Image description

আশরাফুর রহমান, তেহরান থেকে

ইরানের অভিজ্ঞ রাজনীতিক, চিন্তাবিদ এবং কৌশলগত নেতা ড. আলী লারিজানি, সোমবার গভীর রাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় নিজ বাসভবনে শহীদ হয়েছেন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এই তথ্য নিশ্চিত করে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা উচ্চ পরিষদ (এসএনএসসি), যেখানে তিনি গত বছরের আগস্ট থেকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছিলেন।

 

এই হামলায় তার ছেলে মোর্তাজা লারিজানি, নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলীরেজা বায়াত এবং কয়েকজন দেহরক্ষীও শহীদ হন। এই ঘটনা ঘটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পক্ষ থেকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসন শুরু হওয়ার ১৮ দিনের মাথায়।

জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ জানায়, শাহাদাত ছিল লারিজানির দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা। তিনি সারাজীবন দেশের অগ্রগতি এবং ইসলামী বিপ্লবের জন্য কাজ করেছেন।

চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তার নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং তার কৌশল শত্রুপক্ষকে বড় ধরনের সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে ফেলে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবফ, বিচার বিভাগের প্রধান মোহসেনি এজেয়ী এবং ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন এবং প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন।

লারিজানির শাহাদাতের প্রতিশোধ নিল ইরান 

ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, ইরানের সাবেক শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা ড. আলী লারিজানির শাহাদাতের প্রতিশোধ হিসেবে তারা তেল আবিব শহরে ১০০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। 

বুধবার প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, মাল্টি-ওয়ারহেড বিশিষ্ট খোররামশাহর-৪ ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি ইমাদ ও খাইবার শেকান ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে এসব আঘাত হানা হয়। এসব হামলায় অধিকৃত ভূখণ্ডের কেন্দ্রস্থলে থাকা সামরিক ও নিরাপত্তা লক্ষ্যবস্তুগুলোতে কোনো বাধা ছাড়াই আঘাত হানা সম্ভব হয়েছে বলে আইআরজিসি’র বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। 

আরও কঠোর হামলার ঘোষণা

আইআরজিসির অ্যারোস্পেস বাহিনীর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাজিদ মুসাভি জানিয়েছেন, প্রতিশোধমূলক এই অভিযান আরও জোরদার করা হবে। সামনে আরও কঠোর হামলা আসছে ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, ‘আজ রাতে শত্রুর আকাশ আরও বড় দৃশ্যে পরিণত হবে।’   

তার মতে, জনগণের দাবির প্রেক্ষিতে শত্রুদের বিরুদ্ধে আরও শক্ত আঘাত হানার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে এবং ইরানের বিরুদ্ধে কোনো পক্ষই তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারবে না।

এদিকে, ইসরাইলি হামলায় ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলী লারিজানি নিহত হওয়ার ঘটনায় ‘চূড়ান্ত প্রতিশোধ’ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন ইরানের সেনাপ্রধান আমির হাতামি।

এক বিবৃতিতে ইরানের সেনাবাহিনীর প্রধান বলেন, লারিজানিকে হত্যার জবাবে ‘চূড়ান্ত প্রতিশোধ’ নেওয়া হবে। উপযুক্ত সময় ও স্থানে অপরাধী আমেরিকা এবং রক্তপিপাসু জায়নবাদী ইসরাইলি শাসনের বিরুদ্ধে একটি চূড়ান্ত, প্রতিরোধমূলক ও অনুতাপজনক জবাব দেওয়া হবে। লারিজানি এবং অন্যান্য শহীদদের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া হবে।

ব্যক্তির উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির কোনো প্রভাব ইরানে নেই: আরাকচি

ড. লারিজানির শাহাদাতের ঘটনায় ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি বড় শূন্যতা তৈরি করল বলে অনেকেই মন্তব্য করলেও ভিন্ন মত পোষণ করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচি।

আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘আমি জানি না কেন আমেরিকান এবং ইসরাইলিরা এখনও বুঝতে পারেনি যে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক কাঠামো রয়েছে, যা সুপ্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহ দ্বারা গঠিত। এই কাঠামোর উপর কোনো ব্যক্তির উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির কোনো প্রভাব নেই। অবশ্যই, ব্যক্তিদের প্রভাব রয়েছে এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ ভূমিকা পালন করে; কেউ ভালো, কেউ দুর্বল, এবং কেউ কম। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা একটি অত্যন্ত সুদৃঢ় কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত।’

লারিজানির দায়িত্ব ও কর্মজীবন

আলী লারিজানি ইরানের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। ২০২৫ সালের আগস্টে তিনি আবারও জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব হন—একই পদে তিনি এর আগে অনেক বছর দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

এর আগে তিনি জেনারেল আলী আকবর আহমাদিয়ানের স্থলাভিষিক্ত হন। এই নিয়োগটি ছিল বড় ধরনের প্রশাসনিক পরিবর্তনের অংশ।

শৈশব ও শিক্ষাজীবন

১৯৫৮ সালে ইরাকের নাজাফ শহরে তার জন্ম। তার পরিবার ছিল একটি সম্মানিত ধর্মীয় পরিবার। তার বাবা ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলেম।

প্রথমে তিনি গণিত ও কম্পিউটার বিজ্ঞানে পড়াশোনা করেন। পরে দর্শনের প্রতি আগ্রহী হয়ে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি সম্পন্ন করেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট।

বহুমাত্রিক কর্মজীবন

লারিজানি তার কর্মজীবন শুরু করেন ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীতে (আইআরজিসি)। পরে তিনি ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা আইআরআইবি’র প্রধান হিসেবে ১০ বছর দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৫ সালে তিনি জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব হন এবং একই সঙ্গে ইরানের প্রধান পারমাণবিক আলোচক হিসেবে কাজ করেন।

তার সময়ে ইরান আবার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করে, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বড় ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টি করে।

২০০৭ সালে মতবিরোধের কারণে তিনি পদত্যাগ করেন। এরপর ২০০৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং টানা তিন মেয়াদে পার্লামেন্ট স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এই সময়ে তিনি ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি (জেসিপিওএ) অনুমোদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ভূমিকা

২০২০ সালে তাকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা করা হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিষদের সদস্য করা হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে তিনি রাশিয়া সফর করে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেন, যেখানে আঞ্চলিক উত্তেজনা ও পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়।

শেষ বার্তা

তার জীবনের শেষ দিকে, যখন তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছিল, তখন তিনি ইমাম হুসাইন (আ.)-এর একটি উক্তি উল্লেখ করেন:

‘আমি মৃত্যুকে সুখ ছাড়া আর কিছু মনে করি না, আর জালিমদের সঙ্গে জীবনকে দেখি কেবল কষ্ট হিসেবে।’

ড. আলী লারিজানি শুধু একজন রাজনীতিবিদই ছিলেন না—তিনি ছিলেন একজন চিন্তাবিদ, কৌশলবিদ এবং দীর্ঘদিন ধরে দেশের জন্য কাজ করা এক নিবেদিতপ্রাণ নেতা। তিনি ছিলেন ইরানের বিখ্যাত চিন্তাবিদ ও আলেম শহীদ আয়াতুল্লাহ অধ্যাপক মুর্তাজা মোতাহহারির ছাত্র ও জামাতা।