এক লাখ টাকার বিনিময়ে চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) সংসদীয় আসনে গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থিতা পরিবর্তনের অভিযোগ করেছেন মাইনুল ইসলাম রুবেল নামে এক নেতা। তাকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে দিয়ে অর্থের বিনিময়ে অপরিচিত একজনকে প্রার্থী করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। ঘটনার দেড় মাস পর আজ সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) এক ফেসবুক পোস্টে এমন অভিযোগ করেছেন রুবেল। আসনটিতে দলের হয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লড়ছেন এটিএম পারভেজ।
মাইনুল ইসলাম গণঅধিকার পরিষদের চট্টগ্রাম উত্তর জেলা শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। গত ২৯ নভেম্বর দ্বিতীয় দফায় মাইনুলকে চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়। তার অভিযোগ, গণঅধিকার পরিষদের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক লোকমান হোসেন, দলের উচ্চতর পরিষদের সদস্য জসিম উদ্দিন ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলার সভাপতি মো. শাহ আলম এই আর্থিক কেলেঙ্কারির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
ফেসবুক পোস্টে মাইনুল ইসলাম রুবেল লিখেছেন, চট্টগ্রাম-৪ আসনে আমি গণঅধিকার পরিষদের মনোনীত প্রার্থী ছিলাম। গত ২৭ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিতীয় ধাপের প্রার্থী ঘোষণার সময় আমাকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছিল। আমার আসন থেকে তখন পর্যন্ত আমি ছাড়া দ্বিতীয় কেউ নমিনেশন ফরম নেয়নি। কিন্তু গত ১৩ ডিসেম্বর রাতে বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক লোকমান হোসেন আমাকে চট্টগ্রাম ২ নম্বর গেইটে দেখা করতে বলেন। দেখা হলে তিনি আমাকে বলেন, সীতাকুন্ড থেকে এক ব্যক্তি নমিনেশন নিয়ে দেওয়ার জন্য উনাকে অনেক অনুরোধ করছে, বার বার কল দিয়ে অতিষ্ঠ করে ফেলছে। সে সময়ে তিনি আমাকে প্রস্তাব দেন, ভাই আপনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান, আমি ওই লোক থেকে আপনাকে ১ লক্ষ টাকা নিয়ে দিব। আপনি এমনিতেও নির্বাচন করতে পারবেন না, দল ২ আসনে জোটে চলে যাবে। লোকটা যেহেতু পাগলামি করতেছে নির্বাচন করার জন্য, টাকা নিয়ে আপনি তাকে সুযোগ দেন।
তিনি লিখেছেন, জবাবে আমি বলি, এটা কোনো ভাবেই সম্ভব নয়। আমি গত ৮ বছরে ৫% হলেও সীতাকুন্ডে আমার অবস্থান জানান দিয়েছি। এটা আমার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের প্রশ্ন। তাছাড়া আমি এ আসনে মনোনীত প্রার্থী। অজানা অচেনা কাউকে ছেড়ে দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। তারপর লোকমান আমাকে কথা দেয় যে তিনি সে লোককে প্রার্থী করার বিষয়ে আর আগাবেন না। দুঃখজনক বিষয় সে ১ লাখ টাকার লোভে তার দীর্ঘদিনের রাজপথের সহযোদ্ধা আমার সাথে চরম বেঈমানি করে ফেলেছে।
তিনি লিখেছেন, গত ২৯ ডিসেম্বর ছিল সব দলের প্রার্থীদের চুড়ান্ত মনোনয়ন ফরম জমা দেওয়ার শেষ দিন। কিন্তু ২৪ ডিসেম্বর দুপুরে গণঅধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদের সদস্য, চট্টগ্রাম বাঁশখালীর ছেলে জসিম উদ্দিন আমাকে কল দিয়ে বলে, আমি চট্টগ্রাম-৪ আসন বাদ দিয়ে চট্টগ্রাম-১০ আসনে প্রার্থী হতাম। তখন আমি বলি, আপনি ফরম জমা দেওয়ার মাত্র ৫ দিন আগে কিভাবে আমাকে আসন পরিবর্তন করে অন্য আসনে প্রার্থী হতে বলছেন? আমি আমার আসনে মোটামুটি প্রচার প্রচারণা করেছি, সীতাকুন্ড প্রেসক্লাবের সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় করেছি। তাছাড়া ৪ আসনে আমি আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনীত প্রার্থী, ফরম জমা দেওয়ার মাত্র ৫ দিন আগে আমাকে এমন প্রস্তাব দেওয়া হাস্যকর বিষয়। তখন তিনি বলেন, ১০ আসন অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তখন আমি বলি, বাংলাদেশের সব সংসদীয় আসন গুরুত্বপূর্ণ, আমি আমার নিজ উপজেলা ছেড়ে শহরে কেন নির্বাচন করব?। তখন তিনি আমাকে বলেন, ঠিক আছে, তুমি তোমার আসনেই নির্বাচন কর। কিন্তু তিনি তলে তলে আমার ১২টা ঠিকই বাজাই দিছে টাকা খেয়ে।
অভিযুক্ত দুজনের ছবি শেয়ার করে তিনি লিখেছেন, দুজনের সাথে ২০১৮ সাল থেকে ৮ বছর ধরে রাজনীতি করছি। তারা কেন্দ্রীয় কমিটিতে আছে, আর আমি চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন ইউনিটে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছি বিগত বছরগুলোতে। চট্টগ্রামে ২০১৮ সাল থেকে যারা পুরাতন ও লাগাতার সংগঠনের সাথে ছিল তাদের মধ্যে আমি একজন। ২৮ ডিসেম্বর আমি ঢাকা থেকে প্রত্যায়নপত্র নিয়ে আসার চুড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। কিন্তু সেদিন জানতে পারি, আমার অপরিচিত একজন ব্যক্তি চট্টগ্রাম-৪ আসনের মনোনয়ন ও প্রত্যয়নপত্র নিয়ে এসে জমা দিয়ে দিয়েছে। এসব কাজে তাকে সাথে থেকে সহযোগিতা করেছে চট্টগ্রাম উত্তর জেলার সভাপতি মো. শাহ আলম। কারণ সে ২ মাস আগে কেন্দ্রে গিয়ে জোরপূর্বক সভাপতি হওয়ায় আমি ও সাধারণ সম্পাদক তাকে সভাপতি হিসেবে মেনে না নিয়ে কার্যক্রম বন্ধ রাখি। যার ফলে সে এটার প্রতিশোধ নিয়েছে।
মাইনুল ইসলাম লিখেছেন, শাহ আলম মাত্র ৩ বছর আগে দলে যোগ দেয়। প্রথম কমিটিতে তাকে সম্মানজনক পদে রাখতে চায়নি জসিম উদ্দিন। পরে সম্মানজনক পদে রাখার জন্য আমি ও উত্তর জেলা ছাত্র অধিকারের সভাপতি রবিউল হাসান তানজিমসহ তাকে বারবার অনেক অনুরোধ করি। যার ফলে তাকে সম্মানজনক পদ দেওয়া হয়। সেও এখন আমার সাথে বেঈমানি করল। সে ভুলে গেছে আমার অবস্থান কোথায় ছিল আর সে কি ছিল।
সীতাকুন্ডে ট্রাক মার্কার প্রার্থী এটিএম পারভেজ কেন্দ্রীয় অফিস থেকে গোপনে নমিনেশন সংগ্রহ করার বিষয়টা লোকমান, জসিম, শাহ আলম ৩ জন যৌথভাবে করেছে অভিযোগ করে তিনি লিখেছেন, ১ লাখ টাকা এরা ৩ জনে ভাগ করে নিয়েছে। শাহ আলম পেশায় ব্যবসায়ী হলেও অন্য ২ জনের নির্দিষ্ট ইনকাম সোর্স নেই। লোকমান পেশায় চট্টগ্রাম জজ কোর্টের মুহুরি, মাঝেমধ্যে দৈনিক ৩০০ টাকা পায় এবং জসিম বেকার। যার কারণে এদের কাছে ১ লাখ টাকাও অনেক টাকা। সুতরাং পদ বিক্রি, নমিনেশন বানিজ্য এদের থেকে আশা করাই যায়। দলীয় পদের ব্যবহার করেই দল বিক্রি করে খাচ্ছে আর বউ বাচ্চার খরচ চালাচ্ছে।
তিনি লিখেছেন, আমার দুঃখটা হচ্ছে, চট্টগ্রাম-৪ আসনে এটিএম পারভেজ নামে ট্রাক মার্কায় যে নির্বাচন করছে তাকে আমি জীবনে কখনো চোখে দেখি নাই। সে ফর্সা না কালো, খাটো না লম্বা তাও দেখি নাই আজ পর্যন্ত। ৮ বছর রাজনীতি করে আমি ও আমার উপজেলার কোনো নেতাকর্মী তাকে চেনে না এবং তারা কখনো তাকে সরাসরি চোখে দেখেনি। আমার প্রশ্ন, সম্পূর্ণ অপরিচিত একজন ব্যক্তিকে কিভাবে প্রার্থী বানায় এ বাটপারগুলো?
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তা অস্বীকার করে গণঅধিকার পরিষদের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক লোকমান হোসেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, এটিএম পারভেজকে দলের কর্মীরা চেনে না কারণ তিনি আমাদের দলে নতুন যোগ দিয়েছেন। দলের নেতাকর্মীদের সাথে তার সৌজন্য সাক্ষাৎও হয়নি। আমি নিজেও তাকে নমিনেশন দেওয়ার বিরুদ্ধে ছিলাম, বিরোধিতাই করেছি। কিন্তু উনি কেন্দ্রীয় অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করে নমিনেশন নিয়ে এসেছেন। কিন্তু দলীয় মনোনয়নপত্র নেওয়া বা প্রতীক নেওয়ার যে সর্বশেষ দিন ছিল, মাইনুল সেদিন নিজেও যায়নি, কোন প্রকার যোগাযোগও করেনি। ফলে তার পরিবর্তে আরেকজন যিনি ছিল, ওনাকে দিয়ে দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অভিযোগের কোন প্রকার তথ্য প্রমাণ নাই। আমি আইনগতভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রিপারেশন নিচ্ছি। তারপরও দেখি, সে তো আমাদের দীর্ঘদিনের সহযোগী। হয়তো ভুল করছে কোন কারণে।
দলের উচ্চতর পরিষদের সদস্য জসিম উদ্দিন বলেন, চট্টগ্রাম-৪ আসনে মাইনুল ইসলামকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মনোনয়ন ফরম জমা দেওয়ার শেষ দিনে তিনি উপস্থিত ছিলেন না। কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে পরে এটিএম পারভেজকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। টাকার কোনো লেনদেনের বিষয় আমি জানি না। মাইনুল আমাদের দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধা। মনোনয়ন নিয়ে ক্ষোভ থেকে তিনি আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করছেন। যদি কোথাও অর্থ লেনদেন হয়ে থাকে, তাহলে তার প্রমাণ প্রকাশ করা হোক।
এ বিষয়ে জানতে মনোনয়ন সংগ্রহ ও প্রার্থিতা ঘোষণার দায়িত্বে থাকা গণঅধিকার পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও অর্থ সমন্বয়ক জিলু খানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।