Image description
সরদার ফরিদ আহমদ

জুলাই গণঅভ্যুত্থান দেশের রাজনীতিতে একটি ঐতিহাসিক মোড় তৈরি করেছিল। সেই প্রেক্ষাপটে জন্ম নেয় জুলাই জাতীয় সনদ। এরপর গণভোট হয়। জনগণ তাদের মত দেয়। ‘হ্যাঁ’ ভোট জিতে যায়। এর মানে ছিল একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা—সংবিধান সংস্কারের পথ খুলতে হবে। নতুন কাঠামোর দিকে এগোতে হবে।

কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন ছবি দেখাচ্ছে। গণভোটের ফল ঘোষণার অনেক সময় পেরিয়ে গেছে। তবু সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান হয়নি। এটি শুধু একটি প্রশাসনিক বিলম্ব নয়। এটি এখন রাজনৈতিক প্রশ্ন। সাংবিধানিক প্রশ্ন। গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।

রোববার জাতীয় সংসদে এ বিষয়েই প্রকাশ্য বিতর্ক হয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান সংসদে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেছেন, জুলাই সনদের আদেশ অনুযায়ী নির্বাচনের ফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করার কথা ছিল। কিন্তু তা হয়নি। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে জবাব দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তার বক্তব্য সরল নয়। বরং জটিল। তিনি বলেছেন, সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অস্তিত্ব নেই। তাই প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে এই পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের পরামর্শ দিতে পারেন না। রাষ্ট্রপতিও তা করতে পারেন না।

এই বক্তব্য শুনে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে। তাহলে গণভোট কেন হলো? জনগণ কেন ভোট দিল? আর সেই ভোটের ভিত্তিতে যে আদেশ জারি করা হয়েছিল, তার রাজনৈতিক মূল্য কোথায়?

মন্ত্রী আরও বলেছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশটি আইনও নয়, অধ্যাদেশও নয়। তিনি এটিকে ‘মাঝামাঝি জিনিস’ বলেছেন। এমনকি কৌতুকের ভঙ্গিতে ‘নিউটার জেন্ডার’ বলেও উল্লেখ করেছেন। এ ধরনের মন্তব্য রাষ্ট্রীয় নীতির গভীর সংকটকে প্রকাশ করে। কারণ একটি গণভোটের ভিত্তিতে জারি হওয়া আদেশকে যদি সরকার নিজেই অস্পষ্ট বলে তুলে ধরে, তাহলে জনগণের সিদ্ধান্তের মর্যাদা কোথায় দাঁড়ায়?

এখানেই রাজনীতির আসল প্রশ্নটি উঠে আসে—সরকার কি সময়ক্ষেপণ করছে? আরো স্পষ্ট করে বললে, সরকার কি বিষয়টিকে আদালতের দিকে ঠেলে দিয়ে রাজনৈতিক দায় এড়িয়ে যেতে চাইছে? এই প্রশ্ন এখন জনমনে ঘুরছে। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে আদালতে রিট হয়েছে। আদালত রুলও জারি করেছে। অর্থাৎ বিষয়টি এখন বিচার বিভাগের দরজায়ও পৌঁছে গেছে। সরকারও ইঙ্গিত দিয়েছে—বিচার বিভাগ মতামত দেবে। কিন্তু গণতন্ত্রের মৌলিক নীতি হলো—জনগণের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের জায়গা আদালত নয়, রাজনীতি। এ কথাটি বহু রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্পষ্ট করে বলেছেন। প্রখ্যাত রাজনৈতিক তাত্ত্বিক রবার্ট ডাল গণতন্ত্রকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো জনগণের সম্মতি। যখন জনগণ সরাসরি কোনো বিষয়ে মত দেয়, তখন সেই সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বাস্তবায়ন করতে হয়। আদালতের মাধ্যমে তা স্থগিত বা বিলম্ব করা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে যায় না। একই কথা অন্যভাবে বলেছেন রাজনৈতিক দার্শনিক হানান আরেন্ট। তার মতে, রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস জনগণ। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সেই ক্ষমতার রক্ষক মাত্র। তারা জনগণের সিদ্ধান্তকে পাশ কাটাতে পারে না।

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে এই তত্ত্বগুলো নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। কারণ জুলাই সনদ কোনো সাধারণ রাজনৈতিক দলিল নয়। এটি একটি গণঅভ্যুত্থানের ফল। সেই অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে এটি সামনে আসে। এরপর গণভোট হয়। অর্থাৎ জনগণের প্রত্যক্ষ অনুমোদন রয়েছে। এই বাস্তবতায় সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না হওয়া একটি বড় রাজনৈতিক সংকেত দেয়। সরকারি দল প্রকাশ্যে না বললেও তাদের মধ্যে স্পষ্ট অনীহা দেখা যাচ্ছে। এই অনীহা নানা যুক্তির আড়ালে প্রকাশ পাচ্ছে—কখনো সাংবিধানিক জটিলতার কথা বলা হচ্ছে, কখনো আইনি অস্পষ্টতার কথা।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই জটিলতা আগে জানা ছিল না? গণভোট আয়োজনের আগে কি সরকার জানত না সংবিধানে সংস্কার পরিষদের কথা নেই? যদি জানত, তাহলে গণভোটের পথ কেন বেছে নেওয়া হলো? আর যদি না জানত, তাহলে সেটি ছিল গুরুতর রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সংসদের ভূমিকা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, সংসদ সার্বভৌম। আদালতের মতামত সংসদের ওপর বাধ্যতামূলক নয়। আবার তিনি এটাও বলেছেন, সংসদ এমন আইন করতে পারে না, যা আদালতে গিয়ে বাতিল হয়ে যাবে। এই বক্তব্যে একটি দ্বৈত অবস্থান দেখা যায়। একদিকে সংসদের সার্বভৌমত্বের কথা বলা হচ্ছে। অন্যদিকে আদালতের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার ভয়ে সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

এটি রাজনৈতিক দৃঢ়তার লক্ষণ নয়। বরং রাজনৈতিক দ্বিধার লক্ষণ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েভার লিখেছিলেন, রাজনীতি মানে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস। অনিশ্চয়তার মধ্যেও নেতৃত্বকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কারণ বিলম্ব নিজেই একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে এ কথাটি খুবই প্রযোজ্য। কারণ সময় যত যাচ্ছে, রাজনৈতিক সন্দেহ তত বাড়ছে। মানুষ ভাবছে—গণভোট কি শুধু একটি রাজনৈতিক কৌশল ছিল? জুলাই সনদ কি শুধু একটি সাময়িক প্রতিশ্রুতি ছিল? এই সন্দেহ যদি গভীর হয়, তাহলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা দুর্বল হবে।

আরেকটি বিপজ্জনক দিকও রয়েছে। যদি জনগণের সরাসরি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে গণভোটের ধারণাটিই দুর্বল হয়ে যাবে। মানুষ বিশ্বাস হারাবে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এ বি ডাইসে গণভোটকে সরাসরি গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখেছিলেন। তার মতে, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ সরাসরি সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করে। এই তত্ত্ব যদি সত্য হয়—আর ইতিহাস বলছে তা সত্য—তাহলে জুলাই সনদের গণভোটকে উপেক্ষা করা মানে জনগণের সার্বভৌম সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করা। এটি কোনো ছোট বিষয় নয়। এটি রাজনৈতিক বিশ্বাসের প্রশ্ন। রাষ্ট্রের নৈতিকতার প্রশ্ন।

সরকার যদি সত্যিই সাংবিধানিক জটিলতা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়, তাহলে তার সমাধানের পথ আছে। সংসদে আলোচনা হতে পারে। সাংবিধানিক সংশোধনের পথ খোলা আছে। রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু বিষয়টিকে আদালতের গোলকধাঁধায় পাঠিয়ে দিলে সমস্যা আরো জটিল হবে। কারণ আদালত রাজনৈতিক সংকটের স্থায়ী সমাধান দিতে পারে না। আদালত আইনের ব্যাখ্যা দেয়। কিন্তু রাজনৈতিক ম্যান্ডেট বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাজনীতির। আজ দেশের সামনে সেই দায়িত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

জুলাই সনদ শুধু একটি কাগজ নয়। এটি একটি প্রতিশ্রুতি। একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকার পূরণ করা না হলে শুধু একটি পরিষদ গঠন ব্যর্থ হবে না—একটি গণ-আকাঙ্ক্ষা ভেঙে পড়বে। আর ইতিহাস দেখিয়েছে, জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে দীর্ঘদিন আটকে রাখা যায় না। তাই এখন প্রয়োজন স্পষ্ট সিদ্ধান্ত। দ্রুত পদক্ষেপ। রাজনৈতিক সততা। কারণ গণরায় যদি আদালতের করিডোরে আটকে যায়, তাহলে গণতন্ত্রের পথ আরো সংকীর্ণ হয়ে পড়বে।

 

