মেয়ের সঙ্গে ঈদের ছুটি শেষে ৬ জুন দিনাজপুর থেকে ঢাকায় ফিরেছিলেন ওষুধ কোম্পানির কর্মকর্তা সোহেলি ইসলাম। ভোরে বাস থেকে নেমে রিকশায় বাসার পথে যাচ্ছিলেন তিনি।
অথচ তার মৃত্যুর খবর প্রকাশের সময় পর্যন্ত ঘটনাটি পুলিশের কাছেই ছিল অজানা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, শুধু সোহেলি নয়, রাজধানীতে এ ধরনের ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন পথচারী, রিকশার যাত্রী, ব্যবসায়ী, ব্যাংকার থেকে শুরু করে নগদ টাকা বহনকারী কর্মীরাও। এদের মধ্যে কেউ থানায় যাচ্ছেন না, কেউ মামলা করতে চাইছেন না, আবার কেউ থানায় গেলেও ছিনতাইয়ের মামলা না হয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হচ্ছে। ফলে পুলিশের মামলার হিসাব রাজধানীর রাস্তায় ঘটে যাওয়া ছিনতাইয়ের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে পারছে না।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে ছিনতাইয়ের ১ হাজার ৬৭টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা রেঞ্জ ও ডিএমপি এলাকায় ৪৪৩টি। ডিএমপির ৫০ থানায় মামলা হয়েছে ১৮৯টি। কিন্তু এই সংখ্যা শুধু নথিভুক্ত মামলার হিসাব। বাস্তবে কত মানুষ ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন, তার পূর্ণ হিসাব পুলিশের খাতায় নেই।
বাস্তবে অস্ত্রের মুখে ছিনতাই, নথিতে ফোন হারানোর জিডি
১১ মে, বিকেল ৫টা ৩৭ মিনিট: মোহাম্মদপুরের চাঁন মিয়া হাউজিং এলাকায় রিকশা থামিয়ে এক কলেজছাত্রকে ঘিরে ধরে কয়েকজন। ধারালো অস্ত্র দেখিয়ে তার মুঠোফোন, টাকা, মানিব্যাগসহ অন্যান্য জিনিস নিয়ে যায় তারা। পুরো ঘটনাটি ধরা পড়ে সিসিটিভি ক্যামেরায়।
এরপর ভুক্তভোগীর বাবা থানায় মামলা করতে গেলে ছিনতাইয়ের মামলা না নিয়ে মুঠোফোন হারানোর ঘটনায় জিডি করতে বলা হয়। অস্ত্রের মুখে পথরোধ করে মালামাল কেড়ে নেওয়ার ঘটনা তখন পুলিশের নথিতে হয়ে যায় ‘মুঠোফোন হারানো’।
এ ধরনের ঘটনা ছিনতাইয়ের সরকারি হিসাবের একটি বড় পার্থক্য তৈরি করছে। কারণ, একটি ফোন অস্ত্রের মুখে কেড়ে নেওয়া হলেও নথিতে যদি সেটিকে শুধু ‘হারানো ফোন’ হিসেবে রাখা হয়, তাহলে সেটি ছিনতাইয়ের সংখ্যায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই।
একই চিত্র দেখা গেছে রাজধানীর মৌচাকে। গত ১৬ আগস্ট রাতে মৌচাক এলাকায় ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন নোমান ছিদ্দিক। ছিনতাইকারীরা তার মুঠোফোন নিয়ে যায় এবং তিনি গুরুতর আহত হন।
ঘটনার পর রমনা থানায় গিয়ে মামলা করতে চেয়েছিলেন নোমান। কিন্তু ছিনতাইয়ের মামলা না নিয়ে তার মুঠোফোন হারানোর ঘটনায় জিডি নেওয়া হয়। জিডিতে ফোনটি হারিয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। অথচ নোমানের ভাষ্য অনুযায়ী, সেটি হারায়নি, ছিনতাই হয়েছিল। অর্থাৎ একই ধরনের ঘটনা একাধিক জায়গায় ঘটছে। ছিনতাইয়ের শিকার ব্যক্তি থানায় গেলেও ঘটনাটি সব সময় ছিনতাই হিসেবে নথিভুক্ত হচ্ছে না।
ছিনতাইয়ের পর থানায় না যাওয়ার প্রবণতা
থানায় গিয়ে মামলার পরিবর্তে যেমন জিডি নেওয়ার ঘটনা ঘটছে, তেমনি ঘটনার পর অনেক ভুক্তভোগী থানায় যেতেও আগ্রহী হচ্ছেন না। রাজধানীতে ছিনতাইয়ের শিকার কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের কেউ থানায়ই যাননি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত জুনে মোহাম্মদপুর নবীনগর হাউজিংয়ের ৩ নম্বর সড়কের মাথায় বেড়িবাঁধে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন অটোমোবাইল কোম্পানির কর্মী ইমতিয়াজ ও সাদমান। তাদের মোবাইল ও মানিব্যাগ নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। সাদমান শুধু মোবাইলের জন্য জিডি করেন। ইমতিয়াজ জিডিও করেননি। তার যুক্তি, মামলা বা জিডি করেও হারানো জিনিস ফিরে পাওয়ার আশা নেই।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই অনীহার পেছনে রয়েছে এক ধরনের হতাশা। ভুক্তভোগীর কাছে যদি মনে হয় অভিযোগ করেও হারানো জিনিস ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই, তাহলে তিনি থানায় যাওয়ার ঝুঁকি বা ঝামেলা নিতে চান না। আর তিনি না গেলে সেই ছিনতাইয়ের কোনো সরকারি হিসাবও থাকে না।
রনজিলার ব্যাগের সঙ্গে থেমে গেল একটি পরিবারের স্বপ্ন
২৯ আগস্ট, ভোর: চোখের চিকিৎসার জন্য স্বামীর সঙ্গে বগুড়া থেকে ঢাকায় এসেছিলেন প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভীন। বাস থেকে নেমে রিকশায় করে ফার্মগেটের দিকে যাচ্ছিলেন তিনি। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনের সড়কে মোটরসাইকেলে আসা ছিনতাইকারীরা তার হাতব্যাগ ধরে টান দেয়।
হ্যাঁচকা টানে রিকশা থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন রনজিলা। পরে তার মৃত্যু হয়। বাড়িতে তখন অপেক্ষা করছিলেন তার নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া একমাত্র মেয়ে রাইসা। মায়ের মৃত্যুর খবর শুনে নির্বাক হয়ে যায় মেয়েটি।
রনজিলার ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, ছিনতাইয়ের ক্ষতি শুধু টাকা বা মুঠোফোন হারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মুহূর্তেই তছনছ হয়ে যায় একটি সাজানো সংসার।
এর আগে একইভাবে প্রাণ গেছে মুক্তা আক্তার ও সোহেলি ইসলামের। অর্থাৎ চলন্ত রিকশা বা অটোরিকশা থেকে ব্যাগ টানার মতো পরিচিত দৃশ্য এখন ক্রমশই হয়ে উঠেছে প্রাণঘাতী।
দিনের আলোতেও ছিনতাই
রাজধানীর ছিনতাইকে এখন শুধু রাতের অপরাধ ভাবার সুযোগ নেই। গত ছয় মাসের ২৩টি গুরুতর বা আলোচিত ঘটনার মধ্যে ভোররাত থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত ঘটেছে ৭টি। সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১২টার মধ্যে ঘটেছে ৮টি। অর্থাৎ এই দুই সময়েই ঘটেছে ১৫টি, প্রায় ৬৫ শতাংশ ঘটনা। তবে বাকি ৮টি ঘটনাও ঘটেছে সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে।
অন্যদিকে সকালের ঘটনায় রিকশা-অটোরিকশার যাত্রী ও নগদ টাকা বহনকারী ব্যক্তিদের লক্ষ্য করার প্রবণতা দেখা গেছে। সন্ধ্যা ও রাতে পথরোধ করে অস্ত্র দেখিয়ে বা আঘাত করে টাকা ও মুঠোফোন নেওয়ার ঘটনা বেশি দেখা গেছে।
ছিনতাইকারীর টার্গেটে নগদ টাকা
ছিনতাইকারীদের লক্ষ্য শুধু সাধারণ পথচারী নয়। অন্তত আটটি ঘটনায় ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠানের নগদ টাকা বহনকারী ব্যক্তিদের টার্গেট করা হয়েছে। ব্যাংকারের কাছ থেকে ১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা, বিকাশ এজেন্টের প্রায় ৩ লাখ টাকা, মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ীর ১৭ হাজার ডলার, পেট্রলপাম্পের ১ কোটি ২১ লাখ টাকা এবং একটি প্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষকের ২ লাখ ১ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা রয়েছে।
১০ আগস্ট, উত্তরা: ব্যাংকে টাকা জমা দিতে যাওয়ার পথে একটি গাড়ি থামিয়ে পেট্রলপাম্পের ১ কোটি ২১ লাখ ২৫ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয় মোটরসাইকেল আরোহী ছিনতাইকারীরা। পরে ডিবি ও র্যাব অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে।
৩১ আগস্ট, দুপুরের দিকে রাজধানীর ধানমন্ডি লেক এলাকায় স্বর্ণ কেনার কথা বলে ডেকে নিয়ে এক সৌদি প্রবাসীর ৩৯ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত রয়েছে কি না এবং ছিনতাই হওয়া টাকা উদ্ধারে অভিযান চলছে।
ছয় মাসে আলোচিত ছিনতাইয়ের ঘটনা
গত ছয় মাসে আলোচিত ২৩টি ছিনতাইয়ের ঘটনায় ২৭ জন সরাসরি ভুক্তভোগী হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৬ জন নারী। নারী ভুক্তভোগীর সংখ্যা কম হলেও চারটি প্রাণহানির মধ্যে তিনজনই নারী। এসব ঘটনায় অন্তত ১৭টিতে ধারালো বা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার কিংবা প্রদর্শনের তথ্য পাওয়া গেছে।
কিন্তু এই ২৩টি ঘটনাই পুরো চিত্র নয়। এর বাইরে কত মানুষ ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন, তাদের কতজন থানায় গেছেন, কতজন জিডি করেছেন, কতজন কোনো অভিযোগই করেননি, তার পূর্ণ হিসাব নেই।
একদিকে পুলিশের খাতায় সাত মাসে ১ হাজার ৬৭টি মামলা। অন্যদিকে রয়েছে ছিনতাইয়ের শিকার হয়েও থানায় না যাওয়া মানুষ, ছিনতাইকে ভিন্ন ঘটনা হিসেবে নথিভুক্ত করার বিষয় এবং অভিযোগ না করার প্রবণতা।
পুলিশের বক্তব্য: তালিকা আছে, গ্রেপ্তারও হচ্ছে
পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র ও জনসংযোগ শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, সারা দেশে ছিনতাইকারীদের তালিকা করা হয়েছে। প্রতিটি ইউনিটের কাছে তাদের এলাকার তালিকাও রয়েছে। সেই তালিকা অনুযায়ী অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। তবে তাদের অনেকেই জামিনে বের হয়ে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। এ কারণে পুলিশের সব ইউনিটকে টহল জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলার বদলে জিডি নেওয়া প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ ওসমান গণি বলেন, দায়িত্বে গাফিলতির সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া মাত্রই সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সুতরাং কোনো বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ইদানীং ছিনতাইকারীরা নির্দিষ্ট সময় ও জায়গা বেছে নেওয়ার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে বাস থেকে নেমে গন্তব্যে যাওয়ার পথে তুলনামূলক ফাঁকা জায়গায় সুযোগ নেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিষয়টি বিবেচনা করে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পয়েন্টে চেকপোস্ট ও নিয়মিত টহল অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
বিশেষজ্ঞের চোখে, শুধু গ্রেপ্তার আর পরিসংখ্যান যথেষ্ট নয়
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বাংলানিউজকে বলেন, রাজধানীতে ছিনতাইয়ের প্রকৃত চিত্র শুধু মামলা বা গ্রেপ্তারের পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। কারণ পুলিশের নথিতে থাকা পরিসংখ্যানের বাইরেও ছিনতাইয়ের বড় একটি বাস্তবতা থেকে যাচ্ছে। তাই পরিস্থিতি বুঝতে পুলিশি রেকর্ড, জিডি, অভিযোগ, মামলা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রম সমন্বিতভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, রাজধানীর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে পুলিশি টহল কার্যক্রমে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে গভীর রাত, ভোর এবং সন্ধ্যার মতো ছিনতাইপ্রবণ সময়ে পর্যাপ্ত টহল ও নজরদারি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নিলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন অনেক ক্ষেত্রে টেবিলকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা, কোন এলাকায় কখন ছিনতাই বেশি হচ্ছে এবং কী ধরনের কৌশলে অপরাধীরা সক্রিয় হচ্ছে, সেসব তথ্য বিশ্লেষণ করে টহল ও নজরদারির ব্যবস্থা করা জরুরি।
ড. তৌহিদুল হক বলেন, শুধু ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। ছিনতাইয়ের ঝুঁকিপূর্ণ স্থান ও সময় চিহ্নিত করে সেখানে দৃশ্যমান পুলিশি উপস্থিতি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী যেন থানায় গিয়ে সহজে অভিযোগ করতে পারেন এবং ছিনতাইয়ের ঘটনা যথাযথ ধারায় নথিভুক্ত হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। নইলে পুলিশের পরিসংখ্যানের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির পার্থক্য থেকেই যাবে এবং কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হবে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইন সংশোধনের পাশাপাশি কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি বলেও মনে করেন ড. তৌহিদুল হক।