Image description
শুল্কছাড় ও ব্যবসায়ীদের আশ্বাস প্রশ্নের মুখে

রমজান মাস ঘিরে পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত, আমদানি শুল্ক কমানো, ব্যবসায়ীদের বড় বড় আশ্বাস সবই এখন প্রশ্নের মুখে। কারণ রোজা শুরুর আগেই বেপরোয়া পুরোনো সেই সিন্ডিকেট। বাড়তি চাহিদা পুঁজি করে চলছে মূল্যবৃদ্ধির হিড়িক। প্রশাসনের নজরদারির মাঝেই অসাধু চক্র এক দিনের ব্যবধানে ছোলার দাম কেজিতে বাড়িয়েছে ৫-১০ টাকা। চিনি কেজিতে ১০ টাকা, খেজুর ১০০-২০০ টাকা ও বেগুনে ৪০ টাকা অতিরিক্ত আদায় করা হচ্ছে। ২ দিনের ব্যবধানে লেবু ও শসার মূল্য বাড়ানো হয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। মুরগি কিনতে ক্রেতার কেজিপ্রতি বাড়তি খরচ হচ্ছে ৩০-৪০ টাকা। সব মিলে রমজানের বাজার যেন নিয়ন্ত্রণহীন লুটপাটের মঞ্চে পরিণত হয়েছে।

বুধবার রাজধানীর খুচরা বাজারে বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এদিন প্রতি কেজি ছোলা বিক্রি হয়েছে মানভেদে ৮৫-১০৫ টাকা। যা ৭ দিন আগে ৮০-৯৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হচ্ছে ১০০-১১০ টাকা। যা ৭ দিন আগে ৯৫-১০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৬৫ টাকা। ৭ দিন আগেও ৬০ টাকা ছিল। প্রতি কেজি মসুর ডাল (সরু) বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকা। যা কিছুদিন আগেও ১৪০-১৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তবে সরকার নির্ধারিত মূল্যে সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে। বোতলজাত প্রতিলিটার সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে ১৯৫ টাকা। দেশে এসব পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত আছে। দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি পরিস্থিতিও ভালো। সরবরাহেও কোনো ঘাটতি নেই। তারপরও বাজারে এসব পণ্যের দাম বেড়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, মসুর ডাল রোজায় চাহিদা ৮০ হাজার টন। ইতোমধ্যে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার টন। সবশেষ নভেম্বর ও ডিসেম্বরে আমদানি হয়েছে ৭২ হাজার টন। আমদানি পর্যায়ে পাইপলাইনে থাকা আরও ১ লাখ ৭৮ হাজার টন দেশে ঢুকছে। রোজায় চিনির চাহিদা ৩ লাখ টন। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয়েছে ৩৭ হাজার টন। সবশেষ নভেম্বর ও ডিসেম্বরে আমদানি হয়েছে ৪ লাখ ৪৬ হাজার টন। আমদানি পর্যায়ে পাইপলাইনে থাকা ৩ লাখ ২৯ হাজার টন ইতোমধ্যে দেশে ঢুকতে শুরু করেছে। এছাড়া দেশে বছরে পেঁয়াজের চাহিদা ২৬-২৭ লাখ টন। রোজায় চাহিদা ৫ লাখ টন। এর মধ্যে এবার মৌসুমে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয়েছে ৪৪ লাখ ৪৯ হাজার টন। নভেম্বর ও ডিসেম্বরে আমদানি হয়েছে ৫ হাজার টন। ফলে রোজার চাহিদা নয়, বছরে চাহিদার তুলনায় দেশে বেশি পেঁয়াজ রয়েছে। পাশাপাশি রোজায় ছোলার চাহিদা ১ লাখ ৫৫ হাজার থেকে ২ লাখ টন। ইতোমধ্যে দেশে উৎপাদন হয়েছে ২২ হাজার টন। সবশেষ গত ২ মাসে আমদানি হয়েছে ১ লাখ ১ হাজার টন। আমদানি পর্যায়ে পাইপলাইনের ১ লাখ ৩০ হাজার টন ছোলা দেশে ঢুকছে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, প্রতিবছর রোজার আগে অসাধুদের কারসাজির কৌশল ওপেন সিক্রেট। তবুও সবাই নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকে। দেশে পণ্যের মজুত পর্যাপ্ত থাকলেও রোজার আগেই মূল্য বাড়িয়ে ভোক্তাকে নাজেহাল করে ফেলে। পরে নেওয়া হয় লোক দেখানো কিছু পদক্ষেপ। কোনো বছরই এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাই নির্বিঘ্নে ওই চক্র বছরের পর বছর চালিয়ে গেছেন তাদের অপকর্ম। তাদের জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছেন সাধারণ ভোক্তা। এবারও তার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। তাই নতুন সরকারের এই অসাধুদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

খেজুরের আমদানি বেশি ও শুল্ক ছাড়ের সুফল নেই : রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতি কেজি জাহিদি খেজুর বিক্রি হচ্ছে ২৬০-২৮০ টাকা। আগে ১৬০-১৮০ টাকা ছিল। পাশাপাশি দাবাস ১৫০ টাকা বেড়ে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫৫০ থেকে ৫৭০ টাকা। সঙ্গে বরই খেজুর সর্বোচ্চ ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আগে ৪০০ টাকা ছিল। কালমি ৭০০-৮০০ টাকা, সুক্কারি ৮০০-১০০০ টাকা, মাবরুম ৮৫০ থেকে ১২০০ টাকা, মরিয়ম ১১০০ থেকে ১৪০০ টাকা এবং মেডজুল ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এসব খেজুর রোজা ঘিরে সর্বোচ্চ ২০০ টাকা বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে। এদিকে রোজায় খেজুরের মূল্য সহনীয় করতে ২৩ ডিসেম্বর খেজুরের আমদানি শুল্ক ২৫ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়। যা ৩১ মার্চ পর্যন্ত বহাল থাকবে। পাশাপাশি বছরে খেজুরের চাহিদা ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টন। এর মধ্যে রোজায় চাহিদা ৬৫ হাজার টন। ইতোমধ্যে রোজার চাহিদার তুলনায় আরও ১৫ হাজার টন বেশি খেজুর আমদানি করা হয়েছে। তবুও রোজা ঘিরে দাম বাড়ছে।

মাংসের দামে নাভিশ্বাস : খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ২০০-২১০ টাকা। আগে ছিল ১৭০-১৮০ টাকা। পাশাপাশি সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩২০-৩৪০ টাকা। ৭ দিন আগে ৩০০-৩২০ টাকা ছিল। প্রতি কেজি দেশি মুরগি বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ৬৫০ টাকা। এদিন খুচরা বাজারে প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৭৫০-৮০০ টাকা। আর খাসির মাংসের কেজি সর্বোচ্চ ১২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

মূল্য বৃদ্ধি ইফতার পণ্যেও : খুচরা বাজারে প্রতি কেজি গোল শসা বিক্রি হচ্ছে ৮০-১০০ টাকা। ৪ দিন আগে ৫০-৬০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। প্রতি হালি (৪ পিস) লেবু বিক্রি হচ্ছে ৮০-১০০ টাকা। ৫ দিন আগেও ৫০-৬০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আর এক সপ্তাহ আগে বিক্রি হয়েছে ৪০-৫০ টাকা। প্রতি কেজি বেগুন বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকা। যা কিছুদিন আগেও ছিল ৬০-৭০ টাকা। প্রতি কেজি মুড়ি বিক্রি হয়েছে ৮০-৯০ টাকা। দুই সপ্তাহ আগে ৭০-৮০ টাকা ছিল।

রোজার আগেই বেড়েছে ফলের দাম : এদিকে রোজার আগেই ফলের দাম বাড়িয়েছেন ব্যবসায়ীরা। বুধবার প্রতি কেজি আপেল বিক্রি হচ্ছে ৩৬০-৪০০ টাকা। যা এক দিন আগেও বিক্রি হয়েছে ৩০০-৩৪০ টাকা। পাশাপাশি মালটা বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৩২০-৩৬০ টাকা। আগে ২৮০-৩০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। প্রতি কেজি বরই ৪০ টাকা বেড়ে ১৪০-২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সাগরকলা প্রতি ডজন বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা। যা আগে ১২০ টাকা ছিল।

বুধবার জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক পর্যায়ের এক কর্মকর্তা বলেন, রোজা ঘিরে বাজারে চিরুনি অভিযান চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের একাধিক সংস্থা মাঠে নেমেছে। ফলে যেসব ব্যবসায়ী অনিয়ম করে পণ্যমূল্য বাড়িয়েছে তাদের ধরে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি পণ্যমূল্য সহনীয় করা হবে।