Image description
ঠকছেন যাত্রীরা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উত্তরা যেতে মেট্রোরেলের একক যাত্রার টিকিট সংগ্রহ করেন সারোয়ার আলম। কিন্তু ফার্মগেট পার হতেই তার উত্তরা যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়। আগারগাঁও স্টেশনে এসে মেট্রোর যাত্রা শেষ করেন। সারোয়ারের মনে প্রশ্ন, ৯০ টাকায় সংগ্রহ করা টিকিটের যাত্রাপথের অর্ধেকেরও বেশি বাকি থাকায় এখন সেই পথটুকুর জন্য দেওয়া টাকা ফেরত পাওয়া সম্ভব কি না? স্টেশন প্ল্যাটফর্ম থেকে নিচতলায় নেমে টিকিট বুথের দায়িত্বরত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বললেন। নিরাশার বাণী শুনিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘এমন পরিস্থিতিতে টাকা ফেরত দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা মেট্রোরেলের সিস্টেমে নেই। হয় আপনি পুরো যাত্রা সম্পন্ন করতে পারেন, তা না হলে টিকিট জমা দিয়ে চলে যেতে পারেন।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত মেট্রোরেলের ভাড়া ৩০ টাকা। অথচ ৯০ টাকার টিকিটের বাকি ৬০ টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি সারোয়ারকে। এটি গত মঙ্গলবারের ঘটনা। যা শুধু সারোয়ারের ক্ষেত্রে নয়, এমনটি প্রতিদিনই কিছু না কিছু যাত্রীর সঙ্গে ঘটছে। কয়েকদিন আগেই একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হন জামাল হোসেন। এক স্টেশন যাওয়ার পরই জরুরি কাজের কারণে ট্রেন থেকে নেমে যেতে হয়েছে। কিন্তু টিকিটের বাকি টাকা ফেরত পাননি। জামালও স্টেশনের দায়িত্বরত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছেন, তাতে কাজ হয়নি। তাকেও জানানো হয়েছে, টিকিটের নির্ধারিত পুরো পথ না গেলেও বাদবাকি টাকা ফেরত দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

সাধারণত দূরপাল্লার বাস বা আন্তঃজেলা ট্রেনে পুরো যাত্রা সম্পন্ন না করলেও নির্ধারিত দূরত্ব বিবেচনা করে ভাড়ার বাকি টাকা ফেরত দেওয়া হয় না। তবে ঢাকা ও শহরতলির ‘লোকাল’ বাসের মতো গণপরিবহন বা অন্যান্য যানবাহনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত গন্তব্যের আগে আগে যাত্রা শেষ করতে চাইলে ভাড়ার বাকি টাকা ফেরত পাওয়া যায়। এমন বাস্তবতায় মেট্রোরেল ঢাকার গণপরিবহন হলেও ভাড়ার ক্ষেত্রে চিরায়িত গণপরিবহনের আচরণের সঙ্গে মিল পাওয়া যাচ্ছে না। মেট্রোরেলের যাত্রীরা বেশি দূরত্বের টিকিট নিয়ে কম দূরত্ব যাত্রা করলে বা ভুলে বেশি দূরত্বের টিকিট নিলে সেই টাকা আর ফেরত পাচ্ছেন না। তাদের এমন ভুলের টাকা মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ গিলে খাচ্ছে বলে অভিযোগ যাত্রীদের।

এ প্রসঙ্গে কথা হলে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায়) প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী শেখ মইনউদ্দিন কালবেলাকে বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে একক যাত্রার টিকিট ব্যবহার না করায় এই অভিজ্ঞতা আমার নেই। তবে নির্ধারিত গন্তব্যের অতিরিক্ত যাত্রার জন্য যদি বাড়াতি ভাড়া আদায় করা হয় তাহলে কেন কম যাত্রার জন্য টাকা ফেরত দেওয়া হবে না! টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা থাকা উচিত। বিষয়টি নিয়ে মেট্রোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলব।’

শুরুতে আগারগাঁও পর্যন্ত চললেও পরবর্তীতে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল নিয়মিত চলাচল করছে। ২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই পথে বর্তমানে দৈনিক গড়ে চার লাখ যাত্রী মেট্রোরেল ব্যবহার করছে। এতে করে মেট্রো পরিচালনাকারী সরকারি প্রতিষ্ঠান ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) আয়ও বেড়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মেট্রোরেলের আয় ছিল ২৭৩ কোটি ২ লাখ টাকা। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে হয় ৪৪৬ কোটি ৬১ লাখ টাকা। যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা ভাড়া থেকেই এসেছে প্রথম বছরে ২৪৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা এবং পরের বছরে ৪০৪ কোটি ১১ লাখ টাকা। বাকি আয় এসেছে অন্যান্য খাত থেকে।

দৈনিক একক যাত্রার টিকিটে মেট্রোতে ভ্রমণ করা যাত্রীর সংখ্যা বেশি। তবে মোট যাত্রীর মধ্যে কত যাত্রী একক যাত্রার টিকিটে ভ্রমণ করেন, সে পরিসংখ্যান নেই ডিএমটিসিএলের অর্থ ও হিসাব বিভাগের। আর একক যাত্রার টিকিট নিয়ে ভ্রমণকারী যাত্রীদের মধ্যে কী সংখ্যক যাত্রী অতিরিক্ত ভাড়ার টাকা ফেরত চান, তার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য ডিএমটিসিএলের কাছে নেই। এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির অর্থ ও হিসাব বিভাগের কোনো কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তবে ডিএমটিসিএলের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, ‘সরকার চাইলে এই ব্যবস্থা যুক্ত করা কোনো কঠিন কাজ না। প্রতিটি স্টেশনে জরিমানা বাবদ অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করার জন্য একটি কক্ষ রয়েছে। আবার কোনো যাত্রী এমআরটি পাস ব্যবহার করে ট্রেনে চড়েছেন কিন্তু স্টেশন থেকে বের হওয়ার কার্ডে যদি পর্যাপ্ত ভাড়ার টাকা না থাকে তাহলে ওই বুথ থেকে রিচার্জ করার ব্যবস্থা থাকে। ওই বুথেই এ সেবাটি যুক্ত করা যায়। টিকিট হিসেবে যে কার্ড দেওয়া হয় সেটি স্মার্ট ডিভাইস। কোন স্টেশন থেকে যাত্রী ট্রেনে উঠেছে, কোন স্টেশনে যাওয়ার জন্য কত টাকা রিচার্জ করেছে—সে তথ্যগুলো কার্ডে সংরক্ষণ থাকে। কারণ, নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত দূরুত্বের স্টেশনে যাত্রী ভ্রমণ করলে তিনি কার্ড পাঞ্চ করে বের হতে পারবেন না। কার্ড আটকে যাবে, তখনই জরিমানা আদায় করা হয়। ফলে ওই কার্ড যাচাই করে টাকা ফেরতও দেওয়া যায়। এখন এটি বাস্তবায়নের জন্য সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত জরুরি। এই সেবা দেওয়ার সুবিধা যুক্ত করা কঠিন কিছু না। মেট্রোরেল টাকা ফেরত দেবে কি না—সরকারকে আগে সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

এক প্রশ্নের জবাবে গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন কালবেলাকে বলেন, ‘সরকার সহজে টাকাটা নিতে পারে কিন্তু দিতে পারে না। অনেক সময় টাকা ফেরত দেওয়াটা চ্যালেঞ্জিং (কঠিন) হয়ে যায়। এই সমস্যার একটাই সমাধান গণহারে এমআরটি পাস বিলিয়ে দিতে হবে। সেটি বিনামূল্যে দিলেও কোনো ক্ষতি নেই। ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি একটা প্রকল্প, সেখানে আপনি ২০ কোটি টাকা কার্ডের পেছনে ভর্তুকি দিলে কী আর এমন ক্ষতি হবে! এতে তো আপনার যাত্রী আরও বাড়বে। মেট্রোর আয়ের পথ তো যাত্রী ভাড়া, সেই ভাড়াও বেশি করে পাওয়া যাবে। মেট্রোর বিজ্ঞাপন বাড়বে। আর এমন ভোগান্তি থেকেও যাত্রীদের নিস্তার মিলবে।’