Image description

বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এ খাত থেকে। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে খাতটির প্রধান দুই রপ্তানি বাজার—ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানির গতি শ্লথ হতে দেখা গেছে। খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, টানা কয়েক মাসের দুর্বলতার পর ঘুরে দাঁড়ানোর যে আভাস দেখা গিয়েছিল, তা ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রধান বাজারে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় রপ্তানিকারকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানি আয়ের প্রায় ৭০ শতাংশই নির্ভর করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর ওপর। তাই এসব প্রধান বাজারে চাহিদা হ্রাস পাওয়ায় দেশের রপ্তানি খাতের পাশাপাশি শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনও চাপে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে মনে করছেন শিল্প উদ্যোক্তা ও অর্থনীতিবিদরা।

তাদের মতে, প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোয় চাহিদা কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু রপ্তানির পরিমাণেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বাংলাদেশি পোশাকের গড় রপ্তানি মূল্যও কমেছে। একই পরিস্থিতিতে চীন, তুরস্ক, ভারত ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও তাদের তুলনায় বাংলাদেশের পতনের হার সবচেয়ে বেশি।

ইইউ বাজারে চলতি বছরের প্রথম চার মাস পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত চার মাসে এই বাজারে শীর্ষ ১০ পোশাক সরবরাহকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে সবচেয়ে বেশি। ইইউর পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য বিশ্লেষণে এ চিত্র পাওয়া গেছে।

ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে ইইউতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ কমেছে। এ সময় রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬০৮ দশমিক ৬২ কোটি ইউরো, যেখানে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ছিল ৭৫৪ দশমিক ৪৭ কোটি ইউরো। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ১৪৬ কোটি ইউরো রপ্তানি আয় কমে গেছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, একক মাস হিসেবে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ইইউতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ দশমিক ৫৩ শতাংশ কমেছে। এ সময় রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪৯ দশমিক ৪৭ কোটি ইউরো, যেখানে ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ছিল ১৮৫ দশমিক ৭৫ কোটি ইউরো।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ইইউভুক্ত দেশগুলো চলতি বছরের একই সময়ে বিশ্ববাজার থেকে দুই হাজার ৭৭৭ কোটি ইউরোর তৈরি পোশাক আমদানি করেছে। এই আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ দশমিক ৪২ শতাংশ কম। অর্থাৎ ইইউর সামগ্রিক পোশাক আমদানি হ্রাসের তুলনায় বাংলাদেশ থেকে আমদানি পতনের হার বেশি।

তথ্যে আরো দেখা যায়, শীর্ষ সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে চীন থেকে ইইউর পোশাক আমদানি কমেছে চার দশমিক ৭০ শতাংশ, তুরস্ক থেকে কমেছে ১৬ দশমিক ৬০ শতাংশ এবং ভারত থেকে কমেছে ১২ দশমিক ১০ শতাংশ। অন্যদিকে ভিয়েতনাম থেকে কমেছে মাত্র শূন্য দশমিক ৭০ শতাংশ। এ রকম শীর্ষ ১০ সরবরাহকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশ থেকেই আমদানি কমেছে সবচেয়ে বেশি।

বাংলাদেশের একক বৃহত্তম বাজার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেল (ওটেক্সা) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালের তুলনায় চলতি বছরের এপ্রিল মাসে দেশটির বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় কমেছে ১৭ দশমিক ২১ শতাংশ। রপ্তানিকারকরা বলছেন, গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপ করা শুল্কই এই বড় পতনের প্রধান কারণ।

ওটেক্সার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম চার মাস জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে মোট ২৯৮ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ দশমিক ২৪ শতাংশ কম। শুধু রপ্তানি আয় নয়, ইউনিটপ্রতি গড় মূল্য এবং রপ্তানির পরিমাণ—উভয় ক্ষেত্রেই হ্রাস পেয়েছে। এই সময়ে ইউনিটপ্রতি দাম কমেছে দুই দশমিক ৪৫ শতাংশ এবং রপ্তানির ভলিউম কমেছে ৯ দশমিক ০১ শতাংশ। ফলে মূল্য ও পরিমাণ—উভয় সূচকের পতনের কারণে মোট আয় সংকুচিত হয়েছে।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক আমদানির সামগ্রিক প্রবণতাই বর্তমানে নিম্নমুখী। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সুদের হারের কারণে মার্কিন ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় দেশটিতে সামগ্রিকভাবে পোশাক আমদানি ১২ শতাংশ কমেছে। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রপ্তানি কমা একক কোনো ঘটনা নয়; বরং চাহিদা সংকোচনের প্রতিফলন।

তারা আরো বলেন, তবে উদ্বেগের জায়গা তৈরি করেছে আঞ্চলিক প্রতিযোগীদের সাফল্য। একই সময়ে ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তাদের রপ্তানি এক দশমিক ৩১ শতাংশ বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। আরো চমক দেখিয়েছে কম্বোডিয়া, যেখানে তাদের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১৪ দশমিক ০৭ শতাংশে। ফলে বাংলাদেশের বাজার হিস্যা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ আরো কঠিন হয়ে উঠেছে।

ওটেক্সার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চীন ও ভারতের রপ্তানিতে বড় ধরনের পতন বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে উল্লেখিত সময়ে চীনের রপ্তানি আয় কমেছে ৫০ দশমিক ২১ শতাংশ এবং ভারতের কমেছে ২৮ দশমিক ০৩ শতাংশ।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি আয় সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে (জুলাই-জুন) আগের অর্থবছরের তুলনায় শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ কমে ৪৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। অর্থবছরের শেষ মাস জুনে রপ্তানিতে প্রায় ২৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও আগের ১১ মাসের ঋণাত্মক প্রভাব কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। ফলে সরকারের নির্ধারিত ৫৫ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে রয়েছে দেশের রপ্তানি খাত।