Image description

শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেছেন, সরকার শিক্ষাকে আর খরচের খাত বা হিসেবে দেখবে না। শিক্ষা হবে রাষ্ট্রের প্রথম বিনিয়োগ, মানবসম্পদের মূল কারখানা এবং জাতি-গঠনের প্রধান প্রকল্প।

 

বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

ববি হাজ্জাজ বলেন, আমরা সবাই জানি, শিক্ষা ব্যবস্থার প্রথম শর্ত অর্থায়ন। গত বছরগুলোতে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ মোট বাজেটের প্রায় ১২ শতাংশের আশেপাশে থেকেছে এবং জিডিপির অনুপাতে তা দেড়-দুই শতাংশের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করেছে—এটা একটি কাঠামোগত সীমা।

তিনি বলেন, কিন্তু আমাদের সরকারের—বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নীতিগত অবস্থান পরিষ্কার। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির পাঁচ শতাংশে নিয়ে যাওয়া—এটা আমাদের নির্বাচনি অঙ্গীকার। আর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বলে, শিক্ষা খাতে জিডিপির চার থেকে ছয় শতাংশ এবং মোট সরকারি ব্যয়ের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বরাদ্দ—এই লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে মাঝারি মেয়াদের বাজেট কাঠামো অনুযায়ী তিন বছরের ‘ফিসক্যাল আপলিফট প্ল্যান’ দেব। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়লেও শুধু মোট টাকা নয়, কোথায় টাকা যাবে সেটাও বদলাতে হবে। তাই বাজেটে সমতা ও শেখার ফলাফল—দুটিই প্রধান সূচক হবে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, খরচের গুণগত মান বদলাতে হবে। আমরা স্বীকার করছি, উন্নয়ন বাজেটের একটা বড় অংশ বছরের শেষে হঠাৎ খরচ হয়। এর ফলে বই, নির্মাণকাজ, প্রশিক্ষণ—সবকিছুই ‘স্কুল ক্যালেন্ডার’ মিস করে।

তিনি বলেন, একটি কঠিন সত্য আজ আমি পরিষ্কারভাবে বলছি। গত অর্থবছরে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার উন্নয়ন তহবিলের প্রায় ৫৩ শতাংশ অব্যবহৃত থেকে ফেরত গেছে। এটা শুধু অর্থনৈতিক ব্যর্থতা নয়, এটা শিক্ষার্থীদের সময় ও সুযোগের ক্ষতি।

ববি হাজ্জাজ বলেন, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা কমিশনের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি অনুমোদন এবং প্রকল্প গেট-কিপিং (ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল) স্কুল বর্ষপঞ্জির সঙ্গে রি-অ্যালাইন করব। অর্থ বিভাগের ক্যাশ রিলিজ সমান কিস্তি না করে মাইলস্টোন-ভিত্তিক করব। টেক্সটবুক, প্রশিক্ষণ, নির্মাণ—সবকিছুর আলাদা মাইলস্টোন থাকবে।

তিনি বলেন, ইলেকট্রনিক সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা বাধ্যতামূলকভাবে আগেভাগে চালু করে প্রি-প্রকিউরমেন্ট প্ল্যানিং করব, যেন জুনে এসে দরপত্রের ভিড় না হয়। কন্ট্রোলার জেনারেল অব অ্যাকাউন্টস-এর লেজার পর্যন্ত হিসাব থাকবে, কিন্তু সেই হিসাবের শেষ গন্তব্য হবে ক্লাসরুমে কন্ট্যাক্ট আওয়ার (পাঠদানের ঘণ্টা)।

উন্নয়ন ব্যয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, চলতি ব্যয় স্কুলকে খোলা রাখে। কিন্তু উন্নয়ন ব্যয় স্কুলকে আধুনিক করে। আমাদের অগ্রাধিকার হবে— শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা; বিজ্ঞানাগার, গ্রন্থাগার, ভাষা ল্যাব; ডিজিটাল কনটেন্ট ও মূল্যায়ন সক্ষমতা; স্কুল অবকাঠামো—বিশেষ করে পানি, স্যানিটেশন, নিরাপত্তা।

তিনি বলেন, এখানে আমরা নির্বাচনি অঙ্গীকারও বাস্তবায়ন করবো—মিড-ডে মিল, পরিষ্কার টয়লেট, এবং নারী শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা সহায়তা। কারণ প্রধানমন্ত্রী বারবার বলেছেন—শিক্ষার মান মানে শুধু বই নয়, শিক্ষার্থীর মর্যাদা।

ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব— অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, আমাদের ইশতেহারে আছে- ফ্রি ওয়াই-ফাই, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব। আমরা এটাকে গ্যাজেট প্রজেক্ট বানাব না। আমরা এটাকে বানাব শিক্ষণ-শেখার অপারেটিং সিস্টেম।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে স্কুলপর্যায়ে ডিজিটাল লিটারেসি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সচেতনতা, সাইবার সেফটি—এই তিনটি বাধ্যতামূলক সক্ষমতা হিসেবে নিয়ে আসবো। শিক্ষক ট্যাবের ভেতর থাকবে পাঠ-পরিকল্পনা টেমপ্লেট, প্রশ্নব্যাংক, উপস্থিতি ও শিখন-প্রমাণ (লার্নিং এভিডেন্স) আপলোড— যেন শিখন প্রক্রিয়া ট্র্যাক করা যায়।

তিনি বলেন, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি তৃতীয় ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে—এটা ইশতেহারে আছে। কিন্তু বাস্তবায়ন হবে ধাপে ধাপে—কারণ শিক্ষক, কনটেন্ট, মূল্যায়ন—সব প্রস্তুতি দরকার। শ্রমবাজার এবং উচ্চশিক্ষার চাহিদা বিবেচনা করে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা শিক্ষা চালু করা হবে। ভাষা শিক্ষায় শোনা ও বলা (লিসেনিং-স্পিকিং) যুক্ত হবে

তিনি আরও বলেন, আমরা জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডকে নির্দেশনা দেব, যেন প্রতিটি বিষয়ে লার্নিং ট্রাজেক্টরি ও গ্রেড-টু-গ্রেড কনসেপ্ট ম্যাপ প্রকাশ করা হয়। পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে ওয়ার্কড এক্সাম্পল, প্র্যাকটিস সেট, রিভিশন ক্যালেন্ডার যুক্ত করা হবে। বোর্ড পরীক্ষায় ধাপে ধাপে আইটেম ব্যাংক, ব্লুপ্রিন্ট, মডারেশন এবং স্কুল-ভিত্তিক মূল্যায়নের গার্ডরেইল যুক্ত করা হবে। এখানে লক্ষ্য একটাই শিখন-ফলাফল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বারবার বলেছেন— সার্টিফিকেট নয়, সক্ষমতা। আমরা সেই সক্ষমতাকে পরীক্ষায় আনব।

আরও পরিকল্পনার কথা জানিয়ে ববি হাজ্জাজ বলেন, আজ আমরা সাংবাদিকদের সামনে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, শিক্ষা নিয়ে রাজনীতি করব না; শিক্ষা দিয়ে রাষ্ট্র গড়ব। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে বাংলাদেশ কল্পনা করেন—দক্ষ, ন্যায়ভিত্তিক, প্রযুক্তিসক্ষম, মূল্যবোধসম্পন্ন—সেই বাংলাদেশ গড়ার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হলো শিক্ষা। শিক্ষা মন্ত্রণালয় হিসেবে আমাদের দায়িত্ব সেই ভিশনকে বাস্তবে নামানো—বাজেটে, শ্রেণিকক্ষে, পরীক্ষায়, আর কর্মসংস্থানে।