দেশের দায়িত্ব এখন নতুন সরকারের হাতে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর যোগাযোগ ও বেসামরিক বিমান চলাচল খাতকে অগ্রাধিকারভুক্ত ক্ষেত্র হিসেবে ঘোষণা করার প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালু করার উদ্যোগ নেবে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। থার্ড টার্মিনাল চালু হলে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যাত্রী ধারণক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। ফলে যাত্রী জট, ফ্লাইট বিলম্ব এবং ভিড়জনিত ভোগান্তি কমবে এমনটাই জানালেন সংশ্লিষ্টরা।
অতিরিক্ত চাপ এড়াতে ভিড় কমাতে এবং ভবিষ্যতে বর্ধিত গন্তব্য ও কার্গো পরিবহন প্রয়োজনীয়তায় তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ করা হয়েছিল যা বাস্তবে একটি যুগান্তকারী অবকাঠামো প্রকল্প। বিষয়টি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং এটি বাংলাদেশে বড় আকারের এক অবকাঠামো প্রকল্পের বাস্তবায়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, অর্থনৈতিক দায়বোধ, আইনি কাঠামো এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি প্রতিচ্ছবি।
ইতোমধ্যেই ঢাকা বিমানবন্দরের ২১ হাজার কোটি টাকার তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনা নিয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ও নির্বাচিত জাপানি কনসোর্টিয়ামের মধ্যে আলোচনায় অচলাবস্থা দেখা দেয়। রাজস্ব বণ্টন এবং আয়-ব্যয়ের কাঠামো নিয়ে কয়েক দফা আলোচনার পরও দুই পক্ষ কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। সর্বশেষ দুই দিনের আলোচনাও কোনো অগ্রগতি ছাড়াই শেষ হয়। কারণ রাজস্ব ভাগাভাগি ও আয়-ব্যয়ের মডেল নিয়ে মূল মতপার্থক্য এখনো দূর হয়নি। বেবিচক প্রধান আয়ের উৎসগুলো থেকে রাজস্ব ভাগাভাগি করতে রাজি নয় এবং বরং ভারতীয় ধাঁচের আয়-ব্যয় মডেল চাইছে যা কনসোর্টিয়ামের আন্তর্জাতিক মানের প্রস্তাবের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। স্থবির হয়ে পড়ায় সরকার এখন নতুন অপারেটর বাছাইয়ের জন্য আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহ্বানের কথা ভাবছে। দীর্ঘসূত্রতা বাড়লে ১৫ হাজার কোটি টাকার জাইকার ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হলেও টার্মিনাল কার্যত নিষ্ক্রিয় থাকবে ফলে করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে। আলোচিত বিষয়গুলোর ভিত্তিতে প্রকল্পের সরলীকৃত আর্থিক মডেল হালনাগাদ করা হয়েছে। তবে সংশোধনের পরও প্রকল্পটি আর্থিকভাবে লাভজনক নয় বলে তাদের মূল্যায়ন। প্রকল্পে আয়ের সম্ভাব্য খাত হিসেবে ধরা হয়েছে এমবারকেশন ফি, গ্রাউন্ড ও কার্গো রয়্যালটি, লাউঞ্জ, অফিস, বিজ্ঞাপন ও পার্কিং আয়। তবে অপারেশনাল ব্যয় যেমন জনবল, রক্ষণাবেক্ষণ, ইউটিলিটি ও বীমা উচ্চ পর্যায়ে থাকবে বলে পূর্বাভাস এমনটাই জানান সংশ্লিষ্টরা।
জাপানি কনসোর্টিয়ামের দাবি, প্রকল্পটি টেকসই করতে যাত্রীপ্রতি এমবারকেশন ফি কমপক্ষে ২০ ডলার নির্ধারণ জরুরি। পাশাপাশি যাত্রী ও কার্গো রাজস্ব ভাগাভাগির শর্ত পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মানের সরঞ্জাম ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের কারণে অপারেশন খরচ বেশি যা এয়ারপোর্ট কাউন্সিল ইন্টারন্যাশনাল এর বেঞ্চমার্কের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে দাবি করা হয়। জাপানের এই কনসোর্টিয়ামটিকে আগের সরকার নির্বাচিত করেছিল, যা মূলত প্রকল্পে জাপানের অর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করা হয়। ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর থেকে রাজস্ব, ব্যয় এবং পরিচালন ব্যবস্থাপনায় উভয় পক্ষ সমঝোতায় আসতে ব্যর্থ হচ্ছে।
কনসোর্টিয়াম সূত্র জানায়, বিমানবন্দরের দুটি সবচেয়ে লাভজনক আয়ের উৎস প্যাসেঞ্জার সেফটি ফি ও এয়ারপোর্ট উন্নয়ন ফি এগুলো থেকে বেবিচক রাজস্ব ভাগ করতে চায় না। ২০২০ সালের আগস্ট থেকে অভ্যন্তরীণ, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের সব যাত্রীর কাছ থেকে এ দুটি ফি আদায় করা হচ্ছে। এই ফি-গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো ছাড়া গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং রয়্যালটি বা বাণিজ্যিক স্পেসের মতো গৌণ আয় দিয়ে ব্যয় সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। তারা প্রকল্পে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকলেও অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিশ্চিত না হলে চূড়ান্ত চুক্তিতে অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়। থার্ড টার্মিনাল পুরোপুরি চালু হলে বিমানবন্দরের বার্ষিক যাত্রী ধারণক্ষমতা তিনগুণ এবং কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতা দ্বিগুণ বাড়বে। এতে রয়েছে ২৬টি বোর্ডিং ব্রিজ, সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ব্যাগেজ সিস্টেম এবং উন্নত যাত্রীসেবার নানান সুবিধা।
প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার অভিযোগ সব মিলিয়ে রাজধানীর প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালু না হওয়াকে কেন্দ্র করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছেন সাবেক সরকারের উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। তিনি সেসময় সাফ জানিয়েছেন পরবর্তী সরকার এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টার্মিনালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে না পারায় তার নেতৃত্ব, পরিকল্পনা ও তদারকির সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্ট মহল। ইতোমধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান পদ থেকে শেখ বশিরউদ্দীনকে অব্যাহতি দিয়েছে সরকার। তিনি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন।
প্রেসিডেন্টের আদেশক্রমে এসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। এতে স্বাক্ষর করেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মোছা. শাকিলা পারভীন। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের চেয়ারম্যান পদ থেকে শেখ বশিরউদ্দীনকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ বিমান অর্ডার পুনর্বহাল ও সংশোধন আইন অনুযায়ী সরকার এ ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে। জারীকৃত আদেশ জারির তারিখ থেকেই কার্যকর হবে বলে জানানো হয়।
বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রফেসর ড. হাদিউজ্জামান ইনকিলাবকে বলেন, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল নির্মাণ একটি মেগা প্রকল্প। বর্তমানে যে টার্মিনালগুলো চালু রয়েছে সেগুলোতে যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালটি অন্তর্বর্তী সরকার চালু করতে পারেনি। বর্তমান সরকারের উচিত দ্রুত এটি চালু করার। অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দেশিয় প্রতিষ্ঠান কাজ করতে পারে। এছাড়া জাপানের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বেশি থাকায় তাদের সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে।