নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহুল আলোচিত ঘটনা। দীর্ঘ জরুরি অবস্থা, সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসন এবং রাজনীতির মাঠ কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত ওই ভোটকে তখন ‘গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত হিসাবে সেবার ভোটার উপস্থিতি ছিল অস্বাভাবিক, ৮৭ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে ৭৪টি আসনেই ৯০ শতাংশের অধিক ভোট পড়ে, যা অনেকেই অবিশ্বাস্য বলে মনে করেন। যদিও এক-এগারো সরকারের পক্ষ থেকে এটিকে বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। ‘অভূতপূর্ব’ এ অংশগ্রহণই পরে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। বিশেষ করে ঢাকা ও সিলেট অঞ্চলে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের কোনো আসন না পাওয়া রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছেও বিস্ময় তৈরি করে। এসব প্রশ্নকে ঘিরে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এমন ধারণাও শক্ত হয় যে নির্বাচনটি আপাতদৃষ্টিতে সহিংসতামুক্ত ও প্রশাসনিকভাবে সুশৃঙ্খল হলেও ফলাফলকে কৌশলে প্রভাবিত করতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একটি অংশ এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর ভূমিকা ছিল।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ২৬৩টি আসনে জয়ী হয়। আর বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় ঐক্যজোট পায় ৩৩টি আসন। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্যমতে, ওই নির্বাচনে ভোট পড়ে ৮৭ দশমিক ১৬ শতাংশ। আর ৭৪টি আসনে ভোট পড়েছিল ৯০ শতাংশের ওপর।
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তথ্যানুযায়ী, খুলনা বিভাগে সর্বোচ্চ ৯০ দশমিক ৪৩ শতাংশ ভোট কাস্ট হয়। ৯০ দশমিক ৪২ শতাংশ নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে ছিল রাজশাহী বিভাগ। সারা দেশে ১২৬টি আসনে ৮৫-৯০ শতাংশ ভোট পড়েছিল বলে দাবি করে নির্বাচন কমিশন। এছাড়া ৬৭ ও ২৮টি আসনে যথাক্রমে ৮০-৮৫ ও ৭৫-৮০ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন।
দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে ২০০৮ সালের মতো এত বেশি ভোটার উপস্থিতির নজির আর কখনই দেখা যায়নি। স্বাধীনতার পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোর দিকে তাকালেই এ ব্যতিক্রম স্পষ্ট হয়। ১৯৭৩ সালের প্রথম সংসদ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৫৫ শতাংশ, ১৯৭৯ ও ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে তা নেমে আসে প্রায় ৫১ শতাংশে। এমনকি ১৯৯১ ও ২০০১ সালের নির্বাচনেও ভোটার উপস্থিতি ছিল ৫৫-৭৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। হঠাৎ করে ২০০৮ সালে ৮৭ শতাংশের বেশি ভোট পড়া অনেকের কাছেই অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। বিশেষ করে যখন ওই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল দীর্ঘ জরুরি অবস্থা, সীমিত রাজনৈতিক কার্যক্রম, কঠোর নিরাপত্তা নজরদারি এবং স্বল্প প্রচারণার সময়ের মধ্যে। রাজনৈতিক মাঠ যখন প্রায় খালি ছিল তখন এমন ব্যাপক ভোটার উপস্থিতি কীভাবে সম্ভব হলো—এ প্রশ্নই ২০০৮ সালের নির্বাচনকে ঘিরে সন্দেহ ও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।

২০০৮ সালের নির্বাচনকে ঘিরে আরেকটি বড় বিতর্কের জায়গা ছিল সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ। নির্বাচনের ঠিক আগে এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ব্যাপকভাবে আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হয়, যা দেশের নির্বাচনী ভূগোল আমূল বদলে দেয়। তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এটিএম শামসুল হুদার নেতৃত্বে আসন্ন নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে একটি খসড়া প্রকাশ করে ২০০৮ সালের ২৯ এপ্রিল। নির্বাচন কমিশন এটিকে সংবিধান ও জনসংখ্যাভিত্তিক সমতা আনার বাধ্যতামূলক সংস্কার হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এর প্রভাব নিরপেক্ষ ছিল না বলে মনে করেন অনেক পর্যবেক্ষক। বহু আসনে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত ভোটব্যাংক ভেঙে যায়, স্থানীয় ক্ষমতার সমীকরণ বদলে যায়। ভেঙে যায় ‘সেফ সিট’ সংক্রান্ত বহুল প্রচলিত রাজনৈতিক বাস্তবতাও। নেতাদের গড়ে তোলা নির্বাচনী কাঠামো কার্যত ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বিএনপির ওপর; দলটির অনেক জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ নেতা, যারা একাধিকবার নির্বাচিত হয়েছিলেন, তারা পরাজিত হন।
এশিয়াভিত্তিক আন্তর্জাতিক, স্বাধীন ও বেসরকারি নির্বাচন পর্যবেক্ষণ জোট এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনস ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে তাদের এক প্রতিবেদনে বলেছিল, সীমানা পুনর্নির্ধারণ আইনসম্মত হলেও রাজনৈতিক ফলাফল নিরপেক্ষ ছিল না। বহু আসনে দীর্ঘদিনের পরিচিত ভোটার কাঠামো ভেঙে পড়ে, স্থানীয় ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যায় এবং ঐতিহ্যগত ‘সেফ সিট’ ধারণা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফলে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ধরন হঠাৎ বদলে যায়।
রিপোর্টে আরো উল্লেখ করা হয়, এ পুনর্নির্ধারণ হয়েছে জরুরি অবস্থার সময়—যখন রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক তৎপরতা সীমিত ছিল। ফলে আইনি আপত্তির সুযোগ থাকলেও বাস্তবে শক্ত রাজনৈতিক বিতর্ক বা প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি।
সীমানা পুনর্নির্ধারণের ঘটনায় নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হেরে যান অনেক আলোচিত নেতা। তেমনই একজন বিএনপির নরসিংদী-২ (পলাশ) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল মঈন খান। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে টানা তিনবার তিনি এ আসন থেকে জয়ী হন। কিন্তু ২০০৮ সালের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো হেরে যান। এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আব্দুল মঈন খান সম্প্রতি বলেন, ‘২০০৮ সালের নির্বাচন মোটেও নিরপেক্ষ ছিল না। এটি ছিল পরিকল্পিতভাবে একটি সাজানো নির্বাচন। কে কোথায় নির্বাচিত হবেন, তার পূর্বনকশা নির্বাচনের আগেই নির্ধারণ করা হয়ে গিয়েছিল।’
২০০৮ সালের নির্বাচনের আরেকটি নতুনত্ব ছিল ভোটার তালিকার ব্যাপক সংস্কার ও বিহারিদের অন্তর্ভুক্তি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ছবিসহ বায়োমেট্রিক ভোটার তালিকাও প্রণয়ন করা হয়। এর আওতায় প্রায় ৮ কোটির বেশি ভোটারকে নতুনভাবে নিবন্ধন করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ৩ কোটি ভোটার ছিল নতুন বা প্রথমবারের ভোটার। যা মোট ভোটারের প্রায় ৩৭ শতাংশ। তবে এ অন্তর্ভুক্তি ঘটে এমন এক প্রেক্ষাপটে, যখন জরুরি অবস্থার কারণে রাজনৈতিক কার্যক্রম সীমিত, সভা-সমাবেশ নিয়ন্ত্রিত ছিল। ভোটার তালিকার সম্প্রসারণ ও জরুরি অবস্থার সীমাবদ্ধ রাজনৈতিক পরিসরে এর বাস্তবায়ন নির্বাচনের রাজনৈতিক প্রভাবকে পুরোপুরি নিরপেক্ষ রেখেছি কিনা সে প্রশ্ন উঠে আসে এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনসের প্রতিবেদনে।
এছাড়া পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে জেনারেল মইনের আঁতাতের অভিযোগও উঠে আসে। এক-এগারোর শুরুর দিনগুলোয় ডিজিএফআইয়ের ভারপ্রাপ্ত ডিজির দায়িত্বে ছিলেন সেনাবাহিনীর প্রাক্তন কর্মকর্তা চৌধুরী ফজলুল বারী। গত বছর এক সাক্ষাৎকারে তিনি বণিক বার্তাকে বলেছিলেন, ‘জেনারেল মইনকে নিযুক্তির পর হাসিনা সরকার অনেক বিষোদ্গার করেছেন তার নিয়োগ নিয়ে। তিনিই আবার মইন ইউর সঙ্গে আঁতাত করেন।’ তিনি জানিয়েছিলেন, ব্রিগেডিয়ার আমিন [মেজর জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন] গওহর রিজভীকে নিয়ে শেখ হাসিনার সেলে যেতেন। তার ভাষায়, ‘বিষয়টি অত্যন্ত পরিষ্কার যে তৎকালীন সেনাপ্রধান শেখ হাসিনার সঙ্গে গোপনে আঁতাত করার দুরভিসন্ধি করেছিলেন।’
২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে তদন্ত কমিশন করে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার। ২০০৮ সালের নির্বাচন প্রসঙ্গে কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তৎকালীন নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগকে সুবিধা দেয়ার জন্য আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী দলের ভোটার অধ্যুষিত এলাকাকে বিভক্ত করে জাতীয় সংসদের সংসদীয় এলাকার পুনর্বিন্যাস করে। উদাহরণ হিসেবে প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম-৭ ও চট্টগ্রাম-৮ আসনের কথা উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, চট্টগ্রাম-৭ আসনে একজন বিশেষ ব্যক্তিকে সুবিধা দেয়া এবং একজন বিশেষ ব্যক্তিকে পরাজিত করার জন্য রাঙ্গুনিয়া উপজেলার সঙ্গে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বৃহৎ কর্ণফুলী নদী দ্বারা বিভাজিত অন্য উপজেলা বোয়ালখালীর শ্রীপুর খরণদ্বীপ ইউনিয়নকে যুক্ত করা হয়। ২০০৮ সালে তৎকালীন কমিশন একটি দলকে বাড়তি সুবিধা প্রদানের জন্য ঢাকা জেলার সংসদীয় আসন ১৩টি থেকে বাড়িয়ে ২০টিতে নির্ধারণ করে এবং ১২টি জেলার সংসদীয় আসন কর্তন করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বিশেষ সুবিধা দিতে সারা দেশের ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৩০টি আসনে ব্যাপক রদবদল আনে তৎকালীন এটিএম শামসুল হুদা কমিশন। ফলে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ২৬২টি আসনে জয়লাভ করে এবং আওয়ামী লীগ স্বয়ং ২৬০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ২৩০টি আসনে জয়লাভ করে। সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ২০০৮ সালে কারসাজি ও বেআইনি কার্যক্রম ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪-এর তৎকালীন নির্বাচন কমিশন অব্যাহত ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বাংলাদেশে নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংসের প্রক্রিয়া ২০০৭-০৮ সালের সামরিক-সমর্থিত সরকারের সময় থেকেই শুরু হয়েছিল বলে সম্প্রতি মন্তব্য করেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টে তিনি বলেন, ‘ওই সময় জেনারেল মইন ইউ আহমেদের নেতৃত্বে এবং ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন প্রভাবশালী কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার আমিন ও ব্রিগেডিয়ার বারির সহযোগিতায় ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি করা হয়। এর মাধ্যমে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগকে ভূমিধস বিজয় পাইয়ে দেয়া হয়।’
প্রসঙ্গত, ২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারে থাকা একাধিক ব্যক্তি বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এবং উচ্চপদেও দায়িত্ব পালন করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের ২৬৩টি আসনে জয় এবং বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় ঐক্যজোটের মাত্র ৩৩টি আসনে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়া ছিল দেশের রাজনৈতিক ভারসাম্যকে আমূল বদলে দেয়ার একটি মুহূর্ত। রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ক্ষমতার ওপর যে প্রাতিষ্ঠানিক ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ থাকা জরুরি, তা দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে। প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্বাহী নিয়ন্ত্রণ বাড়তে থাকে, আর দমন-পীড়নে সংসদের বাইরে বিরোধী রাজনৈতিক পরিসর ক্রমশ সংকুচিত হয়। যা ফ্যাসিবাদী শাসনের সূচনাবিন্দু হিসেবে ধরা দেয়।
এ প্রসঙ্গে সাবেক নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২০০৮ সালের নির্বাচন নিয়ে এখন পর্যন্ত তেমন বিশ্লেষণ হয়নি। তবে সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে ভোটে হারিয়ে দেয়ার অভিযোগ বিএনপি ওই সময়ই এনেছিল।’