যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরান আক্রমণের এক মাসেরও বেশি সময় পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দুই সপ্তাহের জন্য যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছেন। তবে এই ঘোষণার পর পারস্পরিক উত্তেজনা যে কমে গেছে তা নয়, বরং যে কোনো সময়ই যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যাওয়ার পরিস্থিতি রয়েছে। এ ধরনের ঘটনায় যুদ্ধবিরতিই যে শেষ কথা নয়, বরং সেটি আরও ভয়াবহ পরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে—তার নিদর্শনও অতীতে রয়েছে। ফরেন অ্যাফেয়ার্স ম্যাগাজিনে প্রথম গালফ যুদ্ধের উদাহরণ টেনে এ বিষয়ে দীর্ঘ নিবন্ধ লিখেছেন ড্যানিয়েল শারডেল এবং স্যামুয়েল হেলফন্ট। এশিয়া পোস্টের পাঠকদের জন্য নিবন্ধটি অনুবাদ করেছেন সামি আল মেহেদী।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ যুদ্ধ শুরুর পরপরই বিশ্লেষকদের সামনে আরেকটি ঐতিহাসিক ঘটনা তুলনার মতো হয়ে ধরা দেয়। মধ্যপ্রাচ্যে এই হস্তক্ষেপটি ঠিক যেন ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণেরই এক প্রতিধ্বনির মতো শোনা যাচ্ছে। ২০০৩ সালের মতোই, পারস্য উপসাগর অঞ্চলের দীর্ঘদিনের প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নিজ উদ্যোগে যুদ্ধ শুরু করে ওয়াশিংটন, প্রকাশ্যে যার লক্ষ্য ছিল দেশটির শাসনব্যবস্থা উৎখাত করা। আপাতত সামঞ্জস্যর জায়গা এটুকুই।
গত ৭ এপ্রিল ঘোষণা করা যুদ্ধবিরতির আগ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র মূলত ইরানের আকাশ ও সমুদ্রপথে এর সামরিক অভিযান সীমাবদ্ধ রেখেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়তো অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, বৃহৎ পরিসরে স্থলপথে আক্রমণ বা পুরোপুরি সামরিকভাবে দখল নেওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা রয়েছে। হয়তো এটি যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও দীর্ঘ মেয়াদে বৈদেশিক পরিসরে জটিলতায় ফেলে দিতে পারে এবং দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অতীত ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিতে চাইলে নীতিনির্ধারকদের আরও পেছনে ফিরে দেখা প্রয়োজন। ১৯৯১ সালের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত আরেকটি ইরাক যুদ্ধ—যার নাম অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম। এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল কুয়েতকে ইরাকি দখল থেকে মুক্ত করা। সে সময়ে যুক্তরাষ্ট্র আধুনিক ইতিহাসের স্মরণীয় এক সামরিক বিজয় অর্জন করলেও, এরপর নিজের তৈরি করা এক ফাঁদে নিজেই একটি দীর্ঘমেয়াদে ফাঁদে আটকা পড়ে যায়। ওয়াশিংটন ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করে দিলেও তার শাসনব্যবস্থাকে বহাল রাখে। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ বিদ্রোহের জন্য উৎসাহ দিলেও সে জন্য কোনো সহায়তা করেননি। তিনি এবং তার উত্তরসূরি বিল ক্লিনটন ইরাককে পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করতে বললেও বাগদাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কথা আমলে নেননি—এমনকি বাগদাদ তাদের শর্ত মেনে নিলেও এতে কোনো বদল হয়নি।
যুদ্ধক্ষেত্রের ফলাফল নয়, বরং নীতি ও কৌশলকে এক রেখায় নিয়ে না আসতে পারার ব্যর্থতাই ছিল এখানে মূল সমস্যা। ১৯৯১ থেকে ২০০৩ সময়সীমার মধ্যে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টই সাদ্দামের শাসন মেনে নিতে রাজি ছিলেন না, আবার তাকে উৎখাতের কার্যকর পরিকল্পনাও তাদের ছিল না। ফলে ১২ বছর ধরে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়, আর সেখানে যুক্তরাষ্ট্র এক রকমের আঞ্চলিক পুলিশের রূপ ধারণ করে ইরাকে গেঁড়ে বসে। নব্বইয়ের দশকে ইরাককে নিয়ন্ত্রণে রাখতে ওয়াশিংটনের কঠোর নীতি মিত্র ও প্রতিপক্ষ উভয়ের মধ্যেই বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে। দেশের ভেতর, এই অচলাবস্থা বাগদাদে ক্ষমতা পরিবর্তনের জন্য সবদিক থেকেই প্রবল চাপ তৈরি করে। এর ফলাফলে ২০০৩ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরাক দখল ও আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন, যেটি মোটেও কোনো সৌভাগ্য বয়ে আনেনি।
আজ ইরান প্রসঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্র একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ইসলামিক প্রজাতন্ত্রকে উৎখাতের আলাপ থেকে মার্কিন কর্মকর্তারা এখন পুরোপুরি সরে এসেছেন, যা নতুন যুদ্ধবিরতির শর্তেও প্রতিফলিত হয়েছে। ভবিষ্যৎ আলোচনার ফলাফল সম্ভবত এমন একটি রাজনৈতিক সমঝোতা হবে, যেখানে বর্তমান শাসনব্যবস্থা টিকে থাকবে। ঠিক ১৯৯১ সালের মতোই, এই শাসনব্যবস্থা দুর্বল হবে কিন্তু প্রতিবেশীদের জন্য হুমকি হয়ে ওঠার সক্ষমতা রাখবে। কঠোরভাবে অভ্যন্তরীণ বিরোধ দমন করার জন্য শক্তি প্রয়োগ করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নীতির বিরুদ্ধে বৈশ্বিক জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করে যাবে।
নব্বইয়ের দশকে ইরাককে দখলে রাখার মতো একই কাজ ইরানের ক্ষেত্রে করলে ১৯৯০-এর দশকের মতো বারবার সংঘাত তৈরি হবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তিকে ব্যস্ত রাখবে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এর পরিবর্তে, ওয়াশিংটনের উচিত তেহরানকে একটি কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাভাবিকীকরণের পথ প্রস্তাব করা—যার বিনিময়ে গণবিধ্বংসী অস্ত্র ত্যাগ, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করা এবং প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধ করার মতো সুনির্দিষ্ট কিছু শর্ত মেনে চলবে।
১৯৯০-এর দশকে বুশ ও ক্লিনটনের বড় ভুল ছিল—যুক্তরাষ্ট্রের দাবি মেনে নেওয়ার পরও সাদ্দামের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে ব্যর্থ হওয়া। অতীতের ভুলের পুনারবৃত্তি করতে না চাইলে, সামরিক ক্ষমতা দিয়ে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা নয়, বরং ইরানের বর্তমান শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে বোঝাপড়া ঠিকঠাক করে নিয়ে এগিয়ে যাওয়াই হবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
যে কথা হয়নি বলা
ডেজার্ট স্টর্ম অভিযানের প্রস্তুতির সময় প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ এবং তার উপদেষ্টারা ভিয়েতনাম যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছিলেন। তারা চেয়েছিলেন, যেন আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ফাঁদে না পড়তে হয়। সে কারণে তারা বাগদাদে অগ্রসর হয়ে সাদ্দামকে উৎখাত করার পরিকল্পনা করেননি। বরং লক্ষ্য ছিল ইরাক, ইরান এবং গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে শক্তির ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা—যার মধ্যে ছিল বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত। এর জন্য সাদ্দামের সামরিক বাহিনীকে এতটুকু দুর্বল করে দেওয়া প্রয়োজন ছিল যাতে করে তারা প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য ভীতিকর কিছু না হয়ে উঠতে পারে। তবে, এটি এতখানি দুর্বল করাও উচিত হয়নি যে কারণে আঞ্চলিক ক্ষমতার কাঠামোয় এক ধরনের শূন্যতা বা ইরাকের মধ্যে আঞ্চলিক খণ্ডিতকরণ ঘটে।
