স্বর্ণের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। এক বছরের হিসাব করলে দেখা যায়, গত বছরের এই সময়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম ছিল ১,৪১,০০০ টাকা। কিন্তু এখন তা দাঁড়িয়েছে ২,৬২,০০০ টাকায়, অর্থাৎ মাত্র ১২ মাসে দাম বেড়েছে ১,২১,০০০ টাকা।
বাংলাদেশে এমন কোনো বিনিয়োগ পণ্য নেই যেখানে এক লাখের মতো টাকা বিনিয়োগ করলে এক বছরের মধ্যে প্রায় ১ লাখ টাকার মুনাফা পাওয়া সম্ভব। তাই স্বর্ণ স্বাভাবিকভাবেই বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যদিও দেশে সরাসরি স্বর্ণে বিনিয়োগের সুযোগ নেই, তবে অলংকার কিনে বিনিয়োগ করতে হয়। এক ভরির অলংকার বানাতে গেলে স্বর্ণের মূল্যের সঙ্গে ভ্যাট ও মজুরি বাবদ ১১ শতাংশ অতিরিক্ত খরচ করতে হয়। তারপরও স্বর্ণ লাভজনক।
স্বর্ণে অনিশ্চয়তা ও বাজার প্রভাব
বিশ্ব অর্থনীতির ওঠাপড়ার সঙ্গে স্বর্ণের দাম ওঠানামা করে। বৈশ্বিক অস্থিরতা মানেই স্বর্ণের মূল্য বৃদ্ধি। সাম্প্রতিককালে ইরানে বিক্ষোভ, ভেনেজুয়েলায় প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ—এসব ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে।
বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চয়তার সময়ে সাধারণত স্বর্ণ ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুকে ‘নিরাপদ আশ্রয়’ হিসেবে বিবেচনা করেন। এর প্রভাবই দেখা গেছে। বৈশ্বিক বাজারে সোমবার প্রথমবারের মতো প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৫,০০০ মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে।
দেশের বাজারে প্রভাব
বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশে স্বর্ণের দামও বাড়ছে। আজ ভরিতে দাম ১,৫০০ টাকা বেড়েছে। আগামীকাল মঙ্গলবার ভরিপ্রতি দাম ৫,২৪৯ টাকা বাড়তে পারে। এতে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম দাঁড়াবে ২,৬২,৪৪০ টাকা।
এ পরিস্থিতিতে অনেকেই পুরোনো স্বর্ণের অলংকার বিক্রির কথা ভাবছেন। তবে দাম টানা বাড়ছে, তাই লাভের হিসাবও প্রায় প্রতিদিন পরিবর্তিত হচ্ছে।
পুরোনো অলংকার বিক্রি করলে মুনাফা
পুরোনো অলংকার বিক্রি করতে গেলে জুয়েলার্স সাধারণত ওজন যাচাই করে স্বর্ণের ক্যারেট নিশ্চিত করবে। তারপর ওজন থেকে ১৭ শতাংশ বাদ দিয়ে মূল্য নির্ধারণ করা হয়।
ধরা যাক, আপনি দশ বছর আগে ৭০,০০০ টাকায় ২২ ক্যারেটের এক ভরি অলংকার কিনেছিলেন। এখন তা বিক্রি করলে আপনি পাবেন ২,১৭,০০০ টাকা, অর্থাৎ ভরিতে মুনাফা ১,৪৭,০০০ টাকা। ২১ বা ১৮ ক্যারেটের অলংকার হলে মুনাফা সামান্য ভিন্ন হবে।
ভবিষ্যতের দাম নিয়ে পূর্বাভাস
বৈশ্বিক বাজারে স্বর্ণের দাম আরও বাড়বে— এটি পূর্বাভাসই ছিল। বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকস বলেছে, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৫,৪০০ ডলারে পৌঁছতে পারে। এর আগে তাদের পূর্বাভাস ছিল ৪,৯০০ ডলার।
লন্ডন বুলিয়ন মার্কেট অ্যাসোসিয়েশনের (এলএমবিএ) জরিপ অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালে স্বর্ণের দাম সর্বোচ্চ ৭,১৫০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। গড় দাম হতে পারে ৪,৭৪২ ডলার। স্বাধীন বিশ্লেষক রস নরম্যান মনে করেন, চলতি বছরে স্বর্ণের দাম ৬,৪০০ ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে, গড় দাম ৫,৩৭৫ ডলার।
করোনাকালে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ২,০০০ ডলারে ছিল। পাঁচ বছরের মধ্যে তা ৫,০০০ ডলারে পৌঁছেছে— যা পূর্বে কেউ কল্পনাও করতে পারতেন না।
সিদ্ধান্ত
বর্তমান পরিস্থিতিতে পুরোনো স্বর্ণের অলংকার বিক্রি করে মুনাফা নেওয়া এখন ভালো সময়। আবার কেউ চাইলে বিক্রির জন্য অপেক্ষা করেও লাভবান হতে পারেন, কারণ দাম আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত আপনারই হাতে।