Image description

Burhan Uddin (বুরহান উদ্দিন)


 ইরানের উপর বর্তমানে যে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন এটা হলো, নাইন ইলেভেনের পরে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্টের ঘোষণা মোতাবেক ১৯তম ক্রুসেড। তাঁরা ২০০১ সালে আমাদের বিরুদ্ধে ক্রুসেড ঘোষণা করে একের পর এক দেশ দখল করে নিলেও আমরা আমাদের ঘুম থেকেই এখনো উঠতে পারিনি। নেতানিয়াহু প্রকাশ্যেই সকল মুসলিম দেশের একই পরিণতির কথা বার বার বলে আসছে।
 
এখন কথা হল, এই ক্রুসেড মোকাবেলা করার সামর্থ্য আমাদের আছে কিনা ? আমি মনে করি অবশ্যই আছে এবং এখনো যদি মুসলিম উম্মাহ তাঁর সম্ভাবনার অর্ধেকও কাজে লাগাতে পারে তাহলে অতীতের মত এই ক্রুসেডেও তাঁদেরকে পরাজিত করা সম্ভব।
 
এখন আসুন এ বিষয়ে আলোচনা করা যাক- আমাদের পক্ষে কী কী করা সম্ভব এবং কোন কোন বিষয়ে জনমত গঠন করা যেতে পারে,
১. উম্মাহর সর্বোচ্চ ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগানো
বাহরাইন, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, জর্ডান, ইরাক এবং তুরস্কে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বন্ধ করতে হবে। আমি মনে করি জনগণ যদি রাজপথে শক্তভাবে নেমে আসে অবশ্যই এটা সম্ভব। যেমন, তুরস্কের জনগণ কঠিনভাবে অ্যামেরিকান সাম্রাজ্যবাদের বিরোধী হওয়ায় তুর্কীতে তাঁদের সামরিক ঘাটি থাকলেও সাম্রাজ্যবাদীরা সেগুলো ব্যবহারের অনুমতি পাচ্ছে না। এক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা খুবই প্রশংসনীয়। শুধু ইসলামপন্থী দলগুলোই নয়, ঐতিহাসিকভাবেই ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বামপন্থী দলসমূহও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
 
২. রাজনৈতিকভাবে সমন্বয় কাউন্সিল গঠন
ওআইসি, আরব লীগ, Gulf Cooperation Council), Economic Cooperation Organization, ডি-৮, Arab Maghreb Union সহ মুসলিমদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত সব সংস্থা ও ঐক্য সংগঠনগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে একক কেন্দ্র থেকে সমন্বয় করা উচিত।
 
৩. অর্থনৈতিক সংহতি বৃদ্ধি করা,
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পণ্য বর্জনের আন্দোলনকে জোরালো করতে হবে ও এর পক্ষে প্রতিনিয়ত জনমত গঠন করতে হবে। তেলের সরবরাহ, খাদ্য ও রসদ সহায়তা বন্ধ করতে হবে। কৌশলগত প্রণালীসমূহ এবং বাণিজ্যিক পথ বন্ধ করতে হবে। যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত দেশসমূহের জন্য তহবিল গঠন ও এর মাধ্যমে মাধ্যমে ঐ সকল দেশের মানুষের সামাজিক জীবনধারাকে সচল রাখার জন্য প্রচেষ্টা চালানো।
 
৪. যৌথ সামরিক বাহিনী
মুসলিম দেশসমূহের প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বাড়ানোর জন্য যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি করে একটি যৌথবাহিনী গঠন করা আবশ্যক। আকাশ প্রতিরক্ষা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সাইবার প্রতিরক্ষার জন্য যৌথ প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক বৃদ্ধি ও লজিস্টিক সাপোর্ট বাড়ানোর জন্য প্রক্রিয়া শুরু করা প্রয়োজন। এর ফলে আক্রমণের সময় বিচ্ছিন্ন প্রতিক্রিয়ার বদলে দ্রুত ও সমন্বিত একক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর করা সম্ভব হবে।
 
৫. আইনী সহায়তা ও প্রক্রিয়াকে জোরদার করা
সারা বিশ্বের মুসলিম আইনজীবী সংস্থা ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করে স্থায়ী টিম তৈরি করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আক্রমণের শিকার দেশগুলোতে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের প্রমাণ সংরক্ষণ ও সংগ্রহ করে তা আন্তর্জাতিক আইনগত প্রক্রিয়ায় উপস্থাপন করা এবং জনমত গঠনের লক্ষ্যে ব্যাপকভাবে প্রচার করা।
 
৬. সিভিল সুরক্ষা নেটওয়ার্ক তৈরি
গাজাসহ, প্রতিটি সংকটপূর্ণ অঞ্চল ও মুসলিম দেশসমূহের জন্য জন্য আলাদা আলাদা ত্রাণ সরবরাহ, ফিল্ড হাসপাতাল এবং মানবিক সহায়তা করিডোর তৈরির পরিকল্পনা করা উচিত। সীমান্তের প্রবেশদ্বার ও লজিস্টিক কেন্দ্রসমূহ যেনো যৌথভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে এর জন্য প্রোটোকল তৈরি করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য, পানি, ওষুধ, আশ্রয়স্থল এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয়তার জন্য পরিকল্পনা করা ও একক কেন্দ্র থেকে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করার মত উদ্যোগ গ্রহন করা।
 
৭. মিডিয়ার ঐক্য
মুসলিম দেশগুলিতে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (AP) এবং রয়টার্সের মতো সাম্রাজ্যবাদী মিডিয়াকে বর্জন করে নিজস্ব মিডিয়ার মধ্যে নতুন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।
একই সঙ্গে, উম্মাহর নিজস্ব আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা বা বিদ্যমান সংস্থাগুলোর যৌথ কনসোর্টিয়াম শক্তিশালী করে মাঠ থেকে প্রাপ্ত যাচাইকৃত তথ্য ও চিত্রসমূহ একক কেন্দ্র থেকে মানসম্মত প্রোটোকলের মাধ্যমে প্রস্তুত করে বিশ্ব মিডিয়া এবং স্থানীয় সংবাদপত্রে একযোগে সরবরাহ করা উচিত।
 
৮. যৌথ গোয়েন্দা বিভাগ তৈরি
মুসলিম দেশগুলোর জন্য যে বিষয়সমূহ হুমকি সেগুলিকে চিহ্নিত করা, আগাম সতর্কতা জানানো এবং সংকট মোকাবেলার জন্য জন্য যৌথ গোয়েন্দা কেন্দ্র থাকা উচিত। স্যাটেলাইট, ওপেন সোর্স, সাইবার গোয়েন্দা এবং মাঠ থেকে প্রাপ্ত রিপোর্টগুলো এক জায়গায় নিয়ে যাচাই করা হবে। এভাবে সম্ভাব্য হামলা বা ভুল তথ্য ছড়ানোর চেষ্টা আগে থেকেই ধরতে পারা যাবে এবং প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমসমূহ একটি কেন্দ্রীয় কাঠামোর অধীনে সমন্বিত পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে পরিচালিত হবে।
 
৯. ডিজিটাল মোবিলাইজেশন কেন্দ্র তৈরি
মুসলিম দেশগুলোকে তাদের নিজস্ব ইন্টারনেট সিস্টেম, ডেটা সেন্টার এবং সামাজিক মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে হবে এবং সক্রিয়ভাবে পরিচালনা করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে সত্য বিকৃত করা কন্টেন্ট (ডিপফেক, ম্যানিপুলেটেড ভিডিও/সাউন্ড) চিহ্নিত করে তার প্রবাহ বন্ধ করতে হবে এবং উৎসের নেটওয়ার্কগুলো নিষ্ক্রিয় করতে হবে। সাম্রাজ্যবাদী প্রোপাগান্ডার মাত্রা ও প্রবাহ সীমিত করতে হবে এবং কন্টেন্টের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে। মুসলিম ভূখণ্ডে সাম্রাজ্যবাদী উদ্দেশ্যে চলমান সব অ্যাকাউন্ট বন্ধ বা অকার্যকর করতে হবে।
 
১০. শিক্ষাব্যবস্থা ও অভিন্ন কার্যকর ইচ্ছাশক্তি প্রতিষ্ঠায় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ
সাময়িক আবেগ কিনা ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ নয়, স্থায়ী, সুশৃঙ্খল এবং সঠিক প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও বিভিন্ন প্লাটফর্মগুলোকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। বিশেষত জায়নবাদী সাম্রাজ্যবাদের প্রেতাত্মা অ্যামেরিকা ও অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর বিরুদ্ধে জনরোষকে জাগিয়ে রাখার জন্য জিহাদী প্রেরণাকে সর্বদা জাগ্রত ও উজ্জীবিত রাখতে হবে।
এখন প্রশ্ন হলো এগুলা কে বাস্তবায়ন করবে বা আদৌও এগুলো সম্ভব কিনা ?
আমি মনে করি অবশ্যই সম্ভব। মুসলিম উম্মাহ এখনো অনেক সমৃদ্ধ। জনগণ এখন যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সজাগ এবং সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে একাট্টা। এছাড়াও তেল, গ্যাস, পানিসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদের বড় একটি অংশ মুসলিম দেশসমূহে রয়েছে। উম্মতের আছে বিশাল এক যুবসমাজ ও অতীত গৌরব।
শুধু তাই নয় পাশ্চাত্যের দেশসমূহের সাধারণ জনগণও আজ তাঁদের দেশের এই সকল দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ জানাচ্ছে। সেই সকল দেশেই আজ এমন এমন রাজনৈতিক দল গড়ে উঠছে যারা জায়নবাদের বিরুদ্ধে অনেক বেশি সোচ্চার। যেমন অ্যামেরিকাতেই এখন ইসরাইলের সমর্থন পক্ষে সমর্থন একদম তলানীতে হাজারো চেষ্টা করেও আর ইসরাইলের পক্ষে ন্যারাটিভ তৈরি করতে পারছে না।
এই জন্য আমরা যদি আল্লাহর উপর ভরসা করে কাজ শুরু করি ও স্বপ্ন বিনির্মাণ করি তাহলে অবশ্যই আমরা অতীতের ১৮ টি ক্রুসেডকে যেভাবে মোকাবেলা করেছি এই ১৯ তম ক্রুসেডকেও মোকাবেলা করতে পারবো এবং সমগ্র মানবতার জন্য ইসলামী সভ্যতা পুনরায় বিশ্বসভ্যতার নেতৃত্ব দিবে ইনশাল্লাহ।
উস্তাদ এরবাকানের ভাষায়, আমরা ডাঙ্গায় জাহাজ তৈরি করেই যাবো, আল্লাহ তায়ালাই সাগরকে আমাদের পায়ের কাছে এনে দিবেন, ইনশাআল্লাহ।