বিসিএস ৮২ ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা হঠাৎ করেই আলোচিত হচ্ছেন। বলা হচ্ছে, প্রশাসনে তারা এখন ব্যাপক প্রভাবশালী। একসময় সচিবালয়ে প্রভাব বিস্তার করতেন ৭২ ব্যাচের ‘তোফায়েল ক্যাডার’ নামে পরিচিত কর্মকর্তারা। তারা অবসরে যাওয়ার পর প্রশাসনে আর কোনও ব্যাচের কর্মকর্তারা এতটা আলোচিত হননি। তবে গত দেড় বছর ধরে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন বিসিএস প্রশাসন ৮২ (নিয়মিত) ব্যাচের কর্মকর্তারা। যদিও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সূত্রে দাবি, গত পাঁচ বছরে প্রশাসনে এ ধরনের কোনও প্রভাব বিস্তারকারী ব্যাচ গড়ে ওঠেনি।
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্বগ্রহণের পর ৮ জন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে সিনিয়র সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। এই ৮ জনের মধ্যে ৭ জনই ছিলেন বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ৮২ (নিয়মিত) ব্যাচের কর্মকর্তা। তাদের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
সর্বশেষ মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তারও বিসিএস প্রশাসন ৮২ নিয়মিত ব্যাচের কর্মকর্তা। এই নিয়োগের আগে তিনি অবসরে ছিলেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিসিএস প্রশাসন ৮২ নিয়মিত ব্যাচের কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হলেও ৮২ স্পেশাল ব্যাচের কাউকেই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। যদিও বিসিএস ৮২ স্পেশাল ব্যাচের কর্মকর্তাদের মধ্যে ৩৩ জন সচিব পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন। সে সময় সরকার ও প্রশাসনে তারা ছিলেন ব্যাপক প্রভাবশালী—যা এখনও অব্যাহত রয়েছে।
সচিবালয় সূত্র বলছে, ড. মুহম্মদ ইউনূস দায়িত্ব নিয়েই যে ৮ জন সচিবকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে সাত জনই ছিলেন ৮২ ব্যাচের কর্মকর্তা। এই সাত কর্মকর্তাকে সিনিয়র সচিব পদমর্যাদায় নিয়োগ দেওয়া হয়। তারা হলেন—প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব মো. সিরাজ উদ্দিন মিয়া, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিনিয়র সচিব ড. শেখ আব্দুর রশিদ, রাষ্ট্রপতি কার্যালয়ের সিনিয়র সচিব ড. নাসিমুল গনি, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সিনিয়র সচিব এম এ আকমল হোসেন আজাদ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হক, স্বরাষ্ট্র সচিব ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মো. মোখলেস উর রহমান। এছাড়া বিসিএস ৮৩ ব্যাচের চুক্তিভিত্তিক সিনিয়র সচিব পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন এ.এস.এম সালেহ আহমেদ। শুধু তাই নয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্যসূত্র অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এই ব্যাচ থেকে প্রায় ৫০ জন কর্মকর্তাকে ভূতাপেক্ষ সচিব পদমর্যাদা দেওয়া হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান, সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান এবং প্রধান তথ্য কমিশনারের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন ৮২ ব্যাচের কর্মকর্তারা। বিশ্লেষকরা বলছেন, ৮২ ব্যাচের এই কর্মকর্তারাই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রশাসনে প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রশাসনের একাধিক বিভিন্ন সূত্রের দাবি, প্রায় এক দশক আগে ৮২ ব্যাচের কর্মকর্তারা অবসরে যাওয়া শুরু করলেও অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে সখ্যের কারণে তারা চুক্তিভিক্তিক নিয়োগ পেয়েছেন। তাদের বেশিরভাগই সিনিয়র সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সরকারের ভেতরে এই ব্যাচের যথেষ্ট প্রভাব বলয় গড়ে উঠেছে।
জানা গেছে, ৮২ ব্যাচের বিসিএস পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয় ১৯৮২ সালের মে মাসে। ওই বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতে ১৯৮৩ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত পরীক্ষা কার্যক্রম চলে। এরপর পাবলিক সার্ভিস কমিশন কর্তৃক সুপারিশকৃত প্রার্থীদের নিয়োগ চলে ১৯৮৩ সালের অক্টোবর থেকে ১৯৮৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত। মূলত এই কর্মকর্তারাই ‘১৯৮২ ব্যাচ’ নামে পরিচিত। ১৯৮২ সালের ডিসেম্বরে পাবলিক সার্ভিস কমিশন আরেকটি বিশেষ অনিয়মিত পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি জারি করায় এই ব্যাচকে পরবর্তী সময়ে ‘১৯৮২ নিয়মিত ব্যাচ’, আর ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় নির্বাচিতদের ‘স্পেশাল ব্যাচ’ বলে অভিহিত করেন অনেকে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, এদের মধ্যে প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব মো. সিরাজ উদ্দিন মিয়া নিজে থেকে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই গত ১১ ফেব্রুয়ারি পদত্যাগের আবেদন করেন। সরকার সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে। এর একদিন আগে মন্ত্রিপরিষদের সিনিয়র সচিব ড. শেখ আব্দুর রশিদও চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগের করার আগ্রহ ব্যক্ত করেন। ১০ ফেব্রুয়ারি সরকার তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। রাষ্ট্রপতি কার্যালয়ের সিনিয়র সচিব হিসেবে নিয়োগ পাওয়া ড. নাসিমুল গনিকে নিয়ে আসা হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। তিনি বর্তমানে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট সিনিয়র সচিব এম এ আকমল হোসেন আজাদকে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে নিযুক্ত করা হয়। পরে তাকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি সিনিয়র সচিবের পদমর্যাদায় পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে ভৌত অবকাঠামো বিভাগের দায়িত্ব পালন করছেন। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হক বর্তমানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ইউনূস সরকার স্বরাষ্ট্র সচিব ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনকে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেয়। বর্তমানে তিনি এ পদেই আছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব পদে নিয়োগ পাওয়া ড. মো. মোখলেস উর রহমানকে ২০২৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়। বর্তমানেও তিনি এই পদে বহাল আছেন।
এই ড. মো. মোখলেস উর রহমান বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ১৯৮২ ব্যাচের (নিয়মিত) একজন কর্মকর্তা এবং অতিরিক্ত সচিব হিসেবে সরকারি চাকরি থেকে অবসরে গিয়েছিলেন।
এর বাইরে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া বিসিএস ৮৩ ব্যাচের সিনিয়র সচিব এ.এস.এম সালেহ আহমেদ বর্তমানে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব পদে দায়িত্ব পালন করছেন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ৮২ সালের ব্যাচটিই ছিল বাংলাদেশে ১৬০০ নম্বরের পরীক্ষায় নির্বাচিত সর্বশেষ ব্যাচ। এরপর বিসিএস পরীক্ষার সিলেবাস ও নম্বর কমিয়ে আনা হয়। জানা গেছে, প্রশাসনসহ ১০টি সাধারণ ক্যাডারে ৮২ সালের ব্যাচে মোট ৩৬১ জন কর্মকর্তা নির্বাচিত হয়েছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বঞ্চিত বা ওএসডি থাকা কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ ৮২ ব্যাচের। এই ব্যাচের অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের ইউনূস সরকারের সময় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ায় প্রশাসনে সমালোচনা হয়।
সূত্রের দাবি, অবসরে যাওয়া এই কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখেন সাবেক কেবিনেট সচিব আলী ইমাম মজুমদার। ইউনূস সরকারের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি খাদ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের জনপ্রশাসন ঢেলে সাজানোর কাজে প্রধান উপদেষ্টাকে সহযোগিতা করেছেন আলী ইমাম মজুমদার। এ ক্ষেত্রে তিনি কাজে লাগিয়েছিলেন তার একজন সাবেক ব্যক্তিগত সহকারীকে। এরপর থেকেই প্রশাসনে ৮২ ব্যাচের পুনরুত্থান ঘটে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে আমলাদের শাসন চলছে। জুলাই অভ্যুত্থানের অতিমাত্রায় সুবিধাভোগী কিছু গোষ্ঠী আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে নিজেদের স্বার্থে চূড়ান্তভাবে অপব্যবহার করেছে। এই সুবিধাসন্ধানী আমলারা ক্ষমতা পেয়ে কেবল নিজেদের সুবিধাই বাড়িয়েছেন।’’