এক সময় যে নেতার সঙ্গে দেখা করা এড়িয়ে চলতেন দেশের অভিজাত মহল ও বিদেশি কূটনীতিকরা, সেই জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্যতম আলোচিত ব্যক্তিত্ব। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে জামায়াত শীর্ষ অবস্থানের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায় উঠে আসায় তার সঙ্গে সাক্ষাতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন ইউরোপীয়, পশ্চিমা এমনকি ভারতীয় কূটনীতিকরাও।
কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা আজ ৯ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক ফিচার রিপোর্টে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান আমির ডা. শফিকুর রহমানের উত্থান, দলটির পরিবর্তিত কৌশল ও নীতিগত অবস্থান এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে এর সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ করেছে।
বুধবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেন ৬৭ বছর বয়সী শফিকুর রহমান। ইশতেহারে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, দল ক্ষমতায় এলে ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ২ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার ভিত্তি তৈরি করা হবে। প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি, শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ ও সরকারি ব্যয় বাড়ানোর কথাও বলা হয়।
তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশ এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, ইশতেহারে স্লোগান থাকলেও অর্থায়নের সুস্পষ্ট রূপরেখা নেই। বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের কাছে এই ইশতেহার মূলত অর্থনৈতিক হিসাবের চেয়ে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার মাধ্যম।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে ইসলামপন্থি দল হিসেবে পরিচিত জামায়াতকে সমালোচকরা রাষ্ট্র পরিচালনায় অনুপযুক্ত বলে তুলে ধরলেও নতুন ইশতেহারে দলটি নিজেকে আধুনিক, শাসনযোগ্য এবং বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছে।

আমি জনগণের জন্য লড়াই চালিয়ে যাব
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়। আওয়ামী লীগ কার্যত মাঠের বাইরে চলে গেলে এবং বিএনপি একমাত্র বড় দল হিসেবে থাকলেও সেই শূন্যতা পুরোপুরি পূরণ করতে পারেনি। এই সুযোগেই দীর্ঘদিন প্রান্তিক অবস্থানে থাকা জামায়াত রাজনৈতিক মঞ্চে দ্রুত সামনে আসে।
নির্বাচনের আর অল্প সময় বাকি থাকতে জামায়াত এখন দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তির একটি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কিছু জরিপে দলটি বিএনপির সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় রয়েছে।
এই রূপান্তরের কেন্দ্রে রয়েছেন শফিকুর রহমান। ২০১৯ সালে দলটির আমির হওয়ার সময় জামায়াত নিষিদ্ধ অবস্থায় ছিল। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ‘সন্ত্রাসে মদদ’ অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে তিনি ১৫ মাস কারাবন্দি ছিলেন। ২০২৫ সালের মার্চে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ওই মামলা থেকে তার নাম বাদ দেওয়া হয়।
এরপর থেকে তার আবেগঘন ও সংযত জনসমক্ষে উপস্থিতি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। গত জুলাইয়ে ঢাকায় এক বিশাল সমাবেশে অসুস্থ হয়ে মঞ্চে দুবার পড়ে গেলেও বক্তৃতা শেষ করেন তিনি। সেদিন তিনি বলেন, “আল্লাহ যতদিন জীবন দেবেন, ততদিন মানুষের জন্য লড়ব। জামায়াত ক্ষমতায় এলে শাসক নয়, সেবক হবে।”

জামায়াতের ভাবমূর্তি বদলের চেষ্টা
সমর্থকদের মতে, শফিকুর রহমান একজন সহজলভ্য ও নৈতিক নেতা, যিনি বৈঠকখানার চেয়ে দুর্যোগকবলিত এলাকায় থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তবে তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন নির্বাচনী নয়, বরং দলের ভাবমূর্তি।
দলটি নিজেকে ধর্মীয় মতাদর্শে আবদ্ধ শক্তির বদলে দুর্নীতিমুক্ত শাসন ও শৃঙ্খলার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। এই প্রচেষ্টার পথে সবচেয়ে বড় বাধা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে জামায়াতের ভূমিকা। শফিকুর রহমান সাম্প্রতিক সময়ে দলটির ‘অতীতের ভুল’-এর কথা স্বীকার করে ক্ষতি হয়ে থাকলে ক্ষমা চেয়েছেন, যদিও নির্দিষ্ট দায় স্বীকার এড়িয়ে গেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি একদিকে কৌশলগত বাস্তবতা, অন্যদিকে দলের ভেতরের ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা।
নারী নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক
তবে জামায়াতের এই ‘মধ্যপন্থী’ ভাবমূর্তির সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট। আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াতের শীর্ষ পদে নারীর নেতৃত্ব সম্ভব নয়—যা নারী অধিকার ও নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
সমালোচকদের মতে, এটি জামায়াতের আদর্শিক কাঠামোর গভীর সীমা প্রকাশ করে, বিশেষ করে এমন এক সময়ে যখন সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আন্দোলনে নারীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, শফিকুর রহমান এখন এক কঠিন ভারসাম্যের পথে হাঁটছেন—একদিকে আন্তর্জাতিক মহল ও নতুন ভোটারদের আশ্বস্ত করা, অন্যদিকে দলের রক্ষণশীল সমর্থকদের ধরে রাখা। এই দ্বন্দ্বই নির্ধারণ করবে জামায়াত ও এর নেতার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথ।

‘দাদু’ শফিকুর রহমান: তরুণদের কাছে আলাদা আবেদন
জামায়াতের সমর্থকদের মধ্যে, বিশেষ করে তরুণদের কাছে, শফিকুর রহমানের গ্রহণযোগ্যতা অনেক সময় আদর্শগত বিতর্কের চেয়েও ব্যক্তিগত আস্থার জায়গা থেকে তৈরি হচ্ছে। সাম্প্রতিক দেশব্যাপী প্রচারণায় তরুণ সমর্থকদের অনেককে তাকে আদর করে “দাদু” বলে ডাকতে শোনা যায়।
সাদা দাড়ি, শান্ত স্বভাব এবং সমর্থকদের প্রতি মনোযোগী আচরণ—সব মিলিয়ে শফিকুর রহমান অনেক তরুণের চোখে একজন অভিভাবকসুলভ নেতার প্রতিচ্ছবি। চট্টগ্রামের এক জেনারেশন-জেড আইন শিক্ষার্থী ও জামায়াত সমর্থক আব্দুল্লাহ আল মারুফ বলেন, “তিনি তরুণদের সঙ্গে কথা বলেন সম্মানের জায়গা থেকে। বিএনপির অনেক নেতা যেখানে তরুণদের তুচ্ছ করেন, সেখানে শফিকুর রহমান আমাদের গুরুত্ব দেন। তার সঙ্গে সম্পর্কটা অনেকটা দাদা–নাতির মতো।”
মারুফের মতে, শফিকুর রহমানের এই আবেদন জামায়াতের ঐতিহ্যগত সমর্থকগোষ্ঠীর বাইরেও বিস্তৃত। “আগের জামায়াত নেতাদের তুলনায় তিনি সাধারণ মানুষের মধ্যে বেশি জনপ্রিয়,” বলেন তিনি।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থী মনোনয়নসহ দলের সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলো কৌশলগত নয়, বরং দলীয় সংবিধানের অংশ। “আমাদের সংবিধান অনুযায়ী, যে কোনো বাংলাদেশি—ধর্ম নির্বিশেষে—আমাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতিতে বিশ্বাস করলে দলের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন,” বলেন তিনি। “ধর্মীয় মতাদর্শে বিশ্বাস রাজনৈতিক অংশগ্রহণের শর্ত নয়।”
জামায়াত নেতাদের মতে, এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য দলটির ভাবমূর্তি বদলানো—ধর্মতাত্ত্বিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে সুশাসন, শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতার রাজনীতি তুলে ধরা। জুবায়ের বলেন, “মানুষ দেখেছে বন্যা, কোভিড কিংবা জুলাই আন্দোলনের সময় আমাদের নেতারা মাঠে ছিল। সে কারণেই সমর্থন বাড়ছে।”
খুলনা সিটি করপোরেশন এলাকার জামায়াত মনোনীত হিন্দু প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দীও একই মত পোষণ করেন। আলজাজিরায় প্রকাশিত এক লেখায় তিনি উল্লেখ করেন, জামায়াত-সংশ্লিষ্ট কল্যাণমূলক নেটওয়ার্কগুলো ধর্ম বা রাজনৈতিক পরিচয় না দেখে দরিদ্র পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ায়। তার মতে, এই সেবামুখী সংস্কৃতিই জামায়াতকে স্লোগাননির্ভর দলের বদলে শৃঙ্খলাবদ্ধ ও দায়িত্বশীল সংগঠন হিসেবে তুলে ধরেছে।
দেশের বাইরেও জামায়াতের যোগাযোগ বাড়ছে। জুবায়ের জানান, শফিকুর রহমান অসুস্থ থাকাকালে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় কূটনীতিকরা সৌজন্য সাক্ষাতে যান। গত মাসে ভারতীয় হাইকমিশনে ভারতের ৭৭তম প্রজাতন্ত্র দিবসের সংবর্ধনায় জামায়াত নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়, যা আগে নজিরবিহীন।
ইউরোপীয় ও পশ্চিমা কূটনীতিকদের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকেও যোগাযোগ বাড়ছে বলে দাবি জামায়াতের। ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত এক ফাঁস হওয়া অডিওর বরাতে জানা যায়, এক মার্কিন কূটনীতিক জামায়াতের সঙ্গে “বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক” গড়ার আগ্রহের কথা বলেছেন।
জামায়াত যখন বিএনপির পাশাপাশি একটি বড় নির্বাচনী শক্তি হিসেবে উঠে আসছে, তখন দলের সাধারণ সমর্থকদের মধ্যে শফিকুর রহমানের নেতৃত্ব নিয়ে আত্মবিশ্বাসও বাড়ছে। ঢাকার এক ভোটার আবুল কালাম বলেন, “তিনি একজন দেশপ্রেমিক। প্রধানমন্ত্রী হোন বা বিরোধী নেতা—দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা তার আছে।”
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের ফল যাই হোক না কেন, জামায়াতের ভেতরে ও বাইরে শফিকুর রহমানের রাজনৈতিক অবস্থান এখন দৃঢ়। রাজনৈতিক ইতিহাসবিদ মহিউদ্দিন আহমদের ভাষায়, “তার রাজনৈতিক দর্শন এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়, কিন্তু দলের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ এবং উপস্থিতি প্রশ্নাতীত।”