Image description

ব্যারিস্টার নাজির আহমদ

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্র তিনটি স্তম্ভের (pillar) উপর দাঁড়িয়ে আছে। আর সেই তিনটি স্তম্ভ হলো: আইন বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ। তিন স্তম্ভই একে অপরের পরিপূরক। কেউ কারো চেয়ে উপরে নয় বা নিচেও নয়। বস্তুত, লিখিত সংবিধান দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্রের কোনো বিভাগ অপর বিভাগ থেকে সার্বভৌম দাবি করতে পারে না। তিনটি স্তম্ভের কাজ ও দায়িত্ব সুস্পষ্ট ও আলাদা। প্রতিটি স্তম্ভ যেন স্বাধীন ও স্বতন্ত্রভাবে তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে পারে সেজন্য “Separation of Power” ধারণাটি রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আইনের জুরিস্প্রোডেন্সে উদ্ভব ঘটেছে। বাংলাদেশের সংবিধানেও এই ধারণাটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অনুচ্ছেদ ২২’-এ বলা হয়েছে “রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ হইতে বিচারবিভাগের পৃথকীকরণ রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন”। আবার কিছু কিছু কাজ তিনটি স্তম্ভের মধ্যে অধিক্রমণ (Overlap) হয়। তাই একে অন্যের উপর যেন অযাচিত হস্তক্ষেপ ও প্রভাব বিস্তার করতে না পারে সেজন্য “Check and Balance” এর থিউরির আবির্ভাব হয়েছে আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায়। আর সেই থিওরি অনুসারে বাংলাদেশের সংবিধানে নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগের কার্যাবলী, দায়িত্ব ও ক্ষমতা যথাক্রমে সংবিধানের চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ ভাগে পরিস্কার করে নির্ধারণ করে দেয়া আছে।

 

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সংসদ রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করবে, আইনের সংশোধন করবে। প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন করবে। তবে এগুলো করতে হবে সংবিধান মোতাবেক ও সংবিধানে বর্ণিত বিধানাবলীর আলোকে। সংবিধান বহির্ভূত বা সংবিধান অনুমোদন করে না এমন আইন প্রণয়ন করলে সংবিধানেরই বিধান অনুসারে (অনুচ্ছেদ ১০২) সুপ্রিম কোর্ট তা বাতিল (struck down) করতে পারে। অর্থাৎ জাতীয় সংসদ চাইলেই তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী যে কোনো আইন প্রণয়ন বা সংশোধন করতে পারবে না। সংসদের কাজ, দায়িত্ব, কর্তব্য ও অধিকার সংবিধান দ্বারা নির্ধারিত। এর বাইরে যাওয়ার এখতিয়ার সংসদের নেই।

সংবিধানের ৬৫(১) অনুচ্ছেদে সংসদের ক্ষমতা সুনির্দিষ্ট করা আছে। এতে বলা হয়েছে, “জাতীয় সংসদ নামে বাংলাদেশের একটি সংসদ থাকবে এবং এই সংবিধানের বিধানাবলী-সাপেক্ষে প্রজাতন্ত্রের আইন প্রণয়ন-ক্ষমতা সংসদের উপর ন্যস্ত হবে।” অর্থাৎ আইন প্রণয়নের ক্ষমতা ন্যস্ত হয়েছে সংবিধানের বিধানাবলী সাপেক্ষে। সুতরাং সংবিধান দ্বারা এমন সংরক্ষিত ও বিধিবদ্ধ স্তম্ভ বা বিভাগ সার্বভৌম হবে কি করে? জনগণ তাদের অন্তর্নিহিত ক্ষমতার অংশবিশেষ - তাদের স্বার্থ সংরক্ষণের লক্ষ্যে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা - সংসদের ওপর অর্পণ করেছে। পরিপূর্ণ ও স্থায়ী ক্ষমতা সংসদের কাছে তারা হস্তান্তর করেনি। তাই জনগণ ভোটের মাধ্যমে তাদের সার্বভৌমত্ব সংসদের কাছে হস্তান্তর করেছে বলা অবাস্তব ও অযৌক্তিক।

ব্লাকের ল’ ডিকশনারি অনুযায়ী, সার্বভৌমত্বের অর্থ সর্বোচ্চ (supreme), নিরঙ্কুশ (absolute), নিয়ন্ত্রণহীন (uncontrollable) ও সর্বময় (absolute) ক্ষমতা- নিরঙ্কুশভাবে শাসন করার অধিকার। Oxford Dictionary অনুযায়ী sovereign অর্থ হচ্ছে “possessing supreme or ultimate power” (অর্থাৎ “সর্বোচ্চ বা চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী”)। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের কাজ, দায়িত্ব ও ক্ষমতা কোনোভাবেই নিরংকুশ, নিয়ন্ত্রণহীন ও সর্বময় নয়। সংসদ কোনোভাবেই সর্বোচ্চ বা চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী নয়। বাংলাদেশে বহু উদাহরণ আছে, সাধারণ আইন তো বটেই দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাসকৃত সংবিধানের সংশোধনী (যেমন: পঞ্চম, সপ্তম, অষ্টম ও ত্রয়োদশ সংশোধনী) সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করেছে। সুপ্রিম কোর্ট একাধিক রায়ে বলেছে, সংসদ কোনোভাবেই সংবিধানের মৌলিক কাঠামো (basic structure) সংশোধন করতে পারবে না। বর্তমান সংসদ ভবিষ্যত সংসদের উপরও কোনোকিছু চাপিয়ে দিতে বা তাদেরকে বাধ্য করতে পারবে না। এমতাবস্থায়, সংসদ সার্বভৌম হয় কীভাবে?

অনেকে হয়তো দাবি করতে পারেন, সংসদ সংবিধানও সংশোধন করতে পারে, তাই সংসদই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী এবং এ জন্য সংসদে সার্বভৌম। এটিও একটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণা, কারণ সংবিধানের প্রদত্ত ক্ষমতা বলেই সংসদ তা করতে পারে। তাও সাংবিধানিক পদ্ধতি অনুসরণ করে। উদাহরণস্বরূপ, আমাদের সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে (যেমন, দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে) সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা সংসদকে দেয়া হয়েছে। সুতরাং লিখিত সংবিধানই সংসদের ক্ষমতার উৎস। আর লিখিত সংবিধান হচ্ছে জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তি।

‘পার্লামেন্টারি সোভ্রিনিটি’ (parliamentary sovereignty) বা সংসদীয় সার্বভৌমত্বের ধারণার উৎপত্তি হয় মূলত বৃটেনে। বৃটিশ সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও দার্শনিক A V Dicey তার “Introduction to the Law of the Constitution” গ্রন্থে ‘সংসদীয় সার্বভৌমত্ব’ ধারণার তত্ত্ব প্রথম উপস্থাপন করেন। বৃটেনে লিখিত সংবিধান নেই। লিখিত সংবিধান দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্রের একটি স্তম্ভের প্রধান “প্রধান বিচারপতি” পদও নেই বৃটেনে। এছাড়াও ঐতিহাসিকভাবে বৃটিশ পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ তথা হাউস অব লর্ডস অনেকটা বিচারালয়ের মতো কাজ করে আসছিল দীর্ঘদিন ধরে। তাই বৃটিশ পার্লামেন্ট একাধারে আইনসভা ও বিচারালয় (হাউস অব লর্ডস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিল। এমন প্রেক্ষাপটেই বৃটেনে সংসদীয় সার্বভৌমত্বের ধারণার উৎপত্তি হয়।

তবে বৃটেনে সংসদীয় সার্বভৌমত্বের ধারণা দিন দিন দুর্বল হয়ে আসছে। এমনকি Dicey নিজেও, যিনি এক অর্থে এ ধারণার জনক, সংসদের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার স্বীকৃতি দিয়েছেন- তিনি তার জীবদ্দশায় বৃটেনে গণভোট ব্যবহারের পক্ষে মতামত দিয়েছেন। অপরদিকে, দেড় দশক আগে বৃটেনের উচ্চকক্ষ থেকে বিচারবিভাগীয় কাজ সরিয়ে স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান তথা “ইউকে সুপ্রিম কোর্ট” প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এছাড়া বৃটেনে হাইকোর্ট পার্লামেন্টে পাসকৃত মূল আইন রহিত করতে না পারলেও, আইন পর্যালোচনার ক্ষেত্রে ‘জুডিশিয়াল রিভিউ’র মাধ্যমে উচ্চ আদালতের বিচারকদের জুডিশিয়াল একটিভিটিজমের কিছুটা সুযোগ রয়েছে। অপরদিকে, উচ্চ আদালত পার্লামেন্ট কর্তৃক পাসকৃত আইন আন্তর্জাতিক চুক্তি ও কনভেনশনের (যেমন European Convention on Human Rights) সাথে সামঞ্জস্য কি না তা দেখার মাধ্যমে কিছুটা হলেও সংসদীয় সার্বভৌমত্বের ধারণা দুর্বল করেছে। অলিখিত সংবিধানের রাষ্ট্র বৃটেনে সংসদীয় সার্বভৌমত্বের ধারণা সীমিতভাবে প্রযোজ্য হলেও, যে সব রাষ্ট্রে লিখিত সংবিধান রয়েছে, সেখানে এটি সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক ও অপ্রযোজ্য।

ভারতে সংসদ সার্বভৌম নয়। সেখানে বরং সংবিধানকে সুপ্রিম ও সার্বভৌম বলা হয়েছে। ১৯৬৪ সালে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রেরিত একটি রেফারেন্সের (AIR 1965 SC 745) পরিপ্রেক্ষিতে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ মতামত দিয়েছে এভাবে “… In a democratic country governed by a writen Constitution, it is the Constitution which is supreme and sovereign. Therefore, there can be no doubt that the sovereignty which can be claimed by the Parliament in England, cannot be claimed by any Legislature in India in the literal absolute sense” (অর্থাৎ “লিখিত সংবিধান দ্বারা শাসিত একটি গণতান্ত্রিক দেশে, সংবিধানই সর্বোচ্চ ও সার্বভৌম। অতএব, এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, ইংল্যান্ডের সংসদ যে সার্বভৌমত্ব দাবি করতে পারে, ভারতের কোনো আইনসভা আক্ষরিক ও নিরঙ্কুশ অর্থে তা দাবি করতে পারে না”)। ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলায় বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত বলেছে, সংসদ নয় বরং জনগণ হচ্ছে সার্বভৌম এবং সংবিধান হচ্ছে প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন (supreme law)।

বস্তুত: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান হচ্ছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। রাষ্ট্রের সব আইনের উপরে সংবিধানের অবস্থান, প্রাধান্য ও মর্যাদা। সংবিধানের অবস্থান সম্পর্কে সংবিধান নিজেই তা পরিষ্কার করেছে। সংবিধানের ৭(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে “জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোনো আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসমঞ্জস হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে”। সংবিধান হচ্ছে প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন (supreme law)। তবে সংবিধান সার্বভৌম নয়, কেননা সংবিধান সংশোধন করা যায় যেমন বাংলাদেশের সংবিধান ৫৫ বছরে ১৭ বার সংশোধন করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ২৫০ বছরে সংবিধান ২৭ বার সংশোধন হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রেও সংবিধান সার্বভৌম নয়। তবে Marbury V Madison 5 U.S. 137 (1803) মামলায় যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান হলো সুপ্রিম ল’।

শুধু সংশোধনীই নয় বরং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবিধান বাতিল হয়ে নতুন সংবিধান রচিতও হয়েছে এমন বহু উদাহরণ আছে। বিগত দুই শতাব্দীতে আনুমানিক ১২০ থেকে ১৩০টি দেশ অন্তত একবার তাদের সংবিধান সম্পূর্ণভাবে প্রতিস্থাপন বা পুনর্লিখন করেছে। ভেনিজুয়েলার ইতিহাসে ২৬ বার ভিন্ন সংবিধান এসেছে। মেক্সিকোতে একাধিক স্বতন্ত্র শাসন ব্যবস্থা (regime) এসেছে, প্রতিটি নতুন শাসন ব্যবস্থা পূর্ববর্তী সংবিধানকে প্রতিস্থাপন করেছে যথাক্রমে ১৮২৪, ১৮৫৭ এবং ১৯১৭ সালে। ফ্রান্স ১৭৮৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে ১৫ বার তার সংবিধান বাতিল, স্থগিত এবং সম্পূর্ণভাবে প্রতিস্থাপন করেছে। এই নাটকীয় পুনর্লিখনগুলি পাঁচটি ফরাসি রিপাবলিক এবং বেশ কয়েকটি সাম্রাজ্য ও রাজতন্ত্রের জন্ম দিয়েছে। সুতরাং সংশোধনশীল ও বাতিল হয়ে নতুন সংবিধান রচিত হওয়ার সম্ভাবনাময় ডকুমেন্ট কখনো সার্বভৌম হতে পারে না। বাংলাদেশের সংবিধানের কোথাও সংবিধানকে সার্বভৌম বলা হয়নি। বরং বলা হয়েছে “জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন” [অনুচ্ছেদ ৭(২)]।