আদতে বাস্তবের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেও এই কৌশল বুশের আদর্শিক লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। ইরাকের স্বৈরশাসক ক্ষমতায় আছেন, এই বাস্তবতাকে বুশ কখনো মানতেই পারেননি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রত্যক্ষ যোদ্ধা জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ সাদ্দামকে তুলনা করতেন অ্যাডলফ হিটলারের সঙ্গে। ইরাকের কুয়েত আক্রমণকে তিনি ত্রিশের দশকের জার্মান, ইতালিয়ান এবং জাপানি আগ্রাসনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতেন।
১৯৯০ সালের আগস্টে তিনি ঘোষণা করেন, “অর্ধশতাব্দী আগে, এক নির্মম আগ্রাসনকারীকে থামানোর সুযোগ এসেছিল পৃথিবীর কাছে, কিন্তু সুযোগটি কাজে লাগানো যায়নি। আমি এটুকুই বলতে চাই, এই ভুল আমরা আর করব না।” ইরাক আক্রমণের ক্ষেত্রে তার হিসাব দৃশ্যমান দিক থেকে একদিক থেকে ছিল সোজাসাপ্টা—ভালোর শক্তি নিয়ে মন্দকে আক্রমণ করা।
কিন্তু তিনি আসলে কখনোই ঠিকঠাক নির্ধারণ করতে পারেননি যে অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম দিয়ে তিনি আসলে কী অর্জন করতে চেয়েছেন। তিনি কী আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন নাকি এক অত্যাচারী স্বৈরশাসককে পুরোপুরি উৎখাত করতে চেয়েছিলেন—তা কখনোই স্পষ্ট হয়নি।
খুব সম্ভব যে বুশ এই কৌশলগত অসামঞ্জস্যকে বাস্তবে না হলেও নিজের কাছে এভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ করেছেন বা ধরে নিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে অপমানজনক পরাজয়ের পর সাদ্দাম টিকে থাকতে পারবেন না। ওয়াশিংটন আশা করেছিল, ইরাকের সেনাবাহিনী ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস করে দিলে ইরাকি জনগণ সাদ্দামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অবস্থান নেবে, অথবা শাসনব্যবস্থার ভেতর থেকেই কোনো নমনীয় কোনো ব্যক্তিত্বকে সাদ্দামের জায়গা নেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করবে। বুশ এতদূর পর্যন্ত গিয়েছিলেন যে তিনি ইরাকি জনগণকে আহ্বান জানিয়েছিলেন, “নিজেদের হাতে দায়িত্ব তুলে নিন এবং স্বৈরশাসক সাদ্দাম হোসেনকে সরে যেতে বাধ্য করুন।”
পরবর্তীতে দেখা গেল, ইরাকিরা সত্যিই বিদ্রোহে উঠেছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল, যুক্তরাষ্ট্র তাদের পেছনে সহায়তায় থাকবে। ১৯৯১ সালের মার্চ থেকে শুরু করে প্রধানত শিয়া অধ্যুষিত দক্ষিণাঞ্চল এবং কুর্দি অধ্যুষিত উত্তরাঞ্চলে গণঅভ্যুত্থান ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সাদ্দামের নিরাপত্তা বাহিনী যখন ত্রিশ থেকে ষাট হাজার শিয়া এবং প্রায় বিশ হাজার কুর্দিকে হত্যা করে, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী সেখানে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। কুর্দিদের সহায়তা দেওয়ার জন্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে থাকায়, বুশ সে সময়ে কিছু তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেন—যার মধ্যে ছিল ১৯৯১ সালের এপ্রিলে উত্তর ইরাকের আকাশসীমায় নো-ফ্লাই জোন প্রতিষ্ঠা করা।
প্রাথমিকভাবে এই নো-ফ্লাই জোনকে একটি সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে ভাবা হয়েছিল, যাতে কুর্দিদের কাছে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে যাওয়া মার্কিন কর্মীরা নিরাপদ থাকে। কিন্তু পরবর্তীতে এটি স্থায়ী হয়ে যায় এবং ১৯৯২ সালের আগস্টে দক্ষিণ ইরাকেও সম্প্রসারিত করা হয়। ইরাকের আকাশসীমা অনির্দিষ্টকাল ধরে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে, সাদ্দামকে অপসারণ না করেও তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে চাপায় যুক্তরাষ্ট্র। এই কৌশল বাস্তবায়নের জন্য নিয়মিত নজরদারি, সময়ে সময়ে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখা প্রয়োজন ছিল। ফলে, ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের গভীর সম্পৃক্ততা এড়ানোর জন্য যে প্রচেষ্টা হয়েছিল, সেটি আরও দীর্ঘমেয়াদের দিকে গড়ায়।
যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রান্তিবিলাস
ডেজার্ট স্টর্মের পর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার শর্ত হিসেবে ইরাককে গণবিধ্বংসী অস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করতে বলে। ইরাকের সরকার প্রথমদিকে অস্ত্র কর্মসূচির বিষয়গুলো গোপন রাখার চেষ্টা করে। তবে সাদ্দাম খুব দ্রুতই বুঝে যান, জাতিসংঘের পরিদর্শকদের চোখে ধুলো দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব হবে না। ১৯৯১ সালের শেষ নাগাদ সাদ্দাম গোপনে তার অধিকাংশ লুকোনো বিধ্বংসী অস্ত্রই ধ্বংস করে দেন। এই কাজের পরিণতি ভবিষ্যতে তার জন্য আরও বিপদই ডেকে আনে, কারণ তিনি প্রমাণ করতে পারেননি যে সেই “বিধ্বংসী” অস্ত্রগুলো তার কাছে আর নেই।
তবুও গণবিধ্বংসী অস্ত্র ইস্যুতে সৃষ্ট অচলাবস্থার জন্য সাদ্দাম একাই দায়ী ছিলেন না। শুরু থেকেই বুশ প্রশাসন ইরাকিদের জাতিসংঘের পরিদর্শনে সহযোগিতা করার জন্য কোনো প্রণোদনা দেয়নি। মার্কিন কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, ইরাক যদি সহযোগিতাও করে, তবুও তার ফলে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার দিকে যাবে না।
১৯৯১ সালে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেমস বেকার দ্ব্যর্থভাবে বলেন, কোনও অবস্থাতেই সাদ্দামের নেতৃত্বাধীন ইরাক সরকারের সাথে কারো স্বাভাবিক কোনো সম্পর্ক বজায় রাখা উচিত হবে না। বুশের বয়ানমাফিক সাদ্দাম যদি আসলেই হিটলারের আরেক রূপ হয়ে থাকেন, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে তার সঙ্গে আলোচনা করা কার্যত অসম্ভবই ছিল।
বুশ প্রশাসনের ত্রুটিপূর্ণ এই নীতি বিল ক্লিনটন আরও জোরালোভাবে অনুসরণ করেন। আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি ইরাককে নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশল নিলেও এটি স্পষ্ট ছিল যে শাসন পরিবর্তন ছাড়া তিনি অন্য কিছুতেই তিনি সন্তুষ্ট হতে পারছিলেন না। এই নীতি শেষ পর্যন্ত আত্মঘাতী প্রমাণিত হয়। তার আগে জর্জ ডব্লিউ বুশ যে কাজ করেছিলেন, ক্লিনটনও তার পুনরাবৃত্তিই করলেন—যতদিন সাদ্দাম হোসেন ক্ষমতায় থাকবেন, ততদিন নিষেধাজ্ঞার কোনো অবসান হবে না। পরিস্থিতিটি আরও করুণ হয়ে ওঠে, কারণ ইরাকি নথিপত্র থেকে জানা যায়, শুরুর দিকটায় সাদ্দামের আশা ছিল যে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিকঠাক করার একটা সুযোগ হতে পারে। ১৯৯৩ সালের শুরুতে সাদ্দাম উপদেষ্টাদের বলেছিলেন, “আমি বিশ্বাস করি, ক্লিনটনের শাসনামলে পরিস্থিতি বদলাবে।” কিন্তু ক্লিনটনের প্রতি ইরাকের এই আশাবাদ ধোপে টেকেনি।
উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো তাদের বৃহত্তর প্রতিবেশীদের তুলনায় সামরিকভাবে দুর্বল ছিল, ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব এসে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর। আগে পারসিয়ান গালফে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর উপস্থিতি ছিল সীমিত এবং দূরবর্তী (ওভার-দ্য-হরিজন), কিন্তু তা পরবর্তীতে আরব রাষ্ট্রগুলোতে স্থায়ী সামরিক ঘাঁটির এক বিস্তৃত নেটওয়ার্কে রূপ নেয়। যুক্তরাষ্ট্র বাহরাইনে পুনরায় নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর স্থাপন করে, কাতারে আল উদেইদ বিমানঘাঁটি নির্মাণ করে, সৌদি আরব ও কুয়েতে স্থল ও আকাশসীমার সামরিক সুবিধা সম্প্রসারণ করে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রায় অব্যাহতভাবে বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন বজায় রাখে।
এই সামরিক উপস্থিতি নতুন সমস্যার জন্ম দেয়। ওসামা বিন লাদেন ১৯৯৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেন। একইসঙ্গে নিষেধাজ্ঞা ইরাকি জনগণের ওপর প্রভাব ফেললেও শাসকগোষ্ঠী বিলাসিতায় জীবনযাপন করছিল। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি আন্তর্জাতিকভাবে অজনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং মিত্ররাও দূরে সরে যেতে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতি আরও অনেক সমস্যার জন্ম দেয়। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হয়ে ওঠে ইসলামপন্থী প্রতিক্রিয়া, যার ফলশ্রুতিতে আল কায়েদার নেতা ওসামা বিন লাদেন ১৯৯৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেন। তবে বিন লাদেন এবং তার মতো লোকজনই যে কেবল উপসাগরীয় অঞ্চলে ওয়াশিংটনের অবস্থান নিয়ে রুষ্ট ছিলেন, ব্যাপারটা তা নয়। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে নিষেধাজ্ঞা ইরাকি সমাজে গভীর প্রভাব ফেলতে শুরু করে, কিন্তু শাসনব্যবস্থার ওপর তেমন প্রভাব ফেলেনি। খাদ্য ও ওষুধের ঘাটতি দেখা দেয়, অথচ সাদ্দাম ও ঘনিষ্ঠরা বিলাসবহুল প্রাসাদে জীবনযাপন করছিলেন।
মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোও ধীরে ধীরে বিল ক্লিনটনের দিনকে দিন জনপ্রিয়তা হারানো ইরাক নীতি থেকে নিজেদের দূরে সরাতে শুরু করে। ১৯৯৬ সালে সৌদি আরব এবং তুরস্ক তাদের ভূখণ্ডের ঘাঁটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরাকে নতুন দফায় বোমা হামলা চালানোর অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানায়। ওই বছরেই ফ্রান্স নো-ফ্লাই জোন কার্যকর করার জোট থেকে সরে দাঁড়ায়। ১৯৯৮ সালে যখন ওয়াশিংটন ও লন্ডন ইরাকে চার দিনব্যাপী তীব্র বিমান হামলা চালায় (অপারেশন ডেজার্ট ফক্স), তখন ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং পশ্চিমা অঞ্চলে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো ওয়াশিংটন ও লন্ডন থেকে রাশিয়া রাষ্ট্রদূতদের প্রত্যাহার করে নেয়।
তবুও ক্লিনটন প্রশাসন অনেক দূরে বসে এই শাসন বদলে দেওয়ার ভ্রান্তিকেই আঁকড়ে ধরে রেখেছিল। সাদ্দাম বিশ্বাসযোগ্য ছিলেন না, তবে সহায়তা বা নিয়ম মেনে চলা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কখনোই যথেষ্ট ছিল না। ১৯৯৭ সালে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাডেলিন অলব্রাইট বলেছিলেন, “যেসব দেশ মনে করে যে ইরাক গণবিধ্বংসী অস্ত্র সংক্রান্ত দায়বদ্ধতা পালন করলে তাদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া উচিত, আমরা তাদের সঙ্গে একমত নই।”
ইরাককে তার “শান্তিপূর্ণ অভিপ্রায় প্রমাণ” করতে হবে। ক্ষমতা পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া ছাড়া বাগদাদের শাসনব্যবস্থার পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের চাহিদা পূরণ করার কোনো বাস্তব উপায় ছিল না। ১৯৯৮ সালে বিল ক্লিনটন ইরাক লিবারেশন অ্যাক্টে স্বাক্ষর করেন, যার মাধ্যমে শাসন পরিবর্তনকে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। বুশের মতোই ক্লিনটনও সাদ্দামকে ক্ষমতায় মেনে নিতে পারেননি, আবার সরানোর কোনো কার্যকর কৌশলও তার হাতে ছিল না। এদিকে, ইরাককে কব্জায় রেখে দেওয়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক পরিসরে যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বিচ্ছিন্ন করে তোলে।
অতীত ভবিষ্যতের পূর্বাভাস হওয়া জরুরি নয়
১৯৯১ সালের পর, ধারাবাহিক যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন এই ভ্রান্ত ধারণায় জড়িয়ে গিয়েছিল যে তারা ইরাককে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে, পুরোপুরি সামরিক দখল এড়িয়ে চলতে পারবে, আর এর মাধ্যমেই শাসন পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হবে। এর ফল ছিল এক অনিশ্চিত ও গভীরভাবে গেঁড়ে বসা অচলাবস্থা। এটি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য তো হয়ইনি, বরং এই পরিস্থিতি বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়মিতভাবে খবরদারির ভূমিকা পালন করতে হয়েছে। এতে করে বিশ্বজনমতের প্রেক্ষিতেও তার গ্রহণযোগ্যতা দিনের পর দিন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুরু থেকেই যদি স্পষ্ট করে দেওয়া হতো যে যুক্তরাষ্ট্রের দাবিগুলো মেনে চললে ইরাক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পথ, সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ এবং দীর্ঘস্থায়ী শান্তির দিকে এগোতে পারবে—সেটি আরও টেকসই একটি কৌশল হতে পারত।
এখন যুক্তরাষ্ট্র একই ধরনের একটি সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হয়েছে ইরানের ক্ষেত্রে। আগামী কয়েক সপ্তাহে আলোচনা যেদিকেই যাক না কেন, বর্তমান যুদ্ধ সম্ভবত এমনভাবে শেষ হবে যেখানে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র দুর্বল হবে, কিন্তু টিকে থাকবে। যদি ট্রাম্প প্রশাসন আলোচনায় না গিয়ে ধারাবাহিক বিমান হামলা ও অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে শাসন পরিবর্তনের আশা করে, তবে তা ১৯৯১ সালে ইরাকের যে পরিস্থিতি হয়েছিল সেটিরিই পুনারবৃত্তি করবে। যার ফলাফল হিসেবে সম্ভাবনা রয়েছে গণঅভ্যুত্থান, ভূখণ্ড ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা, সহিংস দমন-পীড়ন এবং শরণার্থীর ঢল। এই পরিণতি এড়াতে হলে ট্রাম্প প্রশাসনকে সেই কাজটিই করতে হবে, নব্বইয়ের দশকের প্রেসিডেন্টরা করতে পারেননি। সেটি হলো, প্রতিপক্ষের বিদ্যমান সরকার যতই অপছন্দনীয় হোক না কেন, তার সঙ্গে সহাবস্থানের পথ খুঁজে বের করা।
যে চুক্তির মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধের অবসান ঘটবে, তা সম্ভবত ১৯৯১ সালের সমঝোতার যুক্তির সঙ্গেই মিল থাকবে: নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিনিময়ে ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি ভেঙে ফেলতে, অস্ত্র উন্নয়ন সীমিত করতে, এবং প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধ করতে সম্মত হবে। আর সেইসাথে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করতে হবে। ডোনাল্ড ট্রাম্পকে মার্কিন জনগণ ও মিত্রদের কাছে স্পষ্ট করতে হবে যে, ইরান যদি তার দাবিগুলো মেনে চলে, তবে ওয়াশিংটন আস্থা গড়ে তুলতে কাজ করবে এবং তেহরানের জন্য সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথ তৈরি করবে।
রাজনৈতিকভাবে বিষয়টি খুবই কঠিন হবে। ১৯৯০ এর দশকে জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ এবং বিল ক্লিনটন নিজেদের এক রাজনৈতিক গ্যাঁড়াকলে আটকে ফেলেছিলেন, যেখানে থেকে তাদের সরে আসা কঠিন ছিল। ১৯৯৮ সালে ক্লিনটন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারকে খোলামেলা বলেছিলেনও, “যদি আমার ওপর গণমাধ্যমের চাপ না থাকত, তবে হয়তো (আপত্তিকর শব্দ প্রয়োগ করে) আমি ওকে ফোন করতাম … কিন্তু আমেরিকায় এটি অনেক ওজনদার সিদ্ধান্ত। আমার পক্ষে এটা করা সম্ভব না।”
ট্রাম্পকে দেশে ও বিদেশে সেইসব পক্ষকে বোঝাতে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পুঁজি ব্যয় করতে হবে, যারা শুধু শাসন পরিবর্তনেই সন্তুষ্ট হবে। তবে ট্রাম্পের অপ্রত্যাশিত স্বভাবের একটি ইতিবাচক দিক হলো, প্রয়োজন মনে করলে তিনি যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, মানুষ সেটি পছন্দ না করলেও তিনি পরোয়া করেন না। এতে করে তিনি সেই রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতাগুলো অতিক্রম করার ক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধা পেতে পারেন, যা বুশ ও ক্লিনটনকে সাদ্দামের সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের পথে যেতে বাধা দিয়েছিল।
যে পথই বেছে নেওয়া হোক, যুক্তরাষ্ট্রকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। কোল্ড ওয়ারের পরবর্তী সময়ে সর্বোচ্চ শক্তির অবস্থানে ছিল যুক্তরাষ্ট্র। এরপরও ওয়াশিংটন ইরাকের বিরুদ্ধে কাগজে-কলমের সামরিক জয়কে দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতায় রুপ দিতে পারেনি। সম্ভবত ১৯৯১ সালের সঙ্গে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো, যুক্তরাষ্ট্র আর একক সুপারপাওয়ার হিসেবে সেই অবস্থানে নেই। এই যুদ্ধের পর ইরানকে দীর্ঘ সময় ধরে নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রচেষ্টা এমন এক যুগে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকেই উন্মোচিত করবে, যেখানে তার মিত্র ও প্রতিপক্ষ উভয়েরই চ্যালেঞ্জ জানানোর সক্ষমতা বেড়েছে।
ইরাক নিয়ে ভুল নীতির ফলে যে বিপর্যয়গুলো ঘটেছিল, তা পুনরাবৃত্তি এড়াতে হলে ট্রাম্পকে সেই কাজটি করতে প্রস্তুত থাকতে হবে, যা ১৯৯০-এর দশকের নেতারা করতে পারেননি। সবচেয়ে অপছন্দনীয় প্রতিপক্ষের কাছ থেকেও ‘হ্যাঁ’কে ‘হ্যাঁ’ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
লেখক:
১. ড্যানিয়েল শারডেল ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসের ক্লেমেন্টস সেন্টার ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটির একজন পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো। গালফ যুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে তিনি একটি গবেষণাগ্রন্থ লিখেছেন, যা কিছুদিনে মধ্যে প্রকাশ হবে।
২. স্যামুয়েল হেলফন্ট নেভাল পোস্টগ্র্যাজুয়েট স্কুলের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর এবং হুভার ইনস্টিটিউশনের ভিজিটিং ফেলো। ইরাক যুদ্ধ ও কোল্ড ওয়ার নিয়ে তার গবেষণাগ্রন্থ রয়েছে।