Image description

একের পর এক তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের প্রায় সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামল ও বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে তাঁতিদের পাশে কেউ দাঁড়ায়নি। কেশুরবাড়ি গ্রামের মানুষেরা এ নির্বাচনে ভোট দেবেন। তাঁদের দাবি, নির্বাচিত সরকার যেন তাঁত সচল করে দেয়।

কেশুরবাড়ি ঠাকুরগাঁও জেলা সদর থেকে ১৫-১৬ কিলোমিটার উত্তরের একটি গ্রাম। একসময় এ গ্রামের মানুষের প্রধান পেশা ছিল কৃষি ও তাঁতবোনা। এখন কৃষি থাকলেও তাঁত টিকে থাকতে পারছে না।

গত বুধবার সকালে কেশুরবাড়ি গ্রামের একটি দোকানের সামনে জনাদশেক মানুষের আড্ডা চলছিল। চোখে পড়ার মতো ছিল তর্কবিতর্ক। তর্কবিতর্কের বিষয় আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন; কোন মার্কার প্রার্থীকে ভোট দেওয়া হবে—ধানের শীষ নাকি দাঁড়িপাল্লা।

নিরেট আঞ্চলিক ভাষায় হওয়া এই তর্কবিতর্কের সবকিছু বুঝে ওঠা এই প্রতিবেদকের পক্ষে অসম্ভব ছিল। তবে এইটুকু বোঝা গেল, আলোচনায় ১৯৭১ সাল, মুক্তিযুদ্ধ, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও চব্বিশের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে এলাকাটিতে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি ছিল।

এলাকাটি পড়েছে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে। এ আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের মধ্যে।

বিএনপির প্রার্থী দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আর জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন। তিনি ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি।

কেশুরবাড়ির অধিবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এখানে প্রায় চার শ পরিবারের বসবাস। তাদের ৮৫ শতাংশ সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়।

মোটরসাইকেলচালকসহ এই প্রতিবেদকের উপস্থিতিতে তর্কবিতর্ক একটা পর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায়। সাংবাদিক পরিচয় জানার পর সবাই কৌতূহলী হয়ে ওঠেন। দু-তিনজন বলার চেষ্টা করেন, এটা নিছক বিতর্ক। কখনো গোলমাল অবধি পৌঁছাবে না। গ্রামটি সম্প্রীতির।

১০-১৫ মিনিটের মধ্যে আড্ডা ভেঙে গেল।

গ্রামটি তাঁতিদের। নরেন্দ্র দেবনাথের উঠানে বসে তাঁত নিয়ে গল্প হয়। তাঁর বয়স ৬৩ বছর। তিনি জানান, তাঁতবোনা তাঁদের পূর্বপুরুষের পেশা। তাঁর বাবাও তাঁত বুনতেন। তবে এখনকার তাঁতের সঙ্গে আগের আমলের তাঁতের কিছু পার্থক্য আছে। তা ছাড়া এখনকার সমস্যাও ভিন্ন।

নরেন্দ্র দেবনাথের উঠানে সুতা গোছানোর জন্য বাঁশের অনেক কাঠি গোল করে পোতা। দুটো চরকায় সুতা জড়ানো। উঠানে ও বারান্দায় কয়েক বস্তা সুতাসহ আরও অনেক সরঞ্জাম। একটি ঘরে একটি তাঁত। এটি ‘আট পাটি’র তাঁত।

গল্পে যোগ দেন স্কুলশিক্ষক প্রদীপ দেবনাথ ও স্থানীয় তাঁতী সমিতির সাধারণ সম্পাদক নন্দন দেবনাথ। রান্নাঘর থেকে নরেন্দ্র দেবনাথের স্ত্রী বলেন, এ গ্রামে একসময় শাড়ি, গামছা ও চাদর তৈরি হতো। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে ঝুটের উল দিয়ে এ গ্রামে কম্বল তৈরি শুরু হয়। খুব দ্রুত এখানকার মানুষ শাড়ি, গামছা, চাদর ছেড়ে কম্বল বুনতে মনোযোগী হয়

প্রদীপ দেবনাথ বলেন, ‘তাঁতিরা ঝুটের উল কিনে আনতেন বগুড়ার শাওল বাজার থেকে। প্রায় প্রতিটি ঘরে কম্বল বোনা হতো।’

কেশুরবাড়ির কম্বল নিয়ে একসময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ ও ফিচার প্রকাশিত হওয়ার পর এর কিছুটা প্রসার বাড়ে বলে জানালেন প্রদীপ দেবনাথ ও নন্দন দেবনাথ। তাঁরা জানান, তখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ আগ্রহী হয়ে ওঠে। কম্বল বোনা ও বিক্রি বেড়ে যায়। এই গ্রাম থেকে ট্রাকভর্তি কম্বল দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গেছে। এই ছিল এ গ্রামের নিকট অতীতের ‘সোনালী দিন’।

নরেন্দ্র দেবনাথ বলেন, এই শীতের আগে ও শীতের সময় মোট তিন মাস কম্বল বোনার পর তা বিক্রি করে তাঁর লাভ হয়েছে মাত্র ২০ হাজার টাকা। কাজ করেছেন তিনজন। এই লাভ খুবই কম।

লাভ কম হওয়ায় অথবা লাভ একেবারে না হওয়ায় গ্রামটির মানুষ তাঁতবোনা ছেড়ে দিয়েছেন বলে জানালেন নন্দন দেবনাথ। তিনি বলেন, এখন ৫০-৬০টি পরিবারে তাঁত সচল আছে। গ্রামের মানুষ ইটের ভাড়া, রাজমিস্ত্রির সহযোগী হিসেবে কাজ নিচ্ছেন।

পরিস্থিতি কেন খারাপ হলো? বাজার কেন হারালেন? এমন প্রশ্নের উত্তর বা সমস্যার সমাধান গ্রামবাসীর কাছে নেই। তাঁরা জানান, সরকার কিছু ঋণ বা প্রশিক্ষণ তাঁতিদের দিয়েছে। তবে এই ঋণ বা প্রশিক্ষণ কাজে লেগেছিল কি না, তা কেউ বলতে পারেননি। কম্বল বাজারজাত করা বা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার কৌশল তাঁরা আয়ত্ত করতে পারেননি।

গ্রামের আরেকটি বাড়িতে বেশ কয়েকজন মানুষ তাঁত ও কম্বলের সমস্যা নিয়ে কথা বললেন। এ আলোচনায় একাধিক রাজনৈতিক দলের ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতারাও ছিলেন। তাঁদের ধারণা, সরকার চাইলেই তাঁতিদের সমস্যার সমাধান করতে পারে। প্রতিবছর যদি দুই লাখ কম্বল সরকার এই গ্রাম থেকে কিনে নেয়, তাহলে ছোট গ্রামটির বড় উপকার হয়।

কেশুরবাড়ির এ সমস্যা নিয়ে নির্বাচনী সভা-সমাবেশ, প্রচারে কোনো প্রার্থী এখনো কোনো বক্তব্য দেননি বলে জানালেন গ্রামবাসী। তবে সমস্যাটির কথা রাজনীতিবিদেরা জানেন না, এমনটা গ্রামবাসী বিশ্বাস করেন না।

স্থানীয় তাঁতী সমিতির সাধারণ সম্পাদক নন্দন দেবনাথ বলেন, ‘নির্বাচনের এখনো কয়েক দিন বাকি। প্রার্থীরা নিশ্চয়ই কেশুরবাড়িতে আসবেন, আমাদের কথা শুনবেন।’

স্কুলশিক্ষক প্রদীপ দেবনাথ বলেন, ‘ছোটখাটো সহায়তা দিলেই বেঁচে থাকবে কেশুরবাড়ির তাঁত ও তাঁতিরা।’