বস্তুত: জনগণ হচ্ছে সার্বভৌম। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের মালিক হচ্ছে জনগণ। জনগণই তাদের প্রতিনিধি পাঁচ বছর পর পর নির্বাচন করে সংসদে পাঠায়। জনগণের প্রতিনিধিরা জনগণের ক্ষমতা তাদের পক্ষেই সংবিধান অনুযায়ী প্রয়োগ করে। সংবিধানের ৭(১) স্পষ্ট করে বলেছে “প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে”। অপরদিকে জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তি হলো প্রজাতন্ত্রের সংবিধান এবং সংবিধানের ৭(২) অনুচ্ছেদ তা স্পষ্ট করে বলেছে। জনগণ হলো স্থায়ী, স্থিতিশীল ও অপরিবর্তনশীল এবং সকল ক্ষমতার উৎস। পক্ষান্তরে সংসদ ও সংবিধান হলো অস্থায়ী, পরিবর্তনশীল ও অস্থিতিশীল। তাই আইন ও যুক্তির নিরিখে সার্বভৌম হবে সেই সত্তা যা স্থায়ী, স্থিতিশীল, অপরিবর্তনশীল এবং সকল ক্ষমতার উৎস।

সংবিধানের ৭(১) ও ৬৫(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জনগণ সব ক্ষমতার মালিক। অর্থাৎ তাদের সার্বভৌমত্বের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু সার্বভৌমত্ব হস্তান্তরের কথা বলা হয়নি। উপরন্তু সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে জনগণের পক্ষে ক্ষমতা প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে। জনগণের পক্ষে ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার শুধু সংসদ বা আইনসভাকেই দেয়া হয়নি, সাংবিধানিকভাবে অন্যদেরও সুনির্দিষ্ট করে তা দেয়া হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, নির্বাহী বিভাগকে (যেমন, সংবিধানের চতুর্থ ভাগ) রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। বিচার বিভাগকে (যেমন, সংবিধানের ষষ্ঠ ভাগ) দেয়া হয়েছে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব। এমনিভাবে নির্বাচন কমিশন (যেমন, সংবিধানের সপ্তম ভাগ) ও মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রককেও (যেমন, সংবিধানের অষ্টম ভাগ) সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। লক্ষণীয়, সংবিধানে প্রত্যেকের ক্ষমতা সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দেয়া আছে এবং এই পরিধির গণ্ডিতেই তাদের দায়িত্ব পালন করতে হয়।

পরিশেষে, অলিখিত সংবিধানের দেশ বৃটেনে সংসদীয় সার্বভৌমত্বের ধারণা আংশিকভাবে বা কালের পরিক্রমায় কিছুটা প্রযোজ্য হলেও, লিখিত সংবিধানের দেশ বাংলাদেশে তা অপ্রাসঙ্গিক। আমাদের লিখিত সংবিধানই সুপ্রিম বা সর্বোচ্চ আইন। আমাদের সংবিধান অনুযায়ী জনগণই সব ক্ষমতার উৎস ও সার্বভৌম। আমাদের জাতীয় সংসদ জনগণের পক্ষে এবং সংবিধানের অধীনে ও ক্ষমতাবলে সুনির্দিষ্ট ক্ষমতা- আইন প্রণয়নের ক্ষমতা- উপভোগ করে। জাতীয় সংসদের ক্ষমতা অগাধ হলেও, জাতীয় সংসদ সার্বভৌম নয়। বস্তুত আমাদের সংবিধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল ক্ষমতার বিভাজন (separation of power) ও ভারসাম্য (check and balance)। এর মূল উদ্দেশ্য হল ক্ষমতা কুক্ষিগত যাতে না হয় তা নিশ্চিত করা। কেননা, ইতিহাস সাক্ষী কুক্ষিগত ক্ষমতাই স্বৈরতন্ত্র বা ফ্যাসিবাদের জন্ম দেয়। জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে আসা লিখিত সংবিধান দ্বারা পরিচালিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র যে তিনটি স্তম্ভের (pillar) উপর দাঁড়িয়ে আছে তার কোন একটি স্তম্ভ অপর স্তম্ভ বা স্তম্ভদ্বয়ের উপর সার্বভৌম হওয়ার সুযোগ নেই।

লেখক:  বিশিষ্ট আইনজীবী, রাষ্ট্রচিন্তক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী এবং ইংল্যান্ডের প্র্যাকটিসিং ব্যারিস্টার।