গণরায় বনাম টালবাহানা : রাজনীতির নতুন মোড় কি রাজপথ

আসলে বাংলাদেশের রাজনীতি আবার এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু একটাই—জুলাই সনদ। আর তার বাস্তবায়ন। বিরোধী দল বলছে, গণরায় উপেক্ষা করা হলে তারা রাজপথে নামবে। রোববার এই সংকট নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন—সংসদের ভেতরে সমাধান না হলে রাজপথে নামতে বাধ্য হবে বিরোধী দল। এটি কোনো আবেগি বক্তব্য নয়। এটি একটি রাজনৈতিক সতর্কবার্তা।

কারণ ইতোমধ্যে জামায়াতের নেতৃত্বে ১১-দলীয় একটি ঐক্য গড়ে উঠেছে। এই ১১ দলের মধ্যে রয়েছে জুলাই যোদ্ধাদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি। এই জোট ঘোষণা দিয়েছে—সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন না ডাকলে আন্দোলন হবে। অর্থাৎ সংকট এখন সংসদের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি দ্রুত রাজপথের দিকে এগোচ্ছে।

প্রশ্ন হলো—এখানে মূল সমস্যা কোথায়? সমস্যা খুবই সরল। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা। সেই পরিষদের অধিবেশন ডাকার কথা। কিন্তু সেটি এখনো হয়নি। বিরোধী দলের প্রশ্নও সরল। সংসদের সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নিয়েছেন। তাহলে সেই শপথের কী হবে? পরিষদের অধিবেশন কবে হবে? গণভোটের ফলাফল কি সরকার মানবে? এই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট উত্তর এখনো নেই। বরং দেখা যাচ্ছে একটি কৌশলগত বিলম্ব। কখনো আইনি ব্যাখ্যা। কখনো সাংবিধানিক জটিলতার কথা। কখনো আদালতের প্রসঙ্গ।

এভাবে সময় যাচ্ছে। রাজনীতিতে সময় শুধু সময় নয়। সময় মানে চাপ। সময় মানে সন্দেহ। সময় মানে উত্তেজনা। এই বাস্তবতা সরকারকে বুঝতে হবে। জুলাই সনদের গণভোট সেই ইচ্ছারই প্রকাশ। এখানে আরেকটি বিষয়ও উল্লেখযোগ্য। বিরোধী দল বলছে, তারা সংসদের ভেতরেই সমাধান চায়। তারা প্রথমেই রাজপথে যেতে চায় না।

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অবস্থান। কিন্তু তারা এটাও বলছে—সংসদে যদি জনগণের প্রত্যাশা প্রতিফলিত না হয়, তাহলে আন্দোলন অনিবার্য হবে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, এমন পরিস্থিতি খুব দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। একটি প্রশ্ন এখন অনেকের মনে ঘুরছে—সরকার কি বিষয়টিকে ইচ্ছাকৃতভাবে দীর্ঘায়িত করছে? যদি তা হয়, তাহলে তার ঝুঁকি আছে। কারণ আন্দোলনের রাজনীতি একবার শুরু হলে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যায়। ক্ষমতার প্রকৃত উৎস জনগণ। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সেই ক্ষমতার ধারক মাত্র। যখন জনগণ মনে করে তাদের ইচ্ছা উপেক্ষা করা হচ্ছে, তখন রাজনৈতিক সংঘাত তৈরি হয়। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি সেই সম্ভাবনার দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আরেকটি বাস্তবতা আছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর যে রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, সেখানে একটি নতুন সূচনার আশা ছিল। অনেকেই ভেবেছিলেন, এবার হয়তো রাজনৈতিক সংস্কারের পথ খুলবে। কিন্তু যদি সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হয়, তাহলে হতাশা তৈরি হবে। আর হতাশা রাজনীতিতে সবচেয়ে বিপজ্জনক জিনিস।

সরকার চাইলে এ সংকট সহজেই কমাতে পারে। সংসদে আলোচনার সুযোগ দিতে পারে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকার একটি রূপরেখা দিতে পারে।

গণভোটের ফলাফলকে সম্মান করার স্পষ্ট ঘোষণা দিতে পারে।

এতে উত্তেজনা কমবে। অন্যথায় পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যেতে পারে। কারণ বিরোধী দল ইতোমধ্যে রাজনৈতিক মঞ্চ প্রস্তুত করছে। ১১-দলীয় ঐক্য গড়ে উঠেছে। আন্দোলনের ভাষা উচ্চারিত হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে রাজপথ কখনো শূন্য থাকে না। যখন সংসদ দুর্বল হয়, তখন রাজপথ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই সত্য নতুন নয়।

তাই এখন প্রশ্ন একটাই—সংকটের সমাধান কি সংসদে হবে, নাকি রাজপথে? এই সিদ্ধান্তের দায় এখন মূলত সরকারের ওপরই।

 

লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন