Image description

রাজধানীর ‘নামিদামি’ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তিবাণিজ্য এবং কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করতে ২০১৯ সাল থেকে শিক্ষার্থী ভর্তিতে পরীক্ষার পরিবর্তে লটারি সিস্টেম চালু করেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এরপর থেকে শিক্ষার্থী ভর্তিতে বাণিজ্য বন্ধের পাশাপাশি কোচিং ব্যবসায় ধস নামে। তবে নতুন করে শিক্ষার্থী ভর্তিতে পরীক্ষা নেওয়ার পদ্ধতিতে ফিরে যাচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সোমবার (১৬ মার্চ) সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এই ঘোষণা দেন। এতে কোচিং ও ভর্তি বাণিজ্য বাড়বে বলে শঙ্কা প্রকাশ করছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা। 

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “বছরের প্রথমে অ্যাডমিশন যেটা হয়, সেখানে আমরা লটারির পরিবর্তে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করতে যাচ্ছি। আগাম জানিয়ে দিলাম, যেন সবাই সুযোগ পায়। আমরা লটারি সিস্টেম উইথড্র করলাম, দ্যাটস ইট।”  

এর আগে গত ১৫ মার্চ জাতীয় সংসদ অধিবেশনে কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ লটারি পদ্ধতির বিরোধিতা করেন। শিক্ষামন্ত্রীকে প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, “প্রাইমারি স্কুলে বাচ্চাদের ভর্তি করানোর ক্ষেত্রে ভর্তির প্রক্রিয়াটা পরিবর্তন করবো কিনা? নাকি আমরা লটারির মাধ্যমেই নেবো, নাকি মেরিটকেই আমরা সব সময় দমায়ে রাখবো?”

সেই দাবির পরদিনই মন্ত্রণালয় এই সিদ্ধান্ত জানালো। আগামী বছর থেকে পরীক্ষা নেওয়ার কথাও জানান শিক্ষামন্ত্রী। পরবর্তীকালে একইদিনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে ২০২৭ সাল থেকে সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষা বাতিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে বলেও জানানো হয়। 

সিদ্ধান্ত ঘিরে বিতর্ক ও শঙ্কা 

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্তে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা শঙ্কা প্রকাশ করছেন, পুনরায় ভর্তি পরীক্ষা চালু হওয়ায় নতুন করে শিক্ষার্থী বাণিজ্য শুরু হবে। প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি অভিভাবকরা কোচিংয়ের পেছনে লাখ লাখ টাকা খরচ করবেন এবং ভর্তি করাতে ব্যর্থ হলে বিত্তশালীরা ‘নামিদামি’ ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও মতিঝিলের আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অর্থের বিনিময়ে ভর্তি করাবেন। গরিব শিক্ষার্থীরা ‘নামিদামি’ স্কুলে ভর্তির সুযোগ পাবে না। কোচিং সেন্টারগুলো তাদের ঝিমিয়ে পড়া ব্যবসা চাঙা করতে আবারও সক্রিয় হবে। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের ৫ ডিসেম্বর ওই সময়ের শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রভাতী শাখার নবম শ্রেণির ছাত্রী অরিত্রী অধিকারীর আত্মহত্যার ঘটনায় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন উপস্থাপন করে বলেছিলেন, “প্রথম শ্রেণির ভর্তিতে ১০ লাখ টাকা লাগে।” 

ওইদিন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সংবাদ সম্মেলনে আরও বলেছিলেন, “আপনারা জানেন, আমি আগেও বলেছি। কোনও অভিভাবক অভিযোগ করেন না। সেখানে ১০ লাখ টাকা নিয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করেন। সেটা বন্ধ করতে আমরা লটারি সিস্টেম চালু করেছি। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে যে অনুমোদন (শিক্ষার্থী ভর্তির) তারা পায় তার চেয়ে অনেক বেশি ছাত্র-ছাত্রী তারা ভর্তি করে। তার মানে বোঝাই যায় কেন তারা অতিরিক্ত ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করেন।” 

শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা জানান, একসময় যেখানে-সেখানে লেখা থাকতো কোন স্যার কখন কোথায় পড়াবেন তা সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের নাম ও নম্বর দিয়ে বিজ্ঞাপন দেওয়া হতো। কিন্তু লটারি পদ্ধতিতে ভর্তি চালু হওয়ায় সেগুলো দেখা যেতো না। ঢালাওভাবে শিক্ষকরা কোচিং করাতেন না। আর প্রাথমিকে ভর্তির জন্য কোচিং সেন্টারে অভিভাবকদের দৌড়াতে হতো না। এতে কোচিং সেন্টারগুলোর ব্যবসা কমে গেলেও অভিভাবকদের অর্থের অপচয় বন্ধ হয়েছিল। 

এ বিষয়ে অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল কবির দুলু বলেন, “ভর্তি কার্যক্রম শুরু হবে নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে। অথচ মার্চ মাসের মাঝামাঝি পরীক্ষা পদ্ধতিতে প্রথম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণিতে ভর্তি শুরু হবে— মন্ত্রীর এ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে ভর্তি কোচিংয়ের জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু করা হয়েছে এবং ভর্তি বাণিজ্যও শুরু হবে যা বন্ধ করা হয়েছিল। কোনোভাবেই ‘নামকরা’ স্কুলের ভর্তি বাণিজ্য বন্ধ করতে পারবে না শিক্ষা মন্ত্রণালয়।”  

শিক্ষাবিদ ও গবেষকরা যা বলছেন 

সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী  বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “প্রথম শ্রেণিসহ অন্যান্য শ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি পদ্ধতি প্রত্যাহারের আগে মাঠের বাস্তবতা যাচাই করা উচিত ছিল। লটারি সাধারণত গ্রামের স্কুলের জন্য নয়, বরং রাজধানীর ‘নামিদামি’ স্কুলগুলোর ভর্তিজট সামলাতেই চালু হয়েছিল। আমরা দেখেছি ভর্তির জন্য যেখানে সেখানে কোচিংয়ের বিজ্ঞাপন। লটারি করার পর তা আর দেখা যায়নি।”  

তিনি আরও যোগ করেন, “একজন রিকশাচালক বা শ্রমজীবী মানুষের সন্তানের পক্ষে কোচিং করে নামি স্কুলে ভর্তি হওয়া প্রায় অসম্ভব। লটারির মাধ্যমে তাদের অন্তত একটি সুযোগ তৈরি হতো। এ ক্ষেত্রে লটারি ভালো সিস্টেম ছিল। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজিং কমিটির বিরুদ্ধে ভর্তিবাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে।” লটারি না থাকলে পরীক্ষার নাম করে ভর্তিবাণিজ্য ঠেকানোর ব্যবস্থা কী—সেই প্রশ্নও করেন তিনি। 

সমাধান হিসেবে তিনি ‘ক্যাচমেন্ট এরিয়া’ বা নিজ এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি বাধ্যতামূলক করার ওপর জোর দেন। তার মতে, ক্যাচমেন্ট এরিয়া শতভাগ নিশ্চিত করলে লটারি বা পরীক্ষা কোনোটিরই প্রয়োজন হতো না এবং কোচিং বাণিজ্যও স্থায়ীভাবে বন্ধ হতো। 

শিশুর আইকিউ কম থাকলে কি ওই শিশুকে স্কুলে আমরা ভর্তি করাবো না? নাকি তাকে স্কুল থেকে বাইরে রাখবো— এমন প্রশ্ন রেখে প্রাথমিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষায় সংস্কার, গুণগত পরিবর্তন ও মানোন্নয়নে গঠিত পরামর্শক কমিটির সভাপতি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “এটা খুব সুবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত হয়নি। এটা কোনও আদর্শ সমাধান নয়, কিন্তু আমার তাদের তো শিক্ষা ব্যবস্থাটাই অত্যন্ত বৈষম্যসংকুল।”  

অন্যদিকে প্রাথমিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষায় সংস্কার, গুণগত পরিবর্তন ও মানোন্নয়নে গঠিত পরামর্শক কমিটির সভাপতি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ এই সিদ্ধান্তকে ‘সুবিবেচনাপ্রসূত নয়’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি প্রশ্ন রাখেন, “কোনো শিশুর আইকিউ কম থাকলে কি তাকে আমরা স্কুলে ভর্তি করাবো না? নাকি তাকে শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখবো? আমাদের বৈষম্যমূলক শিক্ষা ব্যবস্থায় লটারি ছিল একটি ‘মন্দের ভালো’ সমাধান। এটি অন্তত দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মেধাবী শিশুদের ভালো স্কুলে পড়ার একটি সুযোগ করে দিয়েছিল।” 

ড. মনজুর আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আসল সমাধান হলো প্রতি এলাকায় মানসম্মত প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি স্কুল নিশ্চিত করা। কিন্তু যেহেতু তা নেই, তাই লটারিই ছিল অধিকতর ন্যায়সঙ্গত সমাধান। লটারি বাদ দিলে সেই পুরোনো বৈষম্যই ফিরে আসবে—যেখানে শিক্ষিত ও সচ্ছল মা-বাবার সন্তানরা সব সুবিধা পাবে, আর গরিবের সন্তানরা পিছিয়ে পড়বে। আমার ধারণা, প্রভাবশালী মহল, প্রশাসন এবং স্কুল কর্তৃপক্ষের বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষার্থেই লটারি বাতিলের এই তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আমি আশা করবো বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হবে।” 

শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “প্রথম শ্রেণিতে যেকোনও ধরনের ভর্তি পরীক্ষা চালুর সিদ্ধান্ত অনাকাঙ্ক্ষিত। প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্যাচমেন্ট এলাকার (পার্শ্ববর্তী এলাকা) সকল শিশু সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ে ভর্তি হবে— এটাই স্বাভাবিক। শিশুর শিক্ষাজীবন শুরু হওয়া উচিত একজন প্রশিক্ষিত ও উদ্দীপ্ত শিক্ষকের হাত ধরে। বিদ্যালয়ের দূরত্ব শিশুর শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।”

তিনি আরও বলেন, “আমাদের দেশে শিক্ষার মানের ভিন্নতার সুযোগ নিয়ে কিছু বিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার নামে কোচিং বাণিজ্য, ডোনেশনের বিনিময়ে ভর্তি ও জন্মসনদ জালিয়াতির মতো অনৈতিক চর্চা চালিয়ে আসছিল। লটারি প্রথা প্রবর্তনের ফলে এই শিক্ষা বাণিজ্যিকীকরণের লাগাম কিছুটা টানা সম্ভব হয়েছিল। এই সিদ্ধান্ত পুনরায় বহাল করলে মধ্যবিত্ত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। তাই বিষয়টি যথাযথ পর্যালোচনা না করে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা চালুর সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখার জন্য আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।”