নির্বাচন পরিচালনায় মাঠপর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। দায়িত্বটি মূলত জেলা প্রশাসকরাই পালন করে আসছেন। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে মাঠ প্রশাসনের ওপর নির্ভর করতে হয়। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগে নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার দেয়ার কথা বলা হয়েছে। যদিও আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের জন্য নিয়োগ পাওয়া ৬৯ রিটার্নিং কর্মকর্তার মধ্যে ইসি কর্মকর্তা রয়েছেন মাত্র তিনজন। আর বাকি কর্মকর্তাদের দুইজন বিভাগীয় কমিশনার ও ৬৪ জন জেলা প্রশাসক। ফলে আসন্ন নির্বাচনে সুষ্ঠু ভোট মূলত জেলা প্রশাসকদের ভূমিকার ওপরই নির্ভর করবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচনী ব্যবস্থাকে স্বতন্ত্র ও স্বাধীন কাঠামোতে পরিণত করার দাবি অনেক পুরনো। নির্বাচন কমিশনের জন্য পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল নিশ্চিত করা এবং নির্বাচনকালে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর ইসির কর্তৃত্ব এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। নির্বাচন কমিশনের প্রশাসননির্ভরশীলতা কাটাতে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা ।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের শাসনামলের তিনটি বিতর্কিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে ওঠা অভিযোগ তদন্ত এবং ভবিষ্যতে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে সুপারিশ প্রণয়নের জন্য একটি কমিটি গঠন করে। এ কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনটি নির্বাচনের অভিনব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কিছু কর্মকর্তার সমন্বয়ে বিশেষ সেল গঠন করা হয়, যা ‘নির্বাচন সেল’ নামে পরিচিতি লাভ করে। ২০১৪-২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে নির্বাচন ব্যবস্থাকে নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে মূলত প্রশাসনের হাতে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময়ে কমিশনের পরিবর্তে প্রশাসনই হয়ে ওঠে নির্বাচন পরিচালনার মূল শক্তি।
প্রশাসনের কর্মকর্তাদের এমন অনিয়মের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটি নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে তাদের বেশকিছু সুপারিশ উল্লেখ করে। এর মধ্যে আছে প্রশাসন ক্যাডার থেকে কোনো কর্মকর্তাকে নির্বাচন কমিশনে প্রেষণে নিয়োগ না দেয়া, প্রশাসনের বাইরে থেকে নির্বাচন কমিশনে সচিব নিয়োগের জন্য বিধিমালা প্রণয়ন করা, নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ এবং এ দায়িত্ব পালনের জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক কমিশনের কর্মকর্তা পাওয়া না গেলে প্রশাসনসহ অন্য ক্যাডার থেকে নিয়োগ।
গত বছর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরে কর্মরত যুগ্ম সচিব ও সমপর্যায়ের পদে থাকা প্রশাসনের ৩৩ জন কর্মকর্তাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়। তারা ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত বিতর্কিত নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এছাড়া তিনটি বিতর্কিত সংসদ নির্বাচনের (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) দায়িত্বে থাকা সাবেক জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) মধ্যে যাদের চাকরির বয়স ২৫ বছর হয়েছে, এমন অন্তত ২২ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।
রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের এমন ভূমিকার অভিজ্ঞতার পরও ইসি কেন প্রশাসননির্ভরশীলতা থেকে বের হতে পারছে না এমন প্রশ্ন করা হয় ইসি সচিব আখতার আহমেদকে। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নির্বাচন একটি সমন্বিত কর্মযজ্ঞ। এখানে সরকারের প্রতিটি অঙ্গ জড়িত থাকে। যেমন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ এবং ভোট কেন্দ্র ব্যবস্থাপনায় আনসার প্রয়োজন হয়। ইসির নিজস্ব জনবলের যে অবস্থা, কমিশনের একার পক্ষে নির্বাচন পরিচালনা সম্ভব নয়। ইসির মূল সক্ষমতার জায়গা হলো সমন্বয়। এটা হয়তো গত তিনটা নির্বাচনে হয়নি। কিন্তু এবার ভালো একটা নির্বাচন হবে।’
ইসি সচিব আরো বলেন, ‘সার্বিক সমন্বয়ের দায়িত্ব প্রশাসন ক্যাডারের পক্ষে যেভাবে সম্ভব, একা ইসি কর্মকর্তার পক্ষে সেটা সম্ভব নয়। এখন ধীরে ধীরে ইসির সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে। এটা আগামীতে আরো বাড়বে।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট পরিচালনা, ভোটগ্রহণ ও ফলাফল ঘোষণার নিয়ন্ত্রণ থাকছে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ওপর। ইসি সূত্র জানিয়েছে, ভোট গননা করা হবে সনাতনী পদ্ধতিতে, হাতে গুনে। ভোটগ্রহণ, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যক্রম রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নির্দেশনায় পরিচালিত হবে। এছাড়া পোস্টাল ব্যালট গণনা, ভোট বাতিলের পাশাপাশি নিরাপত্তা বাহিনীর লজিস্টিক ব্যবস্থাপনাও তাদের হাতে থাকবে।
নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রশাসন ক্যাডারের বাইরে স্বতন্ত্র ও স্বাধীন কাঠামোতে পরিণত করার দাবি অনেক পুরনো উল্লেখ করে রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার রাষ্ট্র সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব সংস্কারের দাবিতেই চব্বিশের অভ্যুত্থান হয়েছে। তবে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রশাসন ক্যাডারের বাইরে স্বতন্ত্র ও স্বাধীন কাঠামোতে পরিণত করার দাবি আরো পুরনো। নির্বাচন কমিশনের দক্ষ একটা জনবল কাঠামো এবং নির্বাচনকালে রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে পুরোপুরি কমিশনের কর্তৃত্বে আনার দাবিও অনেক দিনের। বহু রাজনৈতিক দল ও বুদ্ধিজীবী এ বিষয়ে লিখেছেন, বলেছেন। তবে প্রধানত এটা যে হলো না এবং নির্বাচনী ব্যবস্থায় উপজেলা প্রশাসন ও ডেপুটি কমিশনার অফিসের প্রভাব ও অংশগ্রহণ যে রয়ে গেল সেটা প্রধান প্রধান দলের রাজনৈতিক সংস্কারে দুর্বল অঙ্গীকারের কারণেই।’
এ রাজনৈতিক বিশ্লেষক আরো মনে করেন, নির্বাচনী প্রক্রিয়া যে ঘুরেফিরে বেসামরিক আমলাতন্ত্রনির্ভর হয়ে পড়ে। তার কারণ জাতীয় নির্বাচনের বিশাল কাজ সম্পন্ন করার জন্য নির্বাচন কমিশনকে ক্ষমতায়িত করা হয়নি। আইনিভাবে এবং জনবলের মাধ্যমে যে ক্ষমতায়ন দরকার ছিল।
মাঠপর্যায়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগে ইসিকে কেন প্রশাসননির্ভর হতে হয় এমন বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদের কাছে। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ইসি কেন নিজেদের সক্ষম জনবল গড়ে তুলতে পারল না, এটা আপনাদের মতো আমারও প্রশ্ন। কেন এখন অবধি এখানে বাইরের লোক সচিব বা গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকে। আমি মনে করি, “বিসিএস নির্বাচন” নামে একটি আলাদা ক্যাডার গঠন প্রয়োজন এবং তাদের পিএসসির মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া উচিত। নিয়োগের পর তারা জেলাপর্যায়ে কাজ করবেন এবং পর্যায়ক্রমে তাদের মধ্য থেকেই অতিরিক্ত সচিব বা সচিব নিয়োগ দেয়া হবে। দীর্ঘ সময় ধরে এখানে সচিব বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে বাইরের লোক নিয়োজিত ছিল। বর্তমানে একটি স্বতন্ত্র সার্ভিস বা নিয়োগ কাঠামোর কথা আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু এখন (আসন্ন নির্বাচনে) কমিশন যদি নিজেই নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালনা করতে যেত, তবে প্রতিষ্ঠানের মূল কাজে ব্যাঘাত ঘটতে পারে এবং নিয়োগ নিয়ে নানা বিতর্কের সৃষ্টি হতে পারে। আমরা চাই না প্রতিষ্ঠানটি কোনোভাবে বিতর্কের মুখে পড়ুক। তাই স্বচ্ছতার স্বার্থে পিএসসির মাধ্যমেই নিয়োগ হওয়া শ্রেয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘ইতিহাসে সাধারণত প্রশাসনিক কর্মকর্তাদেরই রিটার্নিং কর্মকর্তা করা হয়েছে। তবে আমরা এবার এ প্রথা ভাঙা শুরু করেছি। আমাদের সক্ষমতা ও জনবল সীমিত থাকা সত্ত্বেও এরই মধ্যে তিনজন নিজস্ব কর্মকর্তাকে রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দিয়ে এ প্রক্রিয়ার সূচনা করেছি। আমি আশ্বস্ত করছি যে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এবার কোনো রিটার্নিং অফিসারই বেআইনি কাজ করার সাহস পাবেন না।’
সাবেক নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন ‘নির্বাচনে প্রত্যাশিত রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগসংক্রন্ত মতামত’ শীর্ষক একটি জরিপ পরিচালনা করে। কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা এ জরিপের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তা নিয়োগের পক্ষে মত দিয়েছেন ৪৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ। অন্যদিকে জেলা প্রশাসকের পক্ষে ৪৪ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। বাকিরা জানেন না বা উত্তর দিতে ইচ্ছুক নন।
নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও সাবেক নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমার মনে হয়, কমিশনে যেহেতু অন্য সার্ভিস থেকে কর্মকর্তারা ডেপুটেশনের মাধ্যমে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তাদের ইসির কর্মকর্তাদের সম্পর্কে জানাশোনা কম। এজন্য তারা দ্বিধায় পড়ে যান যে ইসির কর্মকর্তারা কতটা কাজ করতে পারবেন বা আদৌ পারবেন কিনা তা নিয়ে। নির্বাচনকে সফল করার স্বার্থে নির্বাচন কমিশন তার নিজস্ব কর্মকর্তাদেরই যদি কাজে লাগাতে পারে তাহলে বেশি সফলতা পাবে।’