Image description
 

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রায় শেষ হয়ে এল। প্রায় দেড় বছরের শাসন শেষ হওয়ার পর এখন তাদের কিছু প্রাথমিক মূল্যায়ন করা যেতে পারে।

গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বেশ কিছু বড় বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বৃহৎ পরিসরে সাংবিধানিক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার তারা গণভোটের জন্য রেখে গেলেও নির্বাহী আদেশেও বেশ কিছু বড় মাপের কাজ এই সরকারের আমলে হয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ গত বছর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি) বিলুপ্ত করে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ নামে দুটি বিভাগ করে ১২ মে অধ্যাদেশ জারি করে সরকার। পরবর্তী সময়ে এনবিআর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কঠোর আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে, রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, দুটি বিভাগেই রাজস্ব খাতের অভিজ্ঞদের নিয়োগসহ ঘোষিত অধ্যাদেশে বেশ কিছু সংশোধনী আনে সরকার।

এ ছাড়া গত নভেম্বরে পতেঙ্গার লালদিয়ায় নতুন টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালের সঙ্গে ৩৩ বছরের চুক্তি করে সরকার। একই দিন বিকেলে বুড়িগঙ্গার তীরে পানগাঁও নৌ টার্মিনাল ২২ বছর পরিচালনার জন্য সুইজারল্যান্ডের মেডলগ এসএ কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ ছাড়া পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিটিসি) পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে সরকার। মাত্র দেড় বছরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিদায় নেওয়ার পথে থাকলেও এসব চুক্তির ফলাফল বাংলাদেশকে বহন করতে হবে দীর্ঘদিন।

পুরোটা সময়ই নানা মত ও সমালোচনার মধে৵ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিভিন্ন সংস্কারকাজ চালিয়ে গেছে। যা তারা করতে পারেনি, তা গণভোটের জন্য অপেক্ষমাণ রেখে যাচ্ছে। অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মূলত ‘উদারনৈতিক অর্থনীতি’র দিকেই এগিয়েছে। আগে উল্লিখিত বিভিন্ন বন্দর ও টার্মিনাল বিদেশিদের কাছে দীর্ঘমেয়াদে লিজ দেওয়া নিয়ে যখন বামপন্থী রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের বিভিন্ন অংশের পক্ষ থেকে উদ্বেগ ও প্রতিবাদ জানানো হয়েছে, তখন সেসবের বিপরীতে একটি টিভি টকশোতে সরকারের প্রেস সচিব বলেন, ‘বামপন্থীরা দেশকে বনসাই বানিয়ে রাখতে চায়। অন্তর্বর্তী সরকারের সবকিছু করার এখতিয়ার আছে।’ যদিও সরকারের প্রেস সচিবের কাছ থেকে আমরা এরূপ বক্তব্যের বাইরে সরকারের বিভিন্ন কাজের স্বচ্ছ ও স্পষ্ট ব্যাখা প্রত্যাশা করি, তবুও দিন শেষে অর্থনীতি কারও বয়ান মানে না। বাংলাদেশে অর্থনীতিতে সামগ্রিকভাবে এসব দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত কী প্রভাব রাখবে তা যথাসময়ে বিভিন্ন সূচক বলে দেবে। আমরা বরং কার কথা সত্যে ফলে, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে পারি।

তবে এই অর্থনৈতিক উদার নীতির বাইরেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদার নীতির দৃষ্টান্ত দেখা যায় দেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে। এই সরকারের আমলে বেশ ঘটা করে বিভিন্ন মত ও পথের মানুষের উৎসব সরকার উদ্‌যাপন করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বড় পরিসরে এই প্রথম শিল্পকলা একাডেমিতে দুর্গাপূজা, বুদ্ধপূর্ণিমা, ঈদ ও বড়দিন—৪টি প্রধান ধর্মের প্রধান উৎসবগুলোতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর উৎসবেও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছিল লক্ষণীয়। বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে সরকারি ছুটিও বৃদ্ধি করা হয়েছিল। কাছের অনেক বন্ধুকে বলতে শুনেছি, আর যা–ই হোক না কেন, এই সরকার সাংস্কৃতিকভাবে বেশ শক্তিশালী। প্রধান উপদেষ্টার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে যে ধরনের ফিল্মমেকিং আমরা দেখতে পেয়েছি, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে অদ্বিতীয়। দেশের নাগরিকদের অনেকেই হয়তো অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এই সাংস্কৃতিক রুচি সামনের সরকারগুলোর কাজে খুঁজে ফিরবেন।

এত দারুণ সব ভিডিও, শর্টফিল্ম, রিলসের মাধ্যমে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা সম্বন্ধে অজ্ঞ যে কেউ ভাববেন, বাংলাদেশ হয়তো এই সময়টায় সবচেয়ে সহনশীল ও স্থিতিশীল অবস্থায় ছিল; কিন্তু এটিই পুরোপুরি বাস্তবচিত্র? গত দেড় বছরে আমরা এ–ও দেখেছি, অসহিষ্ণু রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থার মধ্য দিয়েও পার করেছে বাংলাদেশ।

আদিবাসী শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে গিয়ে পুলিশের সামনেই সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির হাতে মার খেয়েছে। দেশের সর্ববৃহৎ ও প্রাচীন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান উদীচী ও ছায়ানটে আগুন দেওয়া হয়েছে। অগ্নিসংযোগ, ধ্বংসযজ্ঞ ও লুটপাট চালানো হয়েছে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার–এর মতো সংবাদপত্রের অফিসে। শতাধিক মাজার, আখড়া ও ওরসে হামলার ঘটনা ঘটেছে। ধর্ম অবমাননার দায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলিম শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে মৃতপ্রায় করে ফেলা হয়েছে, সনাতন ধর্মাবলম্বী তরুণকে মেরে লাশে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পুরো সময়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ছিল ‘মব’। বিভিন্ন সময়ে আমরা দেখেছি, বেশির ভাগ সময় নিরাপত্তা বাহিনী সময়মতো পৌঁছাতে পারেনি। আর এখানে তারা পৌঁছেছে, সেখানে তাদের সামনেই চলেছে ধ্বংসযজ্ঞ। আবার শিক্ষকদের আন্দোলনের মতো বেশ কিছু সংবেদনশীল বিষয়ে রাষ্ট্রীয় বাহিনী ছিল আগ্রাসী ভূমিকায়।

আগ্রহী পাঠক আলোচনার এ পর্যায়ে এসে দেখবেন, বিগত দেড় বছরে সরকারের দেখানো অবস্থান যতটাই ‘উদার’ ছিল, বাস্তবে দেশ ততটা অসহিষ্ণুতার পথেও হেঁটেছে। অনেক চিন্তক এই অবস্থার জন্য দেশের মানুষকে মোটাদাগে দায়ী করেছেন। মানুষের ক্ষোভ বলে বিষয়গুলোকে গুরুত্বহীন করেছেন বা ন্যায্যতা দিয়েছেন; কিন্তু মানুষের ক্ষোভও যে এভাবে দিনের পর দিন চলতে পারে না, সরকারকেই এর নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, সেটি সরকার নিজেই বুঝতে চায়নি। কঠিন সত্যটি হলো, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কথা ও কাজে মিলও ছিল না। যেই উদারতার বাণী তাঁরা প্রচার করেছেন, বাস্তবে তা প্রতিষ্ঠায় যথেষ্ট সদিচ্ছা দেখাননি।

সুতরাং রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এসব উদার নীতির বাণীকে আমরা এখন কেবল ‘পলিটিক্যাল কারেক্টনেস’ বা ‘রাজনৈতিক শুদ্ধতা’ বলে চিহ্নিত করতে পারি। বিশ্বজুড়েই এখন পলিটিক্যাল কারেক্টনেসের জয়জয়কার চলছে। রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান—ভাষার ব্যবহার ও প্রকাশের ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন হয়েছেন। তাঁরা ‘ডিজঅ্যাবল’ শব্দের অর্থ দিয়েছেন ‘ডিফারেন্টলি অ্যাবল’, ‘অন্ধ’ শব্দের পরিবর্তে বলছেন ‘দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী’।

স্লোভেনিয়ান দার্শনিক স্লাভয় জিজেক এ ধরনের পলিটিক্যাল কারেক্টনেসের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি মনে করেন, মাত্র ভাষার মধে৵ সীমাবদ্ধ শুদ্ধতায় মানুষের মধ্যে সম্পর্কের সত্যিকারের বিশুদ্ধতা নষ্ট হয়। পৃথিবীব্যাপী রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পলিটিক্যাল কারেক্টনেসের মাধ্যমে ক্ষমতাকাঠামোর মূল দায়িত্ব শুধু বলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়। এবং মূল কাজ থেকে তারা একধরনের দায়মুক্তি লাভ করে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরের শাসন বিশ্লেষণ করলেও আমরা এর চেয়ে খুব ভিন্ন কিছু পাই না। এই সরকারের উপদেষ্টা ও কর্তাব্যক্তিরা নিঃসন্দেহে বিগত অন্য যেকোনো সরকারের চেয়ে বেশি পলিটিক্যাল কারেক্ট ছিলেন।

সংস্কার কমিশনগুলোর মধে৵ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কমিশন সংবিধান সংস্কার কমিশন বাংলাদেশের সাংবিধানিক নাম ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ পরিবর্তন করে ‘জনগণতন্ত্রী বাংলাদেশ’ করার সুপারিশ করেছে। আর প্রজাতন্ত্রের পরিবর্তে ‘নাগরিকতন্ত্র’ করার প্রস্তাবও করেছে কমিশন। এ ছাড়া সংবিধানের মূলনীতিতে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র পরিবর্তে ‘বহুত্ববাদ’ যুক্ত করার সুপারিশ করেছে তারা। এর অর্থ দাঁড়ায়, তারা অন্য যেকোনো সরকারের চেয়ে বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের কথা বলেছে। বিপরীতে বাস্তব চিত্রে দেখা গেছে, রাষ্ট্র ঠিক তার উল্টো পথেই হেঁটেছে। তাই দিন শেষে জিজেক এখানে প্রাসঙ্গিক হয়ে ফিরেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যা কিছু বলেছে তার কতটুকু কার্যত তারা ধারণ করেছে? আর ধারণ না করা হলে পুরোটা শাসনামলে ‘বৈষম্যবিরোধী’ বা ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’–এর মতো শব্দগুলোকে বারবার ব্যবহার করে বাস্তব চিত্রে শব্দগুলোকে কি জুলাই–পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে খাটো করা হয়নি?

অনেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ‘এনজিও–নির্ভর’ সরকার বলেও সমালোচনা করেছেন। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন উপদেষ্টা এ খাতের সঙ্গে যুক্ত থাকায় এসব আলোচনা তৈরি হয়েছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব ছিল শুধু কথায় সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবে সব মত, পথ ও বিশ্বাসের মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করা; কিন্তু দিন শেষে তারা এনজিও–নির্ভরতার সমালোচনা থেকে খুব ভিন্ন কোনো চিত্র তৈরি করতে পারলেন না। সামরিক বাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালনের ক্ষমতা দেওয়ার পরও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মোটাদাগে বেশির ভাগ সংকট মোকাবিলায় পরাস্ত হয়েছে।

আপাতত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দেশবাসীকে আক্ষরিক অর্থেই একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেওয়া। তাহলে অন্তত কিছু হলেও অপূর্ণতার ঘাটতি ঘুচবে। অন্যদিকে আগত সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ থাকবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তৈরি করা। সম্প্রতি বেসরকারি সংস্থা ‘ন্যারেটিভ’–এর জরিপের ফলাফল ঘোষণা অনুষ্ঠানে অধ্যাপক মুশতাক খান তাঁর ব্যক্তিগত বিশ্লেষণে বলেছেন, দেশের মানুষ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সংস্কারের প্রশ্ন বিবেচনা করে দুটি ভিন্ন দলকে পছন্দ করছে; কিন্তু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সংস্কারের বাইনারি হিসাব দুটিকে কেন একে অপরের বিপরীতে দাঁড়াতে হলো? এই দুটিই কি বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয়? আগামী নির্বাচনে যে দলই ক্ষমতায় আসীন হোক না কেন, সংস্কার, স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিলেই কেবল বর্তমান সংকট উত্তরণ সম্ভব। এই মুহূর্তে এর বাইরে আর কিছু ভাবার জায়গা নেই।

  • মোস্তফা মুশফিক শিক্ষার্থী, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়