ভাষা আন্দোলনে নারীরা অত্যন্ত সাহসী ও অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেন। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিলে অংশগ্রহণ, পোস্টার তৈরি, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, আহতদের চিকিৎসা এবং গ্রেপ্তার বরণসহ প্রতিটি পদক্ষেপে নারীরা সক্রিয় ছিলেন। ভাষা আন্দোলনে নারীর ভূমিকা নিয়ে কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে তাদের ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে।
বায়ান্নর একুশ, নারীই ইতিহাস!
একুশ মানে কেবল রাজপথের স্লোগান নয়, বরং মায়ের বুক খালি করে দেওয়া বর্ণমালার এক মহিমান্বিত জয়গান। বায়ান্নর সেই উত্তাল ফাল্গুনে যখন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত, তখন অন্তঃপুরের দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে এসেছিলেন অকুতোভয় এক ঝাঁক নারী। ইতিহাসের পাতায় আজও উজ্জ্বল হয়ে আছেন রওশন আরা বাচ্চু, যিনি পুলিশের ব্যারিকেড ভাঙার সাহসী নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সেই মিছিলে শামিল হয়েছিলেন সুফিয়া কামাল, লিলি চক্রবর্তী, প্রতিভা মুৎসুদ্দি, জহরত আরা আর মমতাজ বেগমদের মতো লড়াকু প্রাণ, যারা জেল-জুলুম সয়েও বাংলার মানচিত্রকে ভাষার দাবিতে রাঙিয়েছিলেন। একজন নারীর বয়ানে একুশ হলো একদিকে সন্তান হারানোর নীল বেদনা, আর অন্যদিকে সেই রক্তস্রোতে ধুয়ে আসা পবিত্র বর্ণমালাকে পরম মমতায় আগলে রাখার জয়ধ্বনি। নারী কেবল মিছিলে হাঁটেনি, বরং ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে ভাষার প্রদীপ জ্বেলে রেখেছে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই অবিনাশী চেতনা আমাদের প্রতিটি নারীর রক্তে প্রবহমান, যা শেখায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা নত না করতে। একুশ অমর কারণ এটি ত্যাগের এক শাশ্বত দলিল।
শাম্মী শফিক জুঁই, শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ
ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা
দৃঢ়তায় একুশ
একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির অস্তিত্ব, আত্মমর্যাদা ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক। এই আত্মপরিচয় যখন মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র চলছিল, তখন নারীরাও সাহসের সঙ্গে নিজেদের ভাষার অস্তিত্ব রক্ষায় প্রতিবাদ গড়ে তুলেছিলেন। ঘরের চার দেয়াল ভেঙে তারা নেমে এসেছিলেন রাজপথে এবং জয় করে নিয়েছেন নিজেদের আত্মপরিচয়, যেখানে লুক্কায়িত ছিল নারীর সাহস, দৃঢ়তা এবং অবিচল অবস্থান। ভাষার সংগ্রামের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক পরতে নারীর অবদান ছিল অনস্বীকার্য। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নারীরা মিছিলে, প্রতিবাদে, আহতদের সেবায়, লিফলেট লেখা ও বিতরণে এবং আত্মপরিচয়ের লড়াইয়ে দেখিয়েছেন দৃঢ়তা আর আত্মত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ভাষাশহীদদের রক্তে যে আন্দোলন রচিত হয়েছিল, সেই আন্দোলনের নীরব শক্তি ছিলেন নারীরাই। আন্দোলনের ভিত গড়ে দিতে তাদের অবদান ছিল গভীর ও সুদূরপ্রসারী। ভাষার জন্য যে সংগ্রাম রচিত হয়েছিল, তা পূর্ণতা পেয়েছিল নারীর দৃঢ়তায়। তারা প্রজন্মের জন্য রেখে গেছেন আত্মপরিচয়ের অমলিন উপাখ্যান। আর তাই একুশের ভাষার সংগ্রাম নারীর দৃঢ়তায় গড়ে ওঠা আত্মপরিচয়ের এক দীপ্ত ইতিহাস।
উম্মে জোবায়দা, শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ
ইডেন মহিলা কলেজ
আন্দোলনকে করেছে গৌরবময়
বাংলাদেশের ইতিহাসের চেতনাদীপ্ত একুশে ফেব্রুয়ারি কেবল একটি অধ্যায় নয়, এটি নারীর প্রতিবাদী কণ্ঠ, দৃঢ় পদচারণা ও মানবিক দায়িত্ববোধের এক অনন্য দলিল। ভাষার অধিকার আদায়ের এই আন্দোলনে নারীরা নীরব দর্শক হয়ে থাকেননি, বরং মিছিলের অগ্রভাগে দাঁড়িয়ে ভয়কে জয় করেছেন। বাংলার দামাল সন্তানেরা সরকারের ১৪৪ ধারা জারি ভেঙে মিছিল নিয়ে যখন রাস্তায় নেমেছিলেন, তখন নারীরাও স্লোগানে স্লোগানে রাজপথ মুখর করেছেন। আন্দোলনকারীদের দমানোর জন্য পুলিশ গুলি চালালে সালাম, জব্বার, রফিক, শফিউরসহ আরো অনেকে শহীদ ও আহত হন। আহতদের চিকিৎসার জন্য এগিয়ে আসেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রীসহ আরো অনেকে, যা নারীদের মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। অবস্থা বেগতিক দেখে সরকার বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে প্রত্যেক জাতি এই দিনে নিজ ভাষাকে বিশেষ সম্মান ও মর্যাদা দিয়ে পালন করে। নারীর সেই সাহসী ও সচেতন ভূমিকার মধ্য দিয়েই একুশ হয়ে উঠেছে আরো গৌরবময়।
খাদিজাতুল খোরশেদ খুশি, শিক্ষার্থী, সম্মান দ্বিতীয় বর্ষ, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ
মননে একুশ পুনর্জন্ম নেয়
একুশ মানে একটি চেতনা, যা বারবার জন্ম নেয় নারীর মননে, সংগ্রামে ও প্রতিবাদে। প্রতিবার যখন নারী অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, সমতার দাবি তোলে, নিজের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নে আপসহীন থাকে, তখনই নতুন করে জেগে ওঠে একুশের চেতনা। একুশের চেতনা কেবল ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি প্রতিদিনের জীবনের সঙ্গে যুক্ত এক অবিরাম সংগ্রামের নাম। ভাষা যেমন মানুষের পরিচয়ের বাহক, তেমনি নারীর কণ্ঠস্বরও তার অস্তিত্বের প্রকাশ। ভাষা আন্দোলনে যে প্রতিবাদী চেতনা জন্ম নিয়েছিল, সেই চেতনাই আজ নারীর অধিকার আন্দোলনে, বৈষম্যবিরোধী লড়াইয়ে এবং ন্যায়বিচারের দাবিতে প্রতিফলিত হচ্ছে। একুশ আমাদের মাঝে জাগিয়ে তুলেছে গভীর দেশপ্রেম, অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবোধ এবং আত্মমর্যাদার শক্ত ভিত। সমাজের চোখরাঙানি উপেক্ষা করে নারীরা যখন কথা বলে, লেখে, প্রতিবাদ করে, তখন একুশ নতুন রূপে ও নতুন অর্থে ফিরে আসে। যতদিন নারী অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে, ততদিন একুশ বেঁচে থাকবে চেতনায় ও উদ্দীপনায়।
রুমিয়া হক শর্মী, শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ
ইডেন মহিলা কলেজ
ভাষাকন্যারা সাহসিকতার প্রতিচ্ছবি
ভাষা আন্দোলন বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বাধিকারের আন্দোলন। এই আন্দোলন কেবল শিক্ষিতদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সমগ্র বাঙালি জাতিকে একত্র করেছিল। পুলিশের গুলি উপেক্ষা করে নারীরাও ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নেয়। তারা পোস্টার ও স্লোগান লিখন থেকে শুরু করে বাড়ি বাড়ি টাকা তুলে আহতদের লুকিয়ে চিকিৎসায় নিয়োজিত ছিলেন, এমনকি অনেকজনকে জেলেও যেতে হয়েছে। তমদ্দুন মজলিসের প্রতিষ্ঠাতা আবুল কাশেমের স্ত্রী রাহেলা আন্দোলনের নেতাদের নিরাপদ রাখতেন এবং রান্না করে খাওয়াতেন। গ্রামের নারীরা, যারা তখন পর্দা প্রথার আড়ালে বন্দি ছিলেন, তারা সামাজিক ও ধর্মীয় বাধা অগ্রাহ্য করে বাংলা ভাষার দাবিতে রাজপথে নেমেছিলেন। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন জেলায় নাদিরা চৌধুরী, ড. মিকা, সৈয়দা হালিমা প্রমুখ নারীরাও মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন। আন্দোলনের এই সংগ্রাম করতে গিয়ে বহু নারীকে গ্রেপ্তারও করা হয়। নারীদের এই সাহসিকতাই অধিকার ও ভাষার আন্দোলনকে করে তুলেছিল আরো বেগবান ও শক্তিশালী।
আফরিদা ইসলাম, শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ
ইডেন মহিলা কলেজ