সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে গত সপ্তাহে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন যে বিচারক, তাকেও কয়েক বছর আগে অনুপস্থিতিতেই মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল আসাদ সরকার। সিরিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে এর চেয়ে বড় ‘নাটকীয়’ ঘটনা খুঁজে পাওয়া কঠিন।
বিচারক ফখর আল-দিন আল-আরিয়ান ২০১৩ সালে আসাদ সরকারের বিচার মন্ত্রণালয় থেকে পদত্যাগ করে বিরোধীদের নিয়ন্ত্রিত বিচারব্যবস্থায় যোগ দিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হয়ে রাশিয়ায় পালিয়ে যাওয়ার পর তাকে আবার বিচারকের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তার হাতে আসাদের মৃত্যুদণ্ড তাই শুধু একটি মামলার রায় নয়; এটি দীর্ঘদিনের দমন-পীড়নের পর সিরিয়ায় নতুন বিচারব্যবস্থা ও ন্যায়বিচারের ধারণা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টারও প্রতীক।
আসাদ ও তার ছোট ভাই মাহেরের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পর সিরিয়ার কিছু মানুষ রাস্তায় নেমে উল্লাস করেছেন। অনেকে ঘটনাটিকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে অভিহিত করেছেন। কারণ, বাশার আল-আসাদ এবং তার বাবা হাফেজ আল-আসাদের কয়েক দশকের শাসনে সিরিয়ায় ক্ষমতাসীনদের দায়মুক্তির যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, এই রায়ের মধ্য দিয়ে অন্তত তার একটি বড় প্রতীকী ভাঙন ঘটেছে।

আসাদের রায় ঘোষণার পর উচ্ছ্বসিত সিরিয়ানদের একাংশ। ছবি : রয়টার্স
তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আসাদ বর্তমানে রাশিয়ায় নির্বাসনে রয়েছেন। তাকে ফেরত পাঠানোর সম্ভাবনাও খুবই কম।তবু রায়টির রাজনৈতিক গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক ইব্রাহিম আল-আসিল বলেছেন, এই সাজা ‘রাজনৈতিক ও আবেগগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ’। তবে তার মতে, এটি সিরীয়দের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত ন্যায়বিচারের মাত্র একটি অংশ।
জাতিসংঘের দৃষ্টিতে, ক্ষমতা পরিবর্তনের পর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া বা রূপান্তরকালীন ন্যায়বিচারের চারটি সমান গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি রয়েছে—ন্যায়বিচার, সত্য উদ্ঘাটন, ক্ষতিপূরণ এবং একই ধরনের অপরাধ যেন আর না ঘটে, তার নিশ্চয়তা।
আসাদের রায় কতটা নতুন সিরিয়ার প্রতিচ্ছবি?
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আসাদ মস্কোয় পালিয়ে যাওয়ার সময় তার পরিবার ছয় দশকের বেশি সময় ধরে গড়ে তোলা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও বিচারব্যবস্থা রেখে যান। ফলে নতুন সিরিয়ার সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো—আসাদ আমলের বিচারব্যবস্থা থেকে তারা কতটা আলাদা একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে।
আল-আসিলের মতে, আসাদের বিরুদ্ধে এই রায় সেই প্রশ্নের প্রথম পরীক্ষা। নতুন রাষ্ট্রে কি নতুন নিয়ম ও প্রতিষ্ঠান তৈরি হচ্ছে, যেগুলো আসাদ আমলের বিচারব্যবস্থা এবং আসাদ-পরবর্তী বিচারব্যবস্থার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য তৈরি করবে—এখন সেটিই দেখার বিষয়।
তবে পট পরিবর্তনের পর ন্যায়বিচারের মানদণ্ড নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সিরিয়াকে অনুপস্থিতিতে বিচার এবং মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে।
রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে মস্কো পলাতক আসাদ। ফাইল ছবি / রয়টার্স
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধগুলোকে দেশটির আইনে অন্তর্ভুক্ত করা এবং বিচারব্যবস্থার সংস্কারেরও দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।সিরিয়ার বিচার মন্ত্রণালয় অবশ্য এই সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, বিচারপ্রক্রিয়া সিরিয়ার আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয়েছে এবং এতে ভুক্তভোগী ও তাদের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল।
আসাদ সরকারের অপরাধ নথিবদ্ধ করে আসা সিরিয়ান নেটওয়ার্ক ফর হিউম্যান রাইটসের প্রতিষ্ঠাতা ফাদেল আবদুল গানি মনে করেন, একটি মামলার রায় দিয়ে এই প্রক্রিয়া শেষ করা যাবে না।
তার ভাষায়, অনেকগুলো মামলা প্রয়োজন, বিশেষ করে সাবেক সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে। এতে ভুক্তভোগীদের ক্ষোভ কমবে এবং সিরিয়া সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে।
শুধু আসাদ নয়, বিচার চান হাজারো পরিবার
সিরিয়ার জন্য ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি কেবল প্রেসিডেন্ট বা শীর্ষ কর্মকর্তাদের শাস্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বছরের পর বছর ধরে নিখোঁজ থাকা স্বজনদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, কোথায় তাদের কবর—এসব প্রশ্নের উত্তরও চান অসংখ্য পরিবার।
আল-আসিল বলেছেন, স্থানীয় পর্যায়েও আরও বিচার হওয়া প্রয়োজন। কারণ, সিরিয়ার প্রতিটি পরিবারের কাছে ন্যায়বিচারের অর্থ এক নয়। হোমসের একটি পরিবারের কাছে ন্যায়বিচারের প্রয়োজন যেমন হতে পারে, দারার একটি পরিবারের কাছে তা ভিন্ন হতে পারে।
২০১১ সালে শুরু হওয়া সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে কয়েক লাখ মানুষ নিহত হয়েছেন, বাস্তুচ্যুত হয়েছেন আরও কয়েক কোটি মানুষ। দীর্ঘ যুদ্ধ দেশটির অর্থনীতিকেও বিপর্যস্ত করেছে।
আসাদ সরকারের বন্দিশালায় গুম স্বজনের খোঁজ করছেন এক সিরিয়ান নারী। ছবি : রয়টার্স
ফলে বিচার শুধু অপরাধীদের শাস্তির প্রশ্ন নয়; নিখোঁজদের সন্ধান, নিহতদের পরিচয়, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের অপরাধ প্রতিরোধ—সবকিছুকেই এর আওতায় আনতে হবে।যদিও আসাদকে রাশিয়া থেকে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তাকে কখনো সিরিয়ার হাতে তুলে দেবেন—এমনটা খুব কম মানুষই মনে করেন। মৃত্যুদণ্ডের রায় রুশ আইনের অধীনে আসাদের প্রত্যর্পণকে আরও জটিল করে তুলেছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, আসাদকে হস্তান্তর না করার সিদ্ধান্ত আইনের চেয়ে রাজনৈতিক হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
কিছু জায়গায় আশার আলোও আছে
তারপরও নতুন সিরিয়াকে ঘিরে সব চিত্রই নেতিবাচক নয়। আসাদ-পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হিসেবে উঠে এসেছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা।
ফাদেল আবদুল গানি বলেছেন, এখন সিরীয়রা স্বাধীনভাবে কথা বলতে ও সরকারের সমালোচনা করতে পারছেন। এমনকি উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও সমালোচনা করা যাচ্ছে এবং এর জন্য আগের মতো প্রতিশোধের মুখে পড়তে হচ্ছে না। নতুন সরকারেরও তিনি নিয়মিত সমালোচনা করেন বলে জানিয়েছেন।

আল শারার সঙ্গে সাম্প্রতিক সফরের সময় করমর্দনরত ফরাসি প্রেসিডেন্ট। ছবি : রয়টার্স
২০২৫ সাল থেকে প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে থাকা সাবেক বিদ্রোহী নেতা আহমেদ আল-শারা ক্ষমতায় আসার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সিরিয়ার সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছেন।
আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সিরিয়ার সম্পর্ক জোরদার হয়েছে এবং ওয়াশিংটন দেশটির ওপর আরোপিত অধিকাংশ কঠোর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে। আসাদ সরকারের দমন-পীড়নের সময় দামেস্কের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা কয়েকটি আরব দেশের সঙ্গেও নতুন করে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।
জুলাইয়ে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁ সিরিয়া সফর করেছেন, যা ২০২৪ সালের পর কোনো পশ্চিমা নেতার প্রথম সিরিয়া সফর।
রাশিয়ার সঙ্গেও নতুন সমঝোতার পথে এগিয়েছে দামেস্ক। কয়েক দিন আগে আহমেদ আল-শারা সরকারের সঙ্গে মস্কোর একটি চুক্তি হয়েছে। এর আওতায় সিরিয়ার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে থাকা রাশিয়ার দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি সিরিয়ার নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার কথা রয়েছে।
কিন্তু জাতীয় ঐক্যের সংকট কাটেনি
তবে এসব অগ্রগতির মধ্যেও সিরিয়ার সামনে সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জগুলোর একটি রয়ে গেছে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা।
দক্ষিণ সিরিয়ায় দ্রুজ সম্প্রদায়ের সঙ্গে সিরিয়ার সেনাবাহিনীর উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। প্রায়ই তা প্রাণঘাতী সংঘাতে রূপ নিচ্ছে।
আল-আসিলের মতে, এ ক্ষেত্রে এখনো কোনো বড় অগ্রগতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। তার অভিযোগ, সরকার বিষয়টিকে মূলত নিরাপত্তা ও সামরিক সমস্যা হিসেবে দেখছে। অথচ এর সঙ্গে গভীর সামাজিক সমস্যাও জড়িত।
সিরিয়ার উপকূলীয় এলাকায় বিদ্রোহী গোষ্ঠীর তিন সদস্য। ছবি : রয়টার্স
দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আরব ও কুর্দি জনগোষ্ঠীর মধ্যেও টানাপোড়েন রয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় আলাউই সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্ন সহিংসতার ঘটনাও সামাল দিতে হচ্ছে সরকারকে।
এই বাস্তবতায় শুধু আদালতে বিচার করলেই সিরিয়ার সংকটের সমাধান হবে না। প্রয়োজন একটি বিস্তৃত জাতীয় সংলাপ। সেখানে জাতিগোষ্ঠী ও সংখ্যালঘুদের মধ্যকার বিভাজন নিয়ে আলোচনা যেমন হতে হবে, তেমনি আলোচনা করতে হবে—সিরিয়া আসলে কী ধরনের রাষ্ট্র হতে চায় এবং তার ভবিষ্যৎ কেমন হবে।
আল-আসিলের ভাষায়, সেই জাতীয় সংলাপ এখনো শুরু হয়নি।
আসাদের পতনের পর আসল পরীক্ষা এখন
আসাদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় তাই সিরিয়ার জন্য একই সঙ্গে অতীতের হিসাব চুকানোর প্রতীক এবং ভবিষ্যতের কঠিন পরীক্ষার শুরু। দীর্ঘ স্বৈরশাসনের পর প্রথমবারের মতো সাবেক শাসকের বিরুদ্ধে আদালতের রায় এসেছে—এটি নিঃসন্দেহে বড় পরিবর্তন।
কিন্তু সত্যিকারের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হলে আরও বহু অপরাধের বিচার, নিখোঁজদের তথ্য প্রকাশ, ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ এবং ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন বন্ধের নিশ্চয়তা দিতে হবে।

ওভাল অফিসে ট্রাম্পের সঙ্গে আল শারা। ছবি : সংগৃহীত
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পুনর্গঠন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কিছু অগ্রগতি নতুন সিরিয়াকে আশার জায়গাও দেখাচ্ছে। কিন্তু জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক বিভাজন, নিরাপত্তা সংকট এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রভাব এখনো দেশটির সামনে বড় বাধা।
অর্থাৎ, আসাদের পতন সিরিয়ার পরিবর্তনের শেষ নয়; বরং একটি নতুন সিরিয়া গড়ে তোলার কঠিন যাত্রার শুরু।
সিএনএন থেকে অনূদিত, ভাষান্তর : মাহমুদুল হাসান রিফাত