Image description

ইকোনমিক হিটম্যান বলতে সে ধরনের প্রভাবশালী পেশাদার বা মধ্যস্থতাকারীদের বোঝানো হয়, যারা উন্নয়ন ঋণ, নীতি-পরামর্শ ও করপোরেট চুক্তির আড়ালে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে উচ্চ ঝুঁকির ঋণ, অসম চুক্তি ও কৌশলগত বিনিয়োগে আবদ্ধ করে ফেলেন। এর ফলে ওই দেশের কৌশলগত সম্পদ, অর্থনৈতিক নীতি ও সার্বভৌম সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে

আধুনিক বিশ্বায়িত অর্থনীতির আলোচনায় রহস্যময় কিন্তু বহুল উল্লেখিত ধারণা হলো ‘ইকোনমিক হিটম্যান’। শব্দটি জনপ্রিয়তা পায় মার্কিন লেখক জন পারকিনসের ২০০৪ সালের বই ‘কনফেশনস অব অ্যান ইকোনমিক হিটম্যান’-এ। যেখানে তিনি দাবি করেন, উন্নয়ন ঋণ, নীতি-পরামর্শ ও করপোরেট চুক্তির মোড়কে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ঋণের জাল, কৌশলগত চুক্তি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে আটকে দিয়ে তাদের কৌশলগত সম্পদ ও সিদ্ধান্তগ্রহণ ক্ষমতার ওপর প্রভাব বিস্তার করাই এ ধরনের হিটম্যানদের কাজ।

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার বিদেশী ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ খাতে অভিজ্ঞ দুই বাংলাদেশী পেশাদারকে যুক্ত করে। তারা হলেন লুৎফে সিদ্দিকী ও চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন। লুৎফে সিদ্দিকীকে ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। অন্যদিকে আশিক চৌধুরীকে একই বছরের ১২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে আনা হয়। লুৎফে সিদ্দিকীর মূলত আন্তর্জাতিক বিষয়াবলির ওপর কাজ করার কথা। পাশাপাশি তিনি আগের সরকারগুলোর সময়ে সংঘটিত অর্থনৈতিক অপরাধ ও খেলাপি ঋণ (নন-পারফর্মিং লোন) তদন্তের জন্য একটি ‘ট্রুথ কমিশন’ গঠনের কথাও বলেছিলেন। অন্যদিকে আশিক চৌধুরীর মূল ম্যান্ডেট ছিল বিনিয়োগ আনয়নে সংস্কার ও বিনিয়োগবান্ধব কাঠামো তৈরি। অর্থাৎ দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীর আস্থা ফেরানো।

কিন্তু এ দুজনের সক্রিয় ও আগাম উদ্যোগী ভূমিকা চোখে পড়লেও তাদের বেশকিছু কর্মতৎপরতা নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। অনেকের মতে, সংস্কারের অগ্রভাগে অবস্থান করলেও এ দুজনের কর্মকাণ্ডে তাদের ঘোষিত মূল কাজের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে রাষ্ট্রীয় কেনাকাটা, বন্দর ও বড় অবকাঠামো চুক্তির মতো ‘হাই-ভ্যালু ডিল’। রাষ্ট্র পুনর্গঠনে নীতিগত সংস্কার ও ব্যবসায় পরিবেশের উন্নয়নের বদলে তাদের আগ্রহ কেন্দ্রীভূত হয়েছে এমন সব বিষয়ে, যেগুলো দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তগ্রহণ ক্ষমতা ও সম্পদ নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন তোলে।

জানতে চাইলে লুৎফে সিদ্দিকী ও আশিক চৌধুরীর ভূমিকায় জাতীয় স্বার্থ উপেক্ষিত থাকা এবং ইকোনমিক হিটম্যানসুলভ কর্মকাণ্ড নিয়ে কোনো মূল্যায়ন করেননি সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ইকোনমিক মডেলিংয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্কসহ বিনিয়োগ পরিবেশের বিষয়ে কার্যকর কোনো ভূমিকা যে লুৎফে সিদ্দিকী ও আশিক চৌধুরী রাখতে পারেননি, সেটা দৃশ্যমান। তবে তাদের উদ্যোগ ছিল, কর্মস্পৃহাও ছিল। কিন্তু তাদের একার পক্ষে কোনো কিছুই সম্ভব না। তাদের কর্মতৎপরতার পাশাপাশি সমন্বিত উদ্যোগেরও প্রয়োজন ছিল।’

‘আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত’ হিসেবে নিয়োগের আগে লুৎফে সিদ্দিকী ইউবিএস, বার্কলেস ও গোল্ডম্যান স্যাকসের মতো বহুজাতিক ব্যাংকে কাজ করেছেন। জন্মসূত্রে বাংলাদেশী হলেও দীর্ঘদিন প্রবাসে ছিলেন; যুক্তরাজ্য ও সিঙ্গাপুরে অধ্যাপনার অভিজ্ঞতাও আছে। বৈবাহিক সূত্রেও সিঙ্গাপুরে রয়েছে স্থায়ী ও অবাধ বিচরণ। নিয়োগের এক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি আইএমএফের অতিরিক্ত ঋণ ও শর্ত বাস্তবায়নে সমন্বয়কের ভূমিকা নেন। লক্ষ্য ছিল ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের কর্মসূচির সঙ্গে আরো ৩ বিলিয়ন ডলার সহায়তা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি আইএলও রোডম্যাপ অনুযায়ী শ্রম আইন সংশোধন এবং চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) ও বে-টার্মিনালে বিদেশী অপারেটর নিয়োগ চুক্তির আলোচনা নিয়েও তিনি সক্রিয় ছিলেন।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দর নিয়েই আগাম উদ্যোগী ছিলেন স্কাইডাইভিংয়ে খ্যাতি অর্জন করা বিনিয়োগ ব্যাংকার চৌধুরী আশিক বিন মাহমুদ হারুন। বিডা-বেজার দায়িত্ব নেয়ার আগে তার ক্যারিয়ারের সিংহভাগ কেটেছে বৈশ্বিক বিনিয়োগ ব্যাংকিং ও অর্থায়ন খাতে। দায়িত্ব গ্রহণের পর তার তৎপরতার বড় অংশ ছিল চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবস্থাপনায় বিদেশী কোম্পানিকে যুক্ত করার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়া। পতেঙ্গা ও নিউমুরিং টার্মিনালে বিদেশী কোম্পানি নিয়োগের তৎপরতায় তিনি ভূমিকা রাখেন। এছাড়া মহেশখালী-মাতারবাড়ী অঞ্চলে ‘মিডা’ গঠন, প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ লক্ষ্য এবং গভীর সমুদ্রবন্দর ও শিল্পাঞ্চলের জন্য বিশ্বব্যাংক, জাইকা ও এডিবির ঋণ প্রস্তাব নিয়েও তিনি কাজ করছেন।

লুৎফে সিদ্দিকী প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূতের দায়িত্ব নেয়ার পর চট্টগ্রাম বন্দরকে তার ‘হাই প্রায়োরিটি’ তালিকায় রাখেন। বন্দরের পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) এবং বে-টার্মিনালে বিদেশী অপারেটরদের নিয়োজিত করার বিষয়টি নিয়ে ছিলেন বেশ সক্রিয়। বিশেষ করে সিঙ্গাপুরভিত্তিক পোর্ট অপারেটর পিএসএ ইন্টারন্যাশনাল এর সঙ্গে যেসব আলোচনা হয়েছে সেখানে লুৎফে সিদ্দিকীর দীর্ঘদিনের সিঙ্গাপুর প্রবাসের পেশাগত সম্পর্কগুলো প্রভাব ফেলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। লুৎফে সিদ্দিকীর কার্যক্রম পর্যালোচনায় দেখা যায়, তিনি সরাসরি বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এবং পরোক্ষভাবে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বন্দর নিয়ে একাধিক সভা করেছেন। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কমপক্ষে চারটি বড় সভায় অংশ নিয়েছেন তিনি।

লুৎফে সিদ্দিকীর চট্টগ্রামকেন্দ্রিক চারটি সফর ও কর্মসূচির মধ্যে প্রথমটি হয় ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বরে। ওই সফরে তিনি চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও বিদেশী বিনিয়োগের প্রস্তুতি নিয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেন। পিসিটি পরিচালনায় সিঙ্গাপুরভিত্তিক অপারেটর পিএসএ ইন্টারন্যাশনালকে যুক্ত করার বিষয়ে কারিগরি আলোচনা হয়। পাশাপাশি বে-টার্মিনাল প্রকল্পের নির্ধারিত ভূমি পরিদর্শন করে ভূমি ও আইনি জটিলতা নিরসনে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের কথা বলা হয় এবং বন্দরের পেপারলেস ট্রেডিং/ডিজিটাল সিস্টেমে পণ্য খালাস প্রক্রিয়া চালুর নির্দেশনার কথা উল্লেখ করা হয়। এরপর ২০২৫ সালের ১৩ মে তিনি চট্টগ্রাম ইপিজেড এলাকায় প্যাসিফিক জিন্সসহ পরিবেশবান্ধব ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি’ পরিদর্শন করেন; উৎপাদন প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সামনে উপস্থাপনের জন্য ভিডিও-স্থিরচিত্র ধারণের ব্যবস্থা করা হয় এবং রফতানিকারকদের সঙ্গে বৈঠকে ‘গ্রিন চ্যানেল’ লজিস্টিক সুবিধার আশ্বাস দেন। ২৩ আগস্টে মিরসরাইয়ের শিল্প নগর পরিদর্শনে বিডা-বেজার অধীন অর্থনৈতিক অঞ্চলে গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ ও অবকাঠামো প্রস্তুতি পর্যালোচনা করেন; সম্ভাব্য ‘এনক্লেভ’ জোন নিয়েও নির্দেশনার কথা আসে। গত বছরের ১২ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের র‍্যাডিসন ব্লুতে আন্তর্জাতিক লজিস্টিকস সম্মেলনে তিনি দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতাকে এফডিআইয়ের বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করে রোডম্যাপ বলেন এবং সিঙ্গাপুর-ইউএই বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে একান্ত বৈঠকে বিনিয়োগ আহ্বান জানান।

সরকারি কেনাকাটায় সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিশেষ কিছু বিক্রেতা বা ট্রেডিং হাউজ নির্ধারণের ক্ষেত্রেও লুৎফে সিদ্দিকীর নেপথ্য ভূমিকা ছিল বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট অনেকে। সরকারি ক্রয়ে গৃহীত নীতির মাধ্যমে খাদ্য, জ্বালানি ও কারিগরি প্রকিউরমেন্টের ক্ষেত্রে যেসব পরিবর্তন আনা হয়েছে, সেখানে সিঙ্গাপুরভিত্তিক নির্দিষ্ট কিছু কোম্পানির প্রতি লুৎফে সিদ্দিকীর বিশেষ আনুকূল্যের অভিযোগও উঠেছে সংশ্লিষ্ট মহলে।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর বড় ধরনের সরকারি কেনাকাটা, বিশেষ করে জ্বালানি, গম ও চাল আমদানির সিদ্ধান্তের নেপথ্যে লুৎফে সিদ্দিকী মূল ভূমিকা পালন করছেন। উৎপাদক দেশ না হওয়া সত্ত্বেও অনেক পণ্য সরাসরি সিঙ্গাপুরের সরবরাহকারীদের কাছ থেকে কেনা হচ্ছে। এমনকি ভারত থেকে চাল কেনা হলেও এর সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সিঙ্গাপুরের। এছাড়া লুৎফে সিদ্দিকী উপদেষ্টা পদমর্যাদার বিশেষ দূত হলেও তার কর্মসময়ের উল্লেখযোগ্য অংশ সিঙ্গাপুরে অবস্থান করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

লুৎফে সিদ্দিকী আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর বাংলাদেশের রফতানিমুখী খাতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ ছিল আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) রোডম্যাপ অনুযায়ী শ্রম আইন সংশোধন করা। এ ধারাবাহিকতায় দায়িত্ব গ্রহণের পর লুৎফে সিদ্দিকী জেনেভায় আইএলওর গভর্নিং বডির সভায় একাধিকবার বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তার মূল লক্ষ্য ছিল ২০২৬ সালের মধ্যে শ্রম আইনকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা। এক্ষেত্রে তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

লুৎফের উদ্যোগগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ট্রেড ইউনিয়ন গঠন সহজীকরণ নিশ্চিত করা। এক্ষেত্রে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার জন্য প্রয়োজনীয় সদস্য সংখ্যার হার সীমা ২০ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ বা তার নিচে নামিয়ে আনার প্রস্তাব ছিল, আইএলওর চাপে যা মেনে নেয়া হয়। এ বিষয়ে স্থানীয় শিল্প উদ্যোক্তারা বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পসংশ্লিষ্টরা এ সংশোধনীর উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও বেশকিছু বিষয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাদের প্রধান অভিমতগুলোর অন্যতম ছিল অসম প্রতিযোগিতা। উদ্যোক্তাদের মতে, হুট করে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন সহজ করলে বাইরের রাজনৈতিক বা ভেস্টেড গ্রুপের অনুপ্রবেশ ঘটতে পারে, যা কারখানার উৎপাদনশীলতা ও শৃঙ্খলা নষ্ট করবে। আবার হয়রানিবিষয়ক কনভেনশনের মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে সংশ্লিষ্টদের।

শ্রম আইন সংশোধনবিষয়ক আলোচনাগুলোয় যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘শ্রম উপদেষ্টা নিজে নিশ্চিত করেছিলেন বেশকিছু বিষয় শ্রম আইনের অন্তর্ভুক্ত করা হবে না। যেমন শ্রমিকের সংজ্ঞার আওতায় কর্মচারী আসবে না। আমি নিজে সাক্ষী এ ধরনের বিষয়গুলো আইনের মধ্যে থাকবে না, সরকারের পক্ষ থেকে এমন প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। দুই সপ্তাহ পরে দেখা গেল শ্রম আইন আগের জায়গায় চলে গেছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘বন্দর (চট্টগ্রাম বন্দর) নিয়ে আমাদের সঙ্গে কথা বলার কথা। কিন্তু তা হয়নি। সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে একচেটিয়া। প্রশ্ন জাগে বন্দরে তিন বছর ধরে যদি মুনাফা হয়, তাহলে চার্জ বাড়ানোর কী দরকার ছিল? বন্দর পরিচালনার ক্ষেত্রে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি কেন অনুসরণ করা হলো না। এটা বোধগোম্য নয় যে এসব ক্ষেত্রে এত তাড়াহুড়ার কী আছে? সংস্কারের অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রও ছিল।’

চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনের কর্মকাণ্ড নিয়েও বিভিন্ন মহলে সমালোচনা রয়েছে। তার কর্মপদ্ধতি, নীতিনির্ধারণী ক্ষমতার পরিসর এবং কৌশলগত খাতে বিদেশী করপোরেটদের সম্পৃক্ততা নিয়ে কিছু পর্যবেক্ষক প্রশ্ন তুলছেন। বিনিয়োগসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, এ বিতর্কের সূচনা হয় লুইজিয়ানাভিত্তিক জ্বালানি প্রতিষ্ঠান আর্জেন্ট এলএনজির ২০২৫ সালের ২৪ জানুয়ারির এক বিবৃতির পর। ওই বিবৃতিতে জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্রে বছরে ২ কোটি ৫০ লাখ টন সক্ষমতার একটি এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে একটি অ-বাধ্যতামূলক (নন-বাইন্ডিং) চুক্তি হয়েছে, যার আওতায় বাংলাদেশ বছরে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টন এলএনজি কিনতে পারবে। তবে প্রকল্পটি গ্রিনফিল্ড হওয়ায় ২০৩০ সালের আগে গ্যাস সরবরাহের সম্ভাবনা নেই বলে জানা যায়। এ চুক্তিতে বাংলাদেশের পক্ষে আশিক চৌধুরী স্বাক্ষর করেন। সে সময় গ্যাসসংক্রান্ত একটি চুক্তিতে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর নিয়েও সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন ও আলোচনা তৈরি হয়েছিল।

এছাড়া তার বিডা, বেজা, পিপিপি ও মিডার শীর্ষপদে থাকা নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। দেশের ইতিহাসে এর আগে কোনো একক ব্যক্তির হাতে দেশের বিনিয়োগ, শিল্পাঞ্চল ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের এমন একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল না। একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় একই ব্যক্তির নেতৃত্ব থাকায় ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

আশিক চৌধুরী দায়িত্ব নেয়ার পর পিসিটি এবং বে-টার্মিনাল প্রকল্পের কাজ ত্বরান্বিত করার নামে সিঙ্গাপুরভিত্তিক পিএসএ এর সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ গড়ে তুলেছেন। এমনকি আশিক চৌধুরী বন্দরসংশ্লিষ্ট আইনি জটিলতা নিরসনে বিচার বিভাগের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গেও যোগাযোগ রেখেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

আশিক চৌধুরী এইচএসবিসি ব্যাংকের দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের বিনিয়োগ ব্যাংকিং বিভাগের সাবেক পরিচালক ছিলেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, এ ধরনের আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা নীতিনির্ধারণ ও বিনিয়োগ উদ্যোগে প্রভাব ফেলতে পারে। তারা বলেন, গ্লোবাল ব্যাংকগুলো নানা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ও বড় করপোরেট প্রকল্পের সঙ্গে কাজ করে; ফলে সরকারি দায়িত্বে থেকে বিদেশী বিনিয়োগ আনতে উদ্যোগ নেয়ার ক্ষেত্রে তার আগের পেশাগত নেটওয়ার্কের কিছু সংযোগও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে। বিদেশী বিনিয়োগের নামে অসম সুযোগ সৃষ্টির অভিযোগ রয়েছে আশিক চৌধুরীর বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিডা ও বেজার নেতৃত্বে বিদেশী কোম্পানিকে বেশি সুযোগ-সুবিধা দিলে স্থানীয় উদ্যোক্তারা তুলনামূলকভাবে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারেন। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এ নীতির ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে দেশীয় শিল্পমালিকদের হাত থেকে ছিটকে গিয়ে বহুজাতিক করপোরেটদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। বন্দরের মতো কৌশলগত রাষ্ট্রীয় সম্পদে বিদেশী করপোরেটদের সম্পৃক্ত করার প্রক্রিয়াটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে নানা ব্যাখ্যা ও মূল্যায়ন রয়েছে। কিছু পর্যবেক্ষকের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত প্রশ্ন সামনে আনে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, লুৎফে সিদ্দিকীর নিয়োগ ও কার্যপরিধির মধ্যে স্পষ্টতা ঘাটতি ছিল এবং দায়িত্বের সীমারেখা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিষয় বলতে দেশের ভেতরের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত অংশগুলো কীভাবে কাভার হবে—এ বিষয়ে শুরুতেই পরিষ্কার নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন ছিল। সাধারণ দৃষ্টিতে কোনো দেশের সঙ্গে ট্যারিফ নেগোসিয়েশন বা আইএমএফের সঙ্গে নেগোসিয়েশন করা স্পেশাল এনভয়ের কাজের মধ্যে পড়ে না। বিষয়গুলো সাধারণভাবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়—যেমন অর্থ, বাণিজ্য বা নৌ-পরিবহনের দায়িত্বের আওতায় পড়ে। যদিও লুৎফে সিদ্দিকী এসব জায়গায় ভূমিকা রাখছেন। অন্যদিকে বিডার পূর্বতন চেয়ারম্যানদের তুলনায় আশিক চৌধুরীকে বেশি সক্রিয় দেখা গেলেও বিনিয়োগ পরিবেশ সংস্কারে দীর্ঘমেয়াদি ও কাঠামোগত কর্মসূচির অগ্রগতি প্রত্যাশিত মাত্রায় হয়নি। নীতিগত সংস্কারের চেয়ে উদ্যোগগুলোর চমকপ্রদ উপস্থাপনের দিকটি তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্রের আর্জেন্ট এলএনজির বিষয়ে তাদের ঘোষণাটি ছিল বিভ্রান্তিকর। আবার ইনভেস্টমেন্ট সামিট আয়োজন করাও প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। এমন সময় ওই সামিটে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আনা হয় যখন দেশে মব সহিংসতা বেড়ে চলছিল। সামিটে দাবি করা হয়েছিল বাংলাদেশে বিনিয়োগ করবে নাসা ও স্টারলিংকের মতো প্রতিষ্ঠান। তাদের এমন দাবিকে শুধু লোক দেখানো কর্মকাণ্ড বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

গত ১৬ মাসে অর্থনৈতিক সুশাসন, প্রবৃদ্ধির চাকা বেগবান এবং ব্যাপক অর্থনৈতিক সংস্কারের চমৎকার সুযোগ এসেছিল বলে মনে করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাশরুর রিয়াজ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিশ্রুতিগুলোও সেদিকেই ছিল। শুরুতে তারা কিছু ভালো পদক্ষেপও নিয়েছিল। কিন্তু পরে বেশির ভাগ উদ্যোগকে আর নেক্সট লেভেলে নেয়া হয়নি। বড় গ্যাপ সৃষ্টি হয়। কিন্তু ওই সময় সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য সহায়ক পরিবেশ ছিল। আমলাতন্ত্রের সহযোগিতা চাইলে পাওয়া যেত। দেশী-বিদেশী বেসরকারি খাত সরকারের পক্ষে জোরালো অবস্থানে ছিল। তার পরও অর্থনৈতিক সংস্কার খুবই সামান্য এবং ধীরগতিতে কাজ করেছে। দেড় বছরে আমরা সবকিছু শেষ করতে হয়তো পারতাম না, কিন্তু অন্তত সংস্কারের কর্মসূচি চালু করতে পারতাম।’

বিনিয়োগ পরিবেশের কর্মসূচি নেয়া সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ নিচের দিকে চলে গেছে গত দেড় বছরে। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন, বাণিজ্য কাঠামো ও দক্ষতাবিষয়ক যে পুঞ্জীভূত সমস্যা ছিল সেখানে কোনো সমন্বিত সংস্কার কর্মসূচি শুরু হয়নি। উল্টো বেসরকারি খাতের সঙ্গে সরকারের ব্যাপক দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি দেশীয় বেসরকারি খাতকে দূরে রাখা হয়েছে। বেসরকারি খাতের সঙ্গে সংলাপের ঘাটতির কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট তৈরির পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংস্কারগুলোকেও ব্যাহত করেছে। বিনিয়োগ, বৈদেশিক বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনেক আশা থাকলেও তা পূরণ হয়নি।’