Image description

ড. এম. মেসবাহউদ্দিন সরকার

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের ইতিহাস মূলত দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও গণতান্ত্রিক বিকাশের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। স্বাধীনতা অর্জনের পর রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য একটি গণতান্ত্রিক সংসদীয় ব্যবস্থার সূচনা করা ছিল সময়ের দাবি। সেই প্রেক্ষাপটে ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এটি ছিল নবগঠিত রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক যাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা এই সংসদে অংশগ্রহণ করেন এবং জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা ও স্বপ্নকে সামনে রেখে রাষ্ট্র পরিচালনার দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।

তখনকার সময়ে সংসদের কার্যক্রম ছিল তুলনামূলকভাবে সহজ এবং প্রযুক্তিগত দিক থেকে সীমিত। কাগজভিত্তিক নথি, ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ভোট গণনা, হাতে লেখা নোট এবং সরাসরি মৌখিক আলোচনার মাধ্যমেই অধিকাংশ কাজ পরিচালিত হতো। সংসদ সদস্যদের বক্তব্য, বিল উত্থাপন বা সংশোধনী প্রস্তাব প্রায় সবই ছিল কাগজে লেখা এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিচালিত। তবুও সেই সময়ের সংসদ ছিল প্রাণবন্ত এবং গণতান্ত্রিক চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। স্বাধীনতার পর দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের মধ্যেও সংসদ দেশের উন্নয়ন, সংবিধান রক্ষা এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এভাবে প্রথম সংসদের মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভিত্তি স্থাপিত হয় এবং সংসদীয় রাজনীতির একটি ঐতিহ্য তৈরি হতে শুরু করে।
বাংলাদেশের সংসদীয় কার্যক্রমের প্রাথমিক কয়েক দশক ছিল মূলত অ্যানালগ পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। তখন সংসদের কার্যক্রম পরিচালনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ছিল খুবই সীমিত। সংসদের কার্যবিবরণী সংরক্ষণ করা হতো টাইপ করা কাগজে বা ছাপানো বই আকারে। সংসদ সদস্যদের উপস্থিতি রেজিস্ট্রারে স্বাক্ষরের মাধ্যমে নথিভুক্ত করা হতো এবং ভোট গ্রহণ করা হতো কণ্ঠভোট বা ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে। সংসদের বিভিন্ন বিল, প্রস্তাব ও আলোচনার কাগজপত্র সংরক্ষণ করতে হতো বিশাল আর্কাইভে। এই সময়ে সংসদে অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছে।

বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা, সরকার ও বিরোধী দলের তীব্র বিতর্ক, ওয়াকআউট, এমনকি কখনো কখনো বয়কটও সংসদের ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। সামরিক শাসনের সময় সংসদের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছে। আবার গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পর সংসদ নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। সংসদে জাতীয় বাজেট উপস্থাপন, গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস, সংবিধান সংশোধন এবং জাতীয় সংকট নিয়ে আলোচনা এসবই ছিল সংসদের নিয়মিত কার্যক্রম। অ্যানালগ যুগে সংসদের প্রতিটি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর প্রয়োজন হতো। কারণ সবকিছু হাতে হাতে সম্পন্ন করতে হতো। তবুও এই সময়ের সংসদ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে এবং গণতান্ত্রিক চর্চাকে ধীরে ধীরে শক্তিশালী করেছে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পেতে শুরু করে এবং এর প্রভাব পড়ে সংসদীয় কার্যক্রমের ওপরও। নব্বইয়ের দশক থেকে ধীরে ধীরে সংসদে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়। সংসদ সচিবালয়ে কম্পিউটার ব্যবহারের মাধ্যমে নথি সংরক্ষণ, তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসে। সংসদ সদস্যদের জন্য তথ্য সংগ্রহ সহজ হয়ে যায় এবং বিভিন্ন গবেষণা ও বিশ্লেষণমূলক কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। পরে সংসদে ডিজিটাল অডিও-ভিডিও রেকর্ডিং ব্যবস্থা চালু করা হয়, যার মাধ্যমে সংসদের প্রতিটি অধিবেশনের বক্তব্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়।

সংসদের কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচারের জন্য টেলিভিশন সম্প্রচার ব্যবস্থাও চালু করা হয়। ফলে সাধারণ জনগণ সংসদের বিতর্ক ও আলোচনা সরাসরি দেখতে পারেন। সংসদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অনেকাংশে বৃদ্ধি পায়। সংসদ সদস্যদের জন্য ডিজিটাল ডাটাবেস, অনলাইন নথি সংরক্ষণ এবং ই-মেইলের মাধ্যমে যোগাযোগের সুযোগ সৃষ্টি হয়। প্রযুক্তির এই ধাপে ধাপে অগ্রগতি সংসদীয় কার্যক্রমকে আরও কার্যকর, দ্রুত এবং আধুনিক করে তোলে। ফলে সংসদ শুধু একটি রাজনৈতিক বিতর্কের ক্ষেত্রই নয়, বরং একটি তথ্যসমৃদ্ধ ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবেও গড়ে উঠতে শুরু করে।
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ একটি পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ডিজিটাল ব্যবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে। সংসদ সদস্যদের উপস্থিতি নথিভুক্ত করার জন্য ডিজিটাল কার্ড বা ইলেকট্রনিক পদ্ধতি চালু হয়েছে। বিল, প্রস্তাব, সংশোধনী এবং সংসদের অন্যান্য নথি এখন ডিজিটাল আকারে সংরক্ষণ করা হয় এবং প্রয়োজনে দ্রুত খুঁজে বের করা যায়। সংসদের প্রতিটি অধিবেশন আধুনিক অডিও-ভিডিও প্রযুক্তির মাধ্যমে ধারণ করা হয় এবং সংসদ টেলিভিশনের মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। সংসদের ওয়েবসাইট ও অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে নাগরিকরা সংসদের কার্যক্রম, আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন কমিটির কাজ সম্পর্কে তথ্য জানতে পারেন।

এছাড়া সংসদ সদস্যদের জন্য ডিজিটাল লাইব্রেরি, অনলাইন গবেষণা ডাটাবেস এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি সেবা চালু হয়েছে। এসব ব্যবস্থার ফলে সংসদের কাজ আরও দ্রুত, স্বচ্ছ ও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে। প্রযুক্তির কারণে সংসদের নথিপত্র সংরক্ষণ সহজ হয়েছে এবং অতীতের তথ্য দ্রুত অনুসন্ধান করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে সংসদীয় কার্যক্রমে দক্ষতা ও জবাবদিহিতা উভয়ই বৃদ্ধি পেয়েছে। এভাবে অ্যানালগ পদ্ধতির সংসদ ধীরে ধীরে একটি আধুনিক ডিজিটাল সংসদে রূপান্তরিত হয়েছে।
২০২৬ সালের ১২ মার্চ বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়েছে, যা দেশের সংসদীয় ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যোগ করেছে। স্বাধীনতার পর থেকে অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সংসদীয় কার্যক্রমে বহু পরিবর্তন এসেছে। অ্যানালগ পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে এখন সংসদ প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ব্যবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে। ভবিষ্যতের সংসদীয় কার্যক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত তথ্য বিশ্লেষণ এবং ডিজিটাল অংশগ্রহণের মতো নতুন প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। এর মাধ্যমে সংসদের কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ, দক্ষ এবং জনগণমুখী হয়ে উঠতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সংসদীয় কার্যক্রমকে অনেক বেশি কার্যকর করতে পারে।

সংসদে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তথ্য, নথি ও আইন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। এআই প্রযুক্তি এসব তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করে সংসদ সদস্যদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করতে পারে। এর ফলে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও তথ্যভিত্তিক ও বাস্তবসম্মত হবে। একইসঙ্গে সংসদীয় কার্যবিবরণী সংরক্ষণ, বক্তৃতা বিশ্লেষণ এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো চিহ্নিত করার ক্ষেত্রেও এআই বড় ভূমিকা রাখতে পারে। উন্নত তথ্য বিশ্লেষণ বা ডেটা অ্যানালিটিক্সের ব্যবহারও সংসদীয় কার্যক্রমকে নতুন মাত্রা দিতে পারে। দেশের অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশসহ বিভিন্ন খাতের তথ্য বিশ্লেষণ করে সংসদ সদস্যরা আরও কার্যকর নীতি নির্ধারণ করতে পারবেন। উদাহরণস্বরূপ, কোন অঞ্চলে শিক্ষা বা স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি রয়েছে তা ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে সহজেই বোঝা যাবে। ফলে সংসদে আলোচনার সময় বাস্তব সমস্যাগুলোর ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া সম্ভব হবে।
ডিজিটাল অংশগ্রহণও ভবিষ্যতের সংসদীয় ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হতে পারে। প্রযুক্তির মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকরাও সংসদীয় কার্যক্রম সম্পর্কে সরাসরি জানতে এবং মতামত দিতে পারবেন। অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে জনগণের মতামত সংগ্রহ করা হলে আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া আরও গণতান্ত্রিক ও অংশগ্রহণমূলক হবে। এতে জনগণ ও সংসদের মধ্যে একটি শক্তিশালী যোগাযোগ গড়ে উঠবে। তবে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাইবার নিরাপত্তা, তথ্যের গোপনীয়তা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি। সঠিক পরিকল্পনা ও নীতিমালার মাধ্যমে এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলে সংসদীয় কার্যক্রম আরও আধুনিক, স্বচ্ছ এবং কার্যকর হয়ে উঠবে।

তবে প্রযুক্তির উন্নয়নের পাশাপাশি সংসদীয় সংস্কৃতি, শালীনতা ও গঠনমূলক বিতর্কের পরিবেশ বজায় রাখাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ ব্যাপারে সংসদ সদস্যকে সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে ষ কারণ প্রতিটি শব্দই ডিজিটাল তথ্য-ভা-ারে সুরক্ষিত থাকছে। সুতরাং বলা যায়, ভবিষ্যতের সংসদ হবে প্রযুক্তিনির্ভর ও তথ্যসমৃদ্ধ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত তথ্য বিশ্লেষণ এবং ডিজিটাল অংশগ্রহণের মতো প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার সংসদীয় গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করবে এবং দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।


লেখক : অধ্যাপক ও আইটি গবেষক, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়