ত হয়। সংস্কৃতিগত পরিবর্তনও ভিতরকার টানাপোড়েন বাড়াচ্ছে। বিশ্বায়নের ফলে নতুন চিন্তা ও জীবনধারা আসছে, যা স্বাভাবিক। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সমাজ প্রস্তুত না থাকায় পুরোনো মূল্যবোধ ও নতুন বাস্তবতার মধ্যে সংঘাত তৈরি হচ্ছে। তরুণ ও প্রবীণ প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যও এ সংকট বাড়িয়ে তুলছে। সমাজ হঠাৎ করে ভেঙে যায় না; ধীরে ধীরে তার ভিতরের বন্ধনগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। পরিবারে দূরত্ব, সামাজিক অসহিষ্ণুতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক বিভাজন, নৈতিক অবক্ষয় এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিচ্ছিন্নতা সব মিলিয়ে সমাজের ভিতরের শক্তি ক্ষয়ে যাচ্ছে। তবে সংকটের মধ্যেও সম্ভাবনা থাকে। যদি পরিবার, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধকে নতুনভাবে গুরুত্ব দেওয়া যায়, তবে সমাজ আবারও ভারসাম্য ও শক্তি ফিরে পেতে পারে।

সমাজব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ নয়; এটি রাষ্ট্র, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত দায়িত্ব। সমাজ তখনই স্থিতিশীল থাকে, যখন মানুষের মধ্যে নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা থাকে। বর্তমানে সেই জায়গাগুলো দুর্বল হয়ে পড়ায় সামাজিক অস্থিরতা বেড়েছে। তাই শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বহুমাত্রিক উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথমত পরিবারকে আবার সমাজ গঠনের প্রধান ভিত্তি হিসেবে শক্তিশালী করতে হবে। একটি শিশুর প্রথম শিক্ষা পরিবার থেকেই আসে। পরিবারে যদি সততা, শৃঙ্খলা, সহনশীলতা ও মানবিক আচরণের চর্চা থাকে তাহলে সমাজেও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক শুধু ভরণপোষণের নয়,  আদর্শ ও মূল্যবোধ গঠনের সম্পর্ক হওয়া জরুরি। দ্বিতীয়ত শিক্ষাব্যবস্থাকে শুধু পরীক্ষামুখী না করে নৈতিক ও নাগরিক শিক্ষাভিত্তিক করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা, সামাজিক দায়িত্ব, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং যুক্তিবোধের চর্চা বাড়ানো জরুরি। শুধু ভালো চাকরি পাওয়ার জন্য নয়, ভালো মানুষ গড়ার জন্যই শিক্ষা প্রয়োজন। তৃতীয়ত আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। সমাজে যখন মানুষ দেখে অপরাধ করেও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা পার পেয়ে যায়, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যেও আইন মানার প্রবণতা কমে যায়। আইনের প্রয়োগে বৈষম্য থাকলে সমাজে ক্ষোভ ও অবিশ্বাস তৈরি হয়। তাই রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থ বা ক্ষমতার বাইরে সবার জন্য সমান বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। চতুর্থত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সহনশীলতা ফিরিয়ে আনতে হবে। ভিন্নমতকে শত্রু মনে করার প্রবণতা সমাজকে বিভক্ত করে। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত ভাষা ও আচরণে সংযম দেখানো এবং প্রতিপক্ষের প্রতি ন্যূনতম সম্মান বজায় রাখা। কারণ রাজনৈতিক সংঘাত শেষ পর্যন্ত সমাজের ভিতরেই ছড়িয়ে পড়ে। স্বাধীন বাংলাদেশ জন্মের পর যতগুলো পট পরিবর্তন হয়েছে, যতগুলো আন্দোলন, সেনা অভ্যুত্থান, গণ অভ্যুত্থান হয়েছে সবই নানান সংকটের যেমন সমাধান দিয়েছে, তেমন নতুন সংকটের জন্মও দিয়েছে। পঞ্চমত সমাজমাধ্যম ব্যবহারে সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ বাড়াতে হবে। মিথ্যা তথ্য, অপপ্রচার, গালিগালাজ ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য সমাজে উত্তেজনা ও বিভাজন বাড়ায়। প্রযুক্তি যেন মানুষকে বিচ্ছিন্ন না করে বরং ইতিবাচক যোগাযোগের মাধ্যম হয়, সে সংস্কৃতি গড়ে তোলা দরকার। ষষ্ঠত অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। দীর্ঘদিন বঞ্চনা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা মানুষ সহজেই হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। কর্মসংস্থান, ন্যায্য মজুরি এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে সমাজে স্থিতি বাড়ে।

গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনেরও বড় ভূমিকা রয়েছে। সমাজে কেবল সংঘাত, উত্তেজনা ও বিভাজন নয়; ইতিবাচক উদাহরণ, মানবিকতা, সততা ও সামাজিক সংহতির গল্পও তুলে ধরা প্রয়োজন। সংস্কৃতি মানুষের মনন গঠন করে, তাই সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চা সমাজকে স্থিতিশীল করে।

সবশেষে, সমাজে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার মূল চাবিকাঠি হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও নৈতিক নেতৃত্ব। আইন দিয়ে মানুষকে সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে একটি সমাজকে টিকিয়ে রাখে মানুষের বিবেক, মূল্যবোধ ও পারস্পরিক আস্থা। তাই সমাজকে মানবিক করতে হলে শুধু রাষ্ট্র নয়, প্রতিটি নাগরিককেও নিজের অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ও মানবিক হতে হবে। পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। যার যা দায়িত্ব তা সততার সঙ্গে পালন করতে হবে। পরিবার বা সংসারের মধ্যেই খুঁজতে হবে সুখ। কারণ সমাজ ভাঙলে পরিবার ভাঙে। পরিবার ভাঙলে মানুষের হৃদয় ভাঙে।

♦ লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন