রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আদাবর ও শেরেবাংলানগরের একাংশ নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৩ আসনটি এবারের নির্বাচনে আলোচনায় এসেছে দুজন তারকা প্রার্থীর কারণে। দুজনের কেউই আগে এই আসন থেকে নির্বাচন করেননি। জাতীয়ভাবে পরিচিত দুই নেতা বেশ মাতিয়ে তুলেছেন আসনটির নির্বাচন। দুজনের বাগযুদ্ধে বেশ উত্তাপও ছড়াচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।
এই আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন বিএনপি জোটের প্রার্থী ববি হাজ্জাজ। তিনি জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) চেয়ারম্যান ছিলেন। নির্বাচনে অংশ নিতে গত ডিসেম্বরে নিজ দল ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেন। এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের প্রার্থী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। তার দলের প্রতীক ‘রিকশা’। এই আসনে অন্যান্য প্রার্থী থাকলেও আলোচনায় এই দুজন প্রার্থী। ফলে ধানের শীষ ও রিকশা প্রতীকের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
ববি হাজ্জাজ উচ্চ শিক্ষিত, শিল্পপতি এবং বিএনপির মতো বড় দলের সাপোর্ট পাওয়ায় বাড়তি কিছু সুবিধা পাচ্ছেন। অন্যদিকে মাওলানা মামুনুল হক দীর্ঘদিন ধরে মোহাম্মদপুর এলাকায় অবস্থান এবং জাতীয়ভাবে ব্যাপক পরিচিত হওয়ায় তিনিও ভোটের মাঠে কোনোভাবেই পিছিয়ে নেই। দুই প্রার্থীই মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। নানাভাবে ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন। একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে ছুড়ছেন কথার তীরও। এতে উত্তাপ ছড়াচ্ছে এলাকায়। তবে এখনো নির্বাচনি মাঠে অপ্রীতিকর কোনো ঘটনা ঘটেনি।
রাজধানীর সবচেয়ে অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত ঢাকা-১৩ আসনটি। এখানকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই সন্ত্রাস, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি ও মাদক সমস্যায় জর্জরিত। এজন্য এসব নাগরিক সমস্যা সমাধানের দিকে জোর দিচ্ছেন প্রার্থীরা।
ভোট নিয়ে স্থানীয়দের ভাবনা
আদাবরের শ্যামীল হাউজিং ২য় প্রকল্প এলাকার বাসিন্দা ইমাদ উদ্দিন বলেন, আমরা বছরের পর বছর বিভিন্ন নির্বাচনে প্রার্থীদের কাছ থেকে শুধু প্রতিশ্রুতি পাই। কখনো কিশোর গ্যাং নির্মূল করতে দেখা যায়নি। অনেক সময় দেখা গেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কোনো মাদক কারবারি কিংবা কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেফতার করলে রাজনৈতিক নেতারা তাদের ছাড়িয়ে নিতে তদবির করেন। আমরা চাই, এমন একজন সংসদ সদস্য আমাদের এই আসনে নির্বাচিত করা হবেন, যিনি এই এলাকা নিয়ে ভাববেন। যিনি এই এলাকার মানুষদের নিরাপত্তা কথা চিন্তা করবেন।

আদাবর ১৭ নম্বর এলাকার বাসিন্দা আব্দুস সোবহান বলেন, আমাদের এই এলাকা কিশোর গ্যাং ও মাদক কারবারিদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত। এদের রাজনৈতিক নেতারা শেল্টার দেন। যখন যিনি সংসদ সদস্য কিংবা কাউন্সিলর হয়ে আসেন তিনি কিশোর গ্যাং ও মাদক কারবারিদের সাথে জড়িয়ে পড়েন। এতে সাধারণ বাসিন্দাদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।
মোহাম্মদপুর বসিলা ৪০ ফিট এলাকার বাসিন্দা বদরুল আলম বলেন, এলাকায় আমরা নিরাপদে চলাচল করতে পারি না। আমাদের জীবনের নিরাপত্তা নাই। যেকোনো সময় কিশোর গ্যাং, ছিনতাইকারী চক্রের সদস্যরা এসে আকস্মিক হামলা করে সব চিনিয়ে নেয়। এই এলাকায় কেউ জায়গা কিনলে সন্ত্রাসীদের জন্য টাকার ভাগ রাখতে হয়। এছাড়াও কেউ নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিংবা বাড়ি করতে গেলেই মোটা অংকের চাঁদা রাখতে হয় সন্ত্রাসীদের জন্য। আমরা এই এলাকায় বসবাস করতে গিয়ে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছি। আশা করছি, আগামীতে সংসদ সদস্য হয়ে যিনি আসবেন, তিনি সর্বপ্রথম এসব অপরাধ দমনে কাজ করে এলাকায় শান্তি ফেরাবেন।
অপরাধ নির্মূলে প্রার্থীদের ভাবনা কী
ঢাকা-১৩ আসনের অন্তর্ভুক্ত এলাকায় অপরাধ কমাতে প্রার্থীরা তাদের ভাবনা ও পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী ববি হাজ্জাজ বলেন, ঢাকা-১৩ আসন নিয়ে আমি আশাবাদী। এ আসনের সব বাসিন্দাকে নিয়ে এক সাথে মিলে মিশে কাজ করে এখানকার অপরাধ কমানো সম্ভব। আমি নির্বাচিত হলে অন্তত এই এলাকার প্রতিটি পরিবারের সদস্য ও অভিভাবককে নিয়ে বসে আলোচনা করব। প্রতিটি শিশু-কিশোর ও যুবকের সাথে কথা বলে তাদের বোঝাতে হবে। আমরা অপরাধ কমাতে নানা উদ্যোগ করব। ইতোমধ্যে এই এলাকার সব সমস্যা সমাধান করতে বাসিন্দাদের সাথে কথা বলেছি। তারা তাদের ভোগান্তির কথা আমাকে জানিয়েছেন। আমি নির্বাচিত হলে এই এলাকার মাদক, কিশোর গ্যাং, ছিনতাই, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজি রোধে সব রাজনৈতিক নেতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিয়ে কাজ করব, যাতে কেউ কোনো ভোগান্তির শিকার না হতে হয়।
জামায়াত জোট মনোনীত রিকশা প্রতীকের প্রার্থী মাওলানা মানুনুল হক বলেন, মোহাম্মদপুর এলাকা দেশের মানুষের কাছে একটা আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটা সময় মানুষ আতঙ্কে বিভিন্ন এলাকায় বাসা ছেড়ে দূরে চলে গেছে। এমন একটা অপরাধপ্রবণ এলাকায় খুব দ্রুত সব নির্মূল করা সম্ভব না। তবে আমরা অপরাধীদের নির্মূলে অনেক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। প্রতিটি পাড়া-মহল্লায়, প্রতিটি পরিবারের সদস্যের সাথে অপরাধ নির্মূলে আমরা কথা বলছি। আমরা প্রতিটা যুবক, কিশোরের সাথে কথা বলে তাদের অপরাধের পেছনে যারা শেল্টার দিচ্ছে, আমরা তাদেরও বোঝানোর চেষ্টা করছি। আমরা চাই ঢাকা-১৩ আসনের মোহাম্মদপুর আদাবর এলাকা যেভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠছে, ঠিক সেভাবেই আবার সকল অপরাধ নির্মূল হয়ে এলাকাজুড়ে শান্তি ফিরে আসবে। আমরা ঢাকা ১৩ আসনের প্রতিটি এলাকায় অপরাধ নির্মূলে আলাদা আলাদা ভলেন্টিয়ার গঠন করে সন্ত্রাসী, মাদক বিক্রেতা ও কিশোর গ্যাং সদস্যদের তালিকা করার কাজ করছি। এসব তালিকা ধরে আমি নিজ উদ্যোগে সবার বাড়িতে গিয়ে তাদের বুঝিয়ে অপরাধের পথ থেকে ফিরিয়ে আনবো ইনশাআল্লাহ।

এই আসনে আলোচিত দুই প্রার্থী ছাড়াও আরও সাতজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সব প্রার্থী এলাকার সন্ত্রাসী কার্যক্রম নিয়ে উদ্বিগ্ন। সবাই অপরাধ নির্মূলে নিজস্ব পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। ভোটার এবং প্রার্থী সবার প্রত্যাশা মোহাম্মদপুর-আদাবর এলাকা একটি শান্তির নগরী হিসেবে গড়ে উঠবে।
প্রচার-প্রচারণায় সবর পুরো এলাকা
এই আসনে এবার মোট প্রার্থীর সংখ্যা নয়জন। ববি হাজ্জাজ ও মামুনুল হক ছাড়া অন্যরা হলেন- ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ থেকে আপেল মার্কা নিয়ে ফাতেমা আক্তার মুনিয়া, গণঅধিকার পরিষদ থেকে ট্রাক মার্কা নিয়ে মিজানুর রহমান, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) থেকে মই মার্কা নিয়ে মো. খালেকুজ্জামান, বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি (বিএমজেপি) থেকে রকেট মার্কা নিয়ে মো. শাহাবুদ্দিন, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ থেকে হারিকেন প্রতীক নিয়ে শাহরিয়ার ইফতেখার, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে শেখ মো. রবিউল ইসলাম ঘুড়ি মার্কা এবং সোহেল রানা কলস মার্কায় নির্বাচন করছেন।
প্রার্থীদের মধ্যে ধানের শীষ ও রিকশা প্রতীক ছাড়া বাকি প্রার্থীদের তেমন প্রচার-প্রচারণা চোখে পড়ছে না। স্থানীয় ভোটাররাও বলছেন বাকিদের তারা তেমন চিনেন না।
তবে প্রচার-প্রচারণায় আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে। নির্বাচনি আচরণবিধি অনুযায়ী পিভিসি ব্যানার, প্লাস্টিক ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কোনো উপকরণ ব্যবহার নিষিদ্ধ। একই সঙ্গে সড়কের মোড়, বৈদ্যুতিক খুঁটি, সড়ক বিভাজক কিংবা সরকারি স্থাপনায় পোস্টার লাগানোও আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। তবে বাস্তবে এর উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে ঢাকা-১৩ আসনের বিভিন্ন এলাকায়।
একাধিক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, রাতের আঁধারে নতুন নতুন ব্যানার টানানো হচ্ছে, যেন নজরদারি এড়ানো যায়।
প্রার্থীদের আচরনবিধি ভঙ্গ নিয়ে ঢাকা আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও রিটার্নিং অফিসার ইউনুচ আলী বলেন, এবারের নির্বাচনে আচরণবিধি ভঙ্গের কোনো সুযোগ নেই। যারাই আচরণবিধি ভঙ্গ করছে, আমরা তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছি।