বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এক নজিরবিহীন বাঁকে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রথাগত প্রচারের জায়গা দখল করে নিয়েছে ডিজিটাল প্রযুক্তি। এবারের নির্বাচনে দেয়ালজুড়ে কাগজের পোস্টার নিষিদ্ধ হওয়ায় ভোটারদের মন জয়ের লড়াই এখন শুধু জনসভা বা বিলবোর্ডে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা সরাসরি চলে এসেছে সাধারণ মানুষের স্মার্টফোনের স্ক্রিনে। তবে এ আধুনিক প্রচারের সমান্তরালে এক নতুন ও ভয়াবহ সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইর অপব্যবহার। বিশেষ করে ‘ডিপফেক’ ভিডিও, এআই-জেনারেটেড প্রোপাগান্ডা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট এখন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। খোদ নির্বাচন কমিশনও এই উদীয়মান প্রযুক্তিগত ঝুঁকিকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারের নির্বাচনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইর ব্যবহার প্রচার কার্যক্রমে যেমন গতি এনেছে, তেমনি তৈরি করেছে চরম ঝুঁকি। কারণ ব্যাখ্যা করে তারা বলছেন, প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের কণ্ঠস্বর ও অবয়ব হুবহু নকল করে তৈরি করা হচ্ছে ‘ডিপফেক’ ভিডিও। এসব ভিডিওতে নেতাদের এমন সব বিতর্কিত বক্তব্য দিতে দেখা যাচ্ছে, যা তারা কখনোই বলেননি। এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সংবাদ উপস্থাপকের আদলে ভিডিও বানিয়ে মিথ্যা তথ্য প্রচার করা হচ্ছে, যা সাধারণ ভোটারদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হতে পারে। সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম ব্যবহার করে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর কাছে উসকানিমূলক বা একপাক্ষিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে, যা ভোটারদের নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলতে পারে। সেজন্য নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও নির্বাচনকেন্দ্রিক এসব প্রোপাগান্ডা মোকাবিলায় তৎপর থাকতে হবে।
নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, সাইবার স্পেসে আক্রমণের তীব্রতা তত বাড়ছে। পোস্টার বা ড্রোন ব্যবহারের ওপর ইসির নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ন্ত্রণের এ লড়াই শেষ পর্যন্ত কতটুকু সফল হবে, তা নিয়ে সংশয় কাটছে না। ফেসবুক, টিকটক ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো এখন তথ্যের প্রধান উৎস। কিন্তু তথ্যের সত্যতা যাচাইর অভাব এ মাধ্যমগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। একটি বানোয়াট তথ্য মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে দুর্গম ও গ্রামীণ এলাকায় যেখানে ডিজিটাল লিটারেসি কম, সেখানে এ ধরনের অপপ্রচার বেশি প্রভাব ফেলতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে প্রযুক্তির এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশন (ইসি) নজিরবিহীন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। ভুয়া তথ্য ও বিভ্রান্তি মোকাবিলায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সহায়তা চেয়েছে সরকার। এ ছাড়া ভুয়া তথ্য, বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ও গুজব প্রতিরোধে আগামী জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত একটি বিশেষ সেল গঠন করেছে জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি—এনসিএসএ।
বিশ্বজুড়েই সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে ডিপফেকের মতো ঘটনা বহু ঘটেছে। জার্মান সংস্থা কনরাড অ্যাডেনয়ার ফাউন্ডেশনের (কেএএস) এক প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ‘আমি আর ডামি নির্বাচন’খ্যাত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমন একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেই নির্বাচনে ভোটগ্রহণের দিন গাইবান্ধা-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আবদুল্লাহ নাহিদ নিগারের একটি ভুয়া বা ‘ডিপফেক’ ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে তাকে বলতে দেখা যায়, তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন, যা অনেক ভোটারকে বিভ্রান্ত করে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও এ ধরনের ঘটনার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ প্রেক্ষাপটে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন সম্প্রতি বলেন, ‘এখন তো এআইর যুগ। এআই নিয়ে আমি শঙ্কা একদম প্রথম থেকেই প্রকাশ করে আসছিলাম যে—এটা আমাদের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ হবে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা হবে আমাদের জন্য বড় ধরনের একটা চ্যালেঞ্জ।’
বিশ্লেষকদের মতে, বছর কয়েক আগেও এআই ছিল দূর ভবিষ্যতের একটি কাল্পনিক বিষয়। ২০২৪ সালের শুরুতেও এআই এত উন্নত ও সহজলভ্য ছিল না, যা এখন অবারিত সুযোগের পাশাপাশি উদ্বেগের কারণ হয়েও দাঁড়িয়েছে। এখন এআই দিয়ে এমনভাবে ভুয়া ভিডিও, অডিও ও ছবি তৈরি করা যাচ্ছে, যা একেবারে আসলের মতো মনে হয়। একে বলা হয় ডিপফেক। আরেকটি ধরন হলো ‘চিপফেক’, যা এআই নয়, সস্তা সফটওয়্যার ব্যবহার করে তৈরি করা হয়। এর মাধ্যমে সাধারণত কোনো ঘটনার ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। যেমন সংবাদমাধ্যমের ফেসবুক পেজে দেওয়া ফটোকার্ড নকল করে ভুয়া বক্তব্য প্রচার।
ফ্যাক্টচেকার, বিশ্লেষক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে অপতথ্য ছড়াতে ডিপফেক ও চিপফেকের মতো ১০টি কৌশল বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে সত্য ছবি বা ভিডিওর সঙ্গে বিভ্রান্তিকর বা ভিন্ন অর্থবাহী ক্যাপশন জুড়ে দেওয়া; সত্য বক্তব্যের অংশবিশেষ কেটে বা প্রসঙ্গ বদলে ভিন্ন অর্থ তৈরি করা; সম্পূর্ণ মনগড়া বক্তব্য বা উদ্ধৃতি নির্দিষ্ট ব্যক্তির নামে চালিয়ে দেওয়া; পুরোনো ছবি, ভিডিও বা খবরকে সাম্প্রতিক ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা ইত্যাদি। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, রাজনৈতিক অপতথ্য ছড়ানোর মাত্রা তত বাড়ছে। এ পর্যন্ত একাধিক রাজনৈতিক দলের শীর্ষ ও আলোচিত অন্তত ১৩ নেতা-নেত্রী এমন ঘটনার ভুক্তভোগী হয়েছেন বলে তথ্য মিলেছে।
দেশে গত বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মিথ্যা তথ্যের প্রবণতা বিশ্লেষণ করে ২৯ অক্টোবর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাব। আটটি স্থানীয় তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশ করা ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরে ভুয়া তথ্য ছড়ানোর প্রধান মাধ্যম ছিল ভিডিও; মোট তথ্য যাচাইয়ের ৬৬ শতাংশই ছিল ভিডিওভিত্তিক। আগের তিন মাসের (এপ্রিল-জুন ২০২৫) তুলনায় গ্রাফিক্স, ছবি ও লিখিত পোস্টের ব্যবহার কমেছে, অর্থাৎ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার তৈরি ভুয়া ভিডিওর মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানোর হারও বাড়ছে।
আবার গণমাধ্যমের ফটোকার্ড, টিভি স্ক্রল বা নিউজ পোর্টালের ডিজাইনের আদলে ভুয়া গ্রাফিক্স বানানো; মনগড়া সংখ্যা বা পরিসংখ্যান ব্যবহার; স্ক্রিনশট বা নথি জাল করা এবং একই মিথ্যা তথ্য একযোগে বহু পেজ ও অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়িয়ে দেওয়ার মতো সমন্বিত অপপ্রচারের ঘটনাও ঘটছে। ফেসবুকের ভুয়া ফটোকার্ডