রাজধানীর ৮৬ দশমিক ২৩ শতাংশ বাণিজ্যিক ভবনে নেই অনুমোদিত পার্কিং সুবিধা। ভবনের নকশা অনুযায়ী পার্কিংয়ের জায়গা রয়েছে মাত্র ১৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ ভবনে। গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকার দুই হাজার ৬৩৭টি ভবন পরিদর্শন করে উঠে এসেছে এমন চিত্র।
বিশেষ অভিযানের অংশ হিসেবে এসব ভবন পরিদর্শন করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। অভিযান শেষে গত মাসে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংস্থাটি।
পরিদর্শন করা ভবনগুলোর মধ্যে গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়ায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মালিকানাধীন চারটি মার্কেটও রয়েছে। এগুলো হলো—ঢাকা ট্রেড সেন্টার, গুলিস্তান ট্রেড সেন্টার, ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেট-১ ও ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেট-২। পাঁচ ও ছয়তলা এই ভবনগুলোর নকশা অনুযায়ী প্রতিটির বেজমেন্ট পার্কিং হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তব দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র।
ডিএসসিসির অসাধু কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় ঢাকা ট্রেড সেন্টার ও ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেট ১-এর বেজমেন্টে স্থায়ী কাঠামো তৈরি করে দোকান বানানো হয়েছে। গুলিস্তান ট্রেড সেন্টারের নির্মাণকাজ এখনও শেষ না হলেও সেটির বেজমেন্টেও দোকান ওঠানো হয়েছে। ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেট ২-এর তিনটি ভবনের বেজমেন্ট ছয় বছর আগে একবার উদ্ধার করা হয়েছিল। এখন আবার সেখানে দোকান নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পার্কিং না থাকায় গুলিস্তানের ব্যস্ততম সড়কে বিভিন্ন যানবাহন থেকে মার্কেটের মালামাল ওঠানামা করানো হয়। মার্কেটের গাড়ি রাস্তার একাংশ দখল করে রাখায় দীর্ঘ যানজটে ভোগান্তি পোহাতে হয় এই রুটে চলাচলকারীদের।
চলতি বছরের ২৭ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত রাজউকের সংশ্লিষ্ট জোনের ইমারত পরিদর্শক ও সহকারী অথরাইজড অফিসারদের সমন্বয়ে গঠিত ৪৪টি বিশেষ টিম রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিন পরিদর্শন চালায়। এরমধ্যে গুলশান, বনানী, তেজগাঁও, প্রগতি সরণি, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, পান্থপথ, কারওয়ান বাজার, পল্টন ও মতিঝিলের মতো এলাকাগুলো রয়েছে।
পরিদর্শনে দেখা যায়, দুই হাজার ৬৩৭টি বাণিজ্যিক ভবনের মধ্যে মাত্র ৩৬৩টিতে নকশা অনুযায়ী পার্কিং সুবিধা রয়েছে। ৫৩২টিতে বিদ্যমান পার্কিং এলাকা পার্কিং হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এক হাজার ৬৮টি ভবনে পার্কিংয়ের জায়গায় স্থায়ী কাঠামো তুলে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। ২১৬টি ভবনে অস্থায়ী কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। আর ৪৫৮টি ভবন কর্তৃপক্ষ পরিদর্শনের সময় কোনো অনুমোদিত নকশা দেখাতে পারেনি। এসব ভবনে পার্কিংয়ের কোনো ব্যবস্থাও নেই।
রাজধানীর যানজট নিরসনে চলতি বছরের মার্চে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিপরিষদের বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় জানানো হয়, অনেক বেসরকারি ভবনের অনুমোদিত পার্কিং স্পেস নিয়মবহির্ভূতভাবে দোকান বা গোডাউন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ কারণে নগরবাসী রাস্তায় গাড়ি পার্কিং করতে বাধ্য হচ্ছে, যা যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ।
সভায় রাজউক চেয়ারম্যানকে রাজধানীর ভবন ও বেজমেন্ট পার্কিংসংক্রান্ত বিস্তারিত প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
পান্থপথের বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সের এক হাজার ৮০০ পার্কিংয়ের মধ্যে এক হাজার ১৫০টি কমানোর জন্য রাজউক বরাবর আবেদন করা হয়। গত মার্চে মন্ত্রিপরিষদের বিশেষ সভায় ওই আবেদন নাকচ করে বেজমেন্ট পার্কিং অক্ষুণ্ন রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
এ ছাড়া সচিবালয়ে কর্মরত উপসচিব থেকে তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য বায়তুল মোকাররম মসজিদের বেজমেন্টের ৪৫০টি পার্কিং ব্যবহারের লক্ষ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে সভাপতি করে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘মন্ত্রিসভার বৈঠকের পরও বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান প্রধানমন্ত্রীর কাছে বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সের ১৮০০ পার্কিংয়ের মধ্যে ১১৫০টি কমানোর জন্য ফের আবেদন করেন। সে আবেদনও গ্রহণ হয়নি। পরে তারা একটি রিভাইজড প্ল্যানের আবেদন করে, সেটিরও ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে বিধি মোতাবেক জবাব দেওয়া হবে।’
রাজউক চারটি দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে পার্কিংয়ে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা গত ১৫ এপ্রিলের মধ্যে স্বেচ্ছায় সরিয়ে নিতে ভবন মালিক ও ব্যবহারকারীদের সময় বেঁধে দিয়েছিল। নির্ধারিত সময়ের পর ১৬ এপ্রিল থেকে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়। ঈদুল আজহার আগে ১৬টি বহুতল ভবনের ১৩১টি পার্কিং স্পেস থেকে অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করা হয়।
রাজউকের পরিচালক (প্রশাসন) তার প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, পার্কিংয়ের সব অনিয়ম অপসারণ করে নকশা অনুযায়ী পার্কিং নিশ্চিত করতে রাজউকের আনুমানিক আরও চার মাস সময় লাগবে।
বাণিজ্যিক ভবনের পার্কিং নিশ্চিতের এই ক্র্যাশ প্রোগ্রাম শেষ হলেই দ্বিতীয় পর্যায়ে রাজধানীর আবাসিক ভবনগুলোতেও একইভাবে চিরুনি অভিযান চালানো হবে বলে জানিয়েছে রাজউক।
সংস্থাটির চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘যানজট নিরসনে গুরুত্ব দিয়ে যেসব ভবনের পার্কিংয়ে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চলছে সেগুলোতে ধারাবাহিক অভিযান চালানো হচ্ছে। কিন্তু এমন ভবনের সংখ্যা অনেক। একসঙ্গে অভিযান চালানো সম্ভব নয়। তবে পর্যায়ক্রমে অভিযান চলছে।’