Image description
 

স্বর্ণের দাম ইতিহাস ছুঁয়েছে। বিনিয়োগকারীরা রাজনীতির টালমাটাল পরিস্থিতিতে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটেছেন মূল্যবান ধাতুর দিকে।

সোমবার প্রথমবারের মতো স্বর্ণের দাম আউন্সপ্রতি ৫,০০০ ডলার ছাড়ায়। কিছু সময়ের জন্য তা বেড়ে ৫,৫০০ ডলারেও পৌঁছায়। রুপা ও প্লাটিনামের দামও একযোগে বেড়ে যায়।

তবে এরপর হঠাৎ করে দাম আবার পড়ে যায়, যখন যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তা সত্ত্বেও, গত বছরের তুলনায় দাম এখনো অনেক বেশি।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির কারণে বিশ্ববাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভরসা কমে। সেই অনিশ্চয়তা স্বর্ণের প্রতি আকর্ষণ বাড়িয়েছে বলে মনে করেন হারগ্রিভস ল্যান্সডাউনের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ এমা ওয়াল।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে স্বর্ণ ও রুপার দাম যখন রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়, তখনই শেয়ারবাজারের পতন শুরু হয়। ট্রাম্প তখন ইউরোপের আটটি দেশের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের হুমকি দেন। এই দেশগুলো তার গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছিল।

ক্যাপিটাল ইকোনমিকস-এর অর্থনীতিবিদ হামাদ হুসেইন বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের বিদেশনীতি ও অর্থনৈতিক নীতি ঘিরে ঝুঁকি বাড়ায় অনেকেই স্বর্ণকে নিরাপদ মনে করেছেন।

ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারির মধ্যে স্বর্ণের দাম প্রায় তিন গুণ বেড়ে ৫,৪১৭ ডলারে পৌঁছে যায়।

ইউক্রেন ও গাজায় যুদ্ধ, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর ওপর মার্কিন হস্তক্ষেপ—সবকিছু মিলিয়ে বৈশ্বিক অস্থিরতা বেড়ে যায়।

ট্রাম্পের ‘গ্রিনল্যান্ড’ হুমকির পর বিশ্বজুড়ে ডলারের ওপর বিশ্বাস কমে। বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি এড়িয়ে মূল্যবান ধাতুর দিকে ঝুঁকে পড়েন। সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে যখন ট্রাম্প ‘লিবারেশন ডে’ শুল্ক ঘোষণা করেন।

এমা ওয়াল বলেন, ‘বিশ্ব যখন জটিল হয়ে পড়ে, স্বর্ণ তখন তার পরিচিত পথে চলে—বাড়ে। বাণিজ্য বিরোধ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা—সবকিছুতেই স্বর্ণ মাথা তোলে।’

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও চীনের মধ্যে নতুন উত্তেজনা, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা, এমনকি ওয়াশিংটনে সরকার বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও স্বর্ণের প্রতি আগ্রহ বাড়িয়েছে।

ব্লুমবার্গের আরেকটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬ সালের ৩০ জানুয়ারির মধ্যে রুপার দাম আগের বছরের তুলনায় ২১৪ শতাংশ বেড়েছে, স্বর্ণ ৮০ শতাংশ, আর ডলারের মান ১০ শতাংশ কমেছে।

এই দাম বৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনা।

এমা ওয়াল বলেন, ‘বিনিয়োগকারী ও বিশ্বের অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংকই এখন স্বর্ণকে তাদের রিজার্ভ হিসেবে বেছে নিচ্ছে। কারণ, এটি যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ভরতা থেকে কিছুটা সুরক্ষা দেয়।’

রাশিয়ার ডলারভিত্তিক সম্পদ বাজেয়াপ্ত হওয়ার বিষয়টি দেখে অনেক দেশ হয়তো ভাবছে, স্বর্ণই হতে পারে নিরপেক্ষ রিজার্ভ।

হুসেইন জানান, ২০২৫ সালে স্বর্ণ কেনার গতি কিছুটা কমেছে, যদিও ২০২২ সালের তুলনায় এখনো বেশি।

চীন এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্বর্ণ ক্রেতা। দেশটিতে ব্যক্তিগত গহনা কেনা ও বিনিয়োগ—উভয়ই বাড়ছে।

পাশাপাশি পশ্চিমা দেশগুলোর বিনিয়োগকারীরাও স্বর্ণে ব্যাপক অর্থ ঢালছেন। অনেকেই স্টক মার্কেটে থাকা স্বর্ণভিত্তিক কোম্পানিতে বিনিয়োগ করছেন।

ডিজিটাল মুদ্রা কোম্পানি ‘টেথার’ সম্প্রতি এত পরিমাণ স্বর্ণ কিনেছে যে, তাদের রিজার্ভ কিছু ছোট দেশের চেয়েও বেশি বলে খবর প্রকাশ পেয়েছে।

ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে স্বর্ণের দাম একদিনে ৫,৫৮৫ ডলার থেকে কমে ৫,০৬০ ডলারে নেমে আসে। রুপার দাম ১২০ ডলার থেকে নেমে দাঁড়ায় ৯৯ ডলারে।

গত কয়েকদিনে দাম কমার কারণ হিসেবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, ট্রাম্প এমন একজন ফেড চেয়ারম্যান বেছে নেবেন, যিনি তার সুদের হার কমানোর চাপে নতি স্বীকার করবেন—এই আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়ে। এতে ডলার দুর্বল হবে, মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে—এই ভয়েই অনেকেই স্বর্ণ কিনেছিলেন।

কিন্তু পরে জানা যায়, ট্রাম্প সম্ভবত কেভিন ওয়ার্শকে নিয়োগ দেবেন, যিনি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল পছন্দ হিসেবে বিবেচিত। এরপরই স্বর্ণ, রুপা ও প্লাটিনামের দাম পড়ে যায়।

তবু, এখনো দাম গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি। কারণ, বৈশ্বিক উত্তেজনা, বিদ্যমান শুল্ক, সম্ভাব্য নতুন শুল্ক, এবং চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি কাটেনি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বর্ণের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর দুর্লভতা।

এবিসি রিফাইনারির প্রধান নিকোলাস ফ্রাপেল বিবিসিকে বলেন, ‘স্বর্ণ রাখলে সেটা কারও ঋণের সঙ্গে জড়িত থাকে না। যেমন বন্ড বা শেয়ারে কোম্পানির অবস্থা ফলাফল নির্ধারণ করে। স্বর্ণ তার নিজস্ব পথে চলে।’

তবে শুক্রবারের দাম ওঠানামা প্রমাণ করে, স্বর্ণের মূল্য যেমন হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে, তেমনি হঠাৎ করে পড়েও যেতে পারে—যেমনটা হয়ে থাকে অন্য সব পণ্য বাজারে।