Image description

পিলখানা হত্যাকান্ডের ১৭ বছর পার হয়েছে। কিন্তু চূড়ান্ত বিচার এখনো সম্পন্ন হয়নি। বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) বিদ্রোহের নামে সংঘটিত হত্যাকান্ডের জন্য করা মামলা এখনো আপিল বিভাগে বিচারাধীন। একই ঘটনায় অধস্তন আদালতে করা বিস্ফোরক আইনের মামলাটিও সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে। অধস্তন আদালতে দুই মামলার বিচার শুরুর আগে এক দফা তদন্ত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘স্বাধীন জাতীয় তদন্ত কমিশন’ গঠনের মাধ্যমে তদন্ত হয়েছে আরও একবার। আবারও কমিশন গঠন করে পিলখানা হত্যাকান্ডের তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি সরকার। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আসামির সংখ্যার নিরিখে দেশের সবচেয়ে বড় ফৌজদারি মামলার ভবিষ্যৎ কী হবে, নতুন তদন্তের পর বিচারের প্রক্রিয়া কী হবে, ইতিমধ্যে অধস্তন আদালত ও হাইকোর্টে নিষ্পত্তি হওয়া হত্যা মামলার কী হবে এসব বিষয় সামনে এসেছে। আজ পিলখানা ট্র্যাজেডি দিবস পালিত হবে। গত বছর সরকারিভাবে ২৫ ফেব্রুয়ারিকে ‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবস’ ঘোষণা করা হয়।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের দুই মাসের মাথায় ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহে ৫৭ জন ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ওই বছরের ২৪ ডিসেম্বর পিলখানা হত্যাকা-ের স্বরূপ উদঘাটন, ষড়যন্ত্রকারী, ইন্ধনদাতা, ঘটনা-সংশ্লিষ্ট দেশি-বিদেশি অপরাধী ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সংস্থাকে চিহ্নিত করতে তদন্ত কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। বিডিআরের সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমানের নেতৃত্বাধীন কমিশন ১১ মাসের তদন্ত শেষে যে প্রতিবেদন দেয়, তাতে বলা হয় পিলখানা হত্যাকা-ে আওয়ামী লীগ জড়িত। ঘটনার মূল সমন্বয়কারী সাবেক সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপস এবং তাতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘গ্রিন সিগন্যাল’ ছিল। ঘটনায় ভারতেরও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে বলে জানায় কমিশন।

গত সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিষয়টি (পিলখানা হত্যাকান্ডের তদন্ত) তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল।’ পুনরায় কমিশন গঠন করে তাদের সুপারিশ অনুযায়ী বিচার করা হবে বলেও জানান তিনি। প্রসঙ্গত, পিলখানা হত্যাকান্ডের মামলায় অধস্তন আদালতের রায় হয়েছে ১২ বছরের বেশি সময় আগে। হাইকোর্টের রায় হয়েছে ৯ বছরের বেশি সময় আগে।

সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। আপিল বিভাগে বিচারাধীন হত্যা মামলার বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলেন, প্রধান বিচারপতি এ মামলার নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিলে তারা শুনানি করবেন। অন্যদিকে জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা বলছেন, পিলখানায় হত্যা মামলা যেহেতু সর্বোচ্চ আদালতে বিচারাধীন, তাই এ মামলায় নতুনভাবে কিছু করতে হলে আদালতের অনুমতি লাগবে, না হলে তা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

মামলাসংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানান, এ মামলার ৩১৮ জন জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। ২০২৫ সালের ১৯ জানুয়ারি ১৭৮ জন ও ১২ মে ৪০ জন জামিন পেয়েছেন। জামিনপ্রাপ্তদের মধ্যে হত্যা মামলার আসামিদের অনেকে খালাস পেয়েছিলেন। তবে, তাদের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক মামলা থাকায় জামিন পাচ্ছিলেন না। জামিনপ্রাপ্তদের মধ্যে বিভিন্ন মেয়াদে (সর্বোচ্চ ১০ বছর) সাজাপ্রাপ্ত আসামিও আছেন।

হত্যা মামলায় ৯ বছর ধরে আপিল শুনানির অপেক্ষা : পিলখানার ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে পৃথক মামলায় আসামি করা হয় ৮২৯ জনকে। হত্যা মামলায় ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর ঢাকার অধস্তন আদালত ১৫২ জনকে মৃত্যুদ- দেয়। ১৬০ জনকে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদন্ড। অন্যান্য অপরাধে ২৫৬ জন আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে (সর্বোচ্চ ১০ বছর) সাজা দেয় আদালত। খালাস পান ২৭৮ জন। অধস্তন আদালতের রায়ের পর হাইকোর্টে ফাঁসির আসামিদের ডেথ রেফারেন্স, আপিল, জেল আপিল এবং অপর্যাপ্ত সাজার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের ওপর শুনানি হয়। ২০১৭ সালের ২৬ ও ২৭ জানুয়ারি দুদিনের রায়ে হাইকোর্টের একটি বিশেষ বেঞ্চ অধস্তন আদালতে ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত ১৩৯ আসামির সাজা বহাল ও ৮ জনকে মৃত্যুদ- কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়। পাশাপাশি অধস্তন আদালতে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ৫ জনকে খালাস দেওয়া হয়। এ ছাড়া অধস্তন আদালতে ১৬০ জন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তের মধ্যে ১৪৬ জনের যাবজ্জীবন সাজা বহাল ও ১৪ জনকে খালাস দেয় হাইকোর্ট। অন্যদিকে অধস্তন আদালতে ৬৯ জনের খালাসের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল মঞ্জুর করে ৩১ জনকে যাবজ্জীন সাজা দেয় হাইকোর্ট। হাইকোর্টে ১৭৭ জনের যাবজ্জীবন সাজা হয় এবং ২৮৩ জন খালাস পান।

হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কতজন সাজাপ্রাপ্ত আসামি আপিল ও জেল আপিল করেছেন, নির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের তথ্য অনুযায়ী (২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত), হাইকোর্টের রায়ে ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত ৬৩ জনের পক্ষে আপিল বিভাগে ৩৫টি আপিল হয়। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ১৩২ জনের পক্ষে ২৯টি আপিল এবং হাইকোর্টে খালাস পাওয়া ও মৃত্যুদ- থেকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা পাওয়া ৮৩ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ ২০টি আপিল করে। অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা আপিল করেছি। তারাও আপিল করেছে। বিষয়টি এখন প্রধান বিচারপতির হাতে। আদালত এটি কার্যতালিকায় আনবে। আসামিপক্ষ চাইলে দ্রুত শুনানির আরজি জানাতে পারে।’

পিলখানা হত্যাকান্ড ও বিস্ফোরক আইনের দুই মামলায় আসামিপক্ষের প্রধান আইনজীবী ছিলেন অ্যাডভোকেট মো. আমিনুল ইসলাম। গত সোমবার তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর নিযুক্ত হয়েছেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পুনঃতদন্তের কথা বলেছেন, তবে এ বিষয়ে আমাদের সঙ্গে কোনো কথা হয়নি। যেহেতু এ মামলায় আইনজীবী হিসেবে আমাদেরও সংশ্লিষ্টতা আছে, সেহেতু উনি নিশ্চয়ই আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলবেন, আমাদের সঙ্গেও বলবেন। সে পর্যন্ত কিছু বলতে পারব না।’ কোনো আইনি জটিলতা দেখছেন কি না এমন প্রশ্নে অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আপাতত দেখছি না। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যা বলেছেন, তা যদি হয় তাহলে এটা একটা বড় বিষয়। অনেক ভিকটিম পরিবারেরও দাবি আছে। তবে মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি হোক।’

১৭ বছর ধরে চলছে বিস্ফোরক মামলা : পিলখানার ঘটনায় বিস্ফোরক মামলায় ২০১০ সালের ২৭ জুন অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ হয়। ৮২৯ জনকে আসামি করা হয়। সাক্ষী করা হয় ১ হাজার ৩৫৭ জনকে। এ মামলার বিচারকাজ চলছে ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা আদালতে (কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের পাশে বিশেষ এজলাসে)। এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি মো. বোরহান উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে জানান, এখন পর্যন্ত ৩০২ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে। আগামীকাল ২৬ ফেব্রুয়ারি পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য আছে। এরপর আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানি হবে। এরপর হবে উভয়পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তি-তর্কের শুনানি। এরপর মামলা রায়ের পর্যায়ে আসবে। তবে কবে নাগাদ মামলার নিষ্পত্তি হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানান তিনি। এক হাজারের বেশি সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ সম্ভব কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, সাধারণত বেশিসংখ্যক আসামি ও সাক্ষীর মামলার একপর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের সাক্ষ্য নেওয়া হয়। এ মামলাতেও এ ধরনের কিছু হতে পারে।

তিনি বলেন, ‘সাক্ষীদের জবানবন্দিতে পিলখানা হত্যাকান্ড ও ষড়যন্ত্রে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক সংসদ সদস্য মির্জা আজম, শেখ ফজলে নূর তাপসসহ আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতা ও সাবেক মন্ত্রীর নাম এসেছে। ইতিমধ্যে সরকার পুনঃতদন্তের ঘোষণা দিয়েছে। এখন তদন্ত কীভাবে হয়, কী হয় তা দেখতে হবে। পুনঃতদন্তের এলে সেভাবেই প্রক্রিয়া শুরু হবে।’

ফৌজদারি আইনবিদ অ্যাডভোকেট এহসানুল হক সমাজী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিডিআর হত্যা মামলা একটি চাঞ্চল্যকর মামলা। মামলার ১৭ বছর পার হয়েছে। এটা এখনো বিচারিক বিষয়।’ তিনি বলেন, ‘একটি মামলা যখন সর্বোচ্চ আদালতে বিচারাধীন থাকে, তখন সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ ছাড়া একই ঘটনায়, একই বিষয়ে নতুন তদন্ত বা মামলা হলে সেটা আইনগত প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে। আপিল বিভাগে যে মামলা বিচারাধীন, সেটির নিষ্পত্তির পরে যদি উচ্চ আদালত কোনো নির্দেশনা ও পর্যবেক্ষণ দেয়, তাহলে সে অনুযায়ী কার্যক্রম চলতে পারে।’