বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জলপথ হরমুজ প্রণালী সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। দেশটির সামরিক বাহিনীর অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, প্রতিরক্ষা বাহিনীর লাইভ মহড়ার কারণে সাময়িকভাবে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করা হয়েছে। মহড়া শেষ হলে ফের এটি খুলে দেওয়া হবে। তবে কবে মহড়া শেষ হবে সে সংক্রান্ত কোনো তথ্য বা ইঙ্গিত আইআরজিসির বিবৃতিতে দেওয়া হয়নি।
এদিকে মাত্র একদিনের ব্যবধানে মধ্যপ্রাচ্যে ৫০টিরও বেশি যুদ্ধবিমান নিয়ে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। এরমধ্যে রয়েছে এফ-২২, এফ-৩৫ এবং এফ-১৬। এগুলোর সঙ্গে একাধিক রিফুয়েলার বিমানও নিয়ে আসা হয়েছে। যেগুলো মাঝআকাশে সাধারণ ও যুদ্ধবিমানকে জ্বালানি দিয়ে থাকে। খবর সিএনএন ও ইরনার।
হরমুজ প্রণালী যে বন্ধ করা হতে পারে এমন ইঙ্গিত গত মঙ্গলবার দিয়েছিল রেভোল্যুশনারি গার্ড। আইআরজিসির কমান্ডার ও মুখপাত্র রিয়ার অ্যাডমিরাল আলীরেজা তাঙ্গসিরি এক বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন, হরমুজ প্রণালীতে লাইভ মহড়ার আয়োজন করতে যাচ্ছে। যতদিন এই মহড়া চলবে ততদিন এই প্রনালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল বন্ধ থাকবে। বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ কবে খুলে দেওয়া হবে তা রাজনৈতিক নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে, বিবৃতিতে বলেছেন আলীরেজা তাঙ্গসিরি।
উল্লেখ্য, আরব সাগর এবং পারস্য উপসাগরকে যুক্ত করা হরমুজ প্রণালী আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ রুট। প্রতিদিন বিশ্বে যত তেল ও তরল গ্যাসবাহী জাহাজ চলাচল করে, তার ২০ শতাংশই যাতায়াত করে এই প্রণালী দিয়ে। ইরানের পরমাণু প্রকল্প নিয়ে গত ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে আলোচনা শুরু হয়েছে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে। পরমাণু ইস্যুতে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিতীয় দফার বৈঠকের পর গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
তিনি বলেছেন, জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনা কিছু অগ্রগতি হলেও তার মানে এই নয় যে খুব শিঘ্রই চুক্তি হবে। তবে চুক্তির জন্য পথের সূচনা হয়েছে। দুই পক্ষের এখনো কিছু বিষয় রয়েছে যা নিয়ে কাজ করতে হবে। আরাগচি জানিয়েছেন, গত দফার তুলনায় এবার খুব গম্ভীর আলোচনা হয়েছে এবং যে পরিবেশে আমরা আমাদের মতামত বিনিময় করেছি তা ছিল ফলপ্রসূ। তিনি আরও বলেন, কিছু বিষয়ে আমরা একমত হয়েছি এবং কিছু মূল নীতিও ঠিক করেছি। এই নীতির ওপর ভিত্তি করে আমরা শেষ পর্যন্ত একটি নথি প্রণয়নের দিকে এগোব। আমরা আশা করি এটি সম্ভব হবে। তবে নথি প্রণয়নের পর্যায়ে পৌঁছালে প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই ধীরে চলবে।
পরমাণু অস্ত্র বিষয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তেহরান বারবার স্পষ্ট করেছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা সংগ্রহ করতে চায় না। তার ভাষায়, এ ধরনের অস্ত্র ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা নীতিতে কোনো স্থান পায় না। তিনি আরও বলেন, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) সদস্য দেশগুলোর গবেষণা, উৎপাদন ও শান্তিপূর্ণ কাজে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের অধিকার স্বীকৃতি দেয়, যার মধ্যে সমৃদ্ধকরণও অন্তর্ভুক্ত। তার কথায়, এই অধিকার স্বাভাবিক, আলোচনার বাইরে এবং আইনি দিক থেকে বাধ্যতামূলক। দ্বিতীয় দফার আলোচনা শেষ হওয়ার পর রাষ্ট্রীয় টিভিকে আব্বাস আরাগচি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তৃতীয় দফা আলোচনার জন্য এখনো কোনো নির্দিষ্ট তারিখ ঠিক হয়নি। তার কথায়, তৃতীয় দফার জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা হয়নি। তিনি আরও জানান, সম্ভাব্য চুক্তির খসড়া তৈরি নিয়ে দুই পক্ষ আরও কাজ করবে। এরপর খসড়া বিনিময় করা হবে এবং তারপর তৃতীয় দফা আলোচনার তারিখ ঠিক করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হুমকি নিয়ে আব্বাস আরাগচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে অবিলম্বে ইরানের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের হুমকি দেওয়া বন্ধ করতে হবে। এদিকে এক্সিওসকে মার্কিন এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত ২৪ ঘণ্টায় মধ্যপ্রাচ্যে ৫০টিরও বেশি যুদ্ধবিমান নিয়ে আসা হয়েছে। এর আগে ওই অঞ্চলে বিমানবাহী রণতরীসহ অন্যান্য যুদ্ধজাহাজের বিশাল বহর জড়ো করেছে মার্কিন সেনারা। এরমধ্যে গেলো যুদ্ধবিমান। গত জানুয়ারিতে ইরানে ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। যা কঠোর হস্তে দমন করে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী। বিক্ষোভকারীদের ওপর মারণাস্ত্র ব্যবহারের অজুহাত দেখিয়ে ইরানের চারপাশে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করছে যুক্তরাষ্ট্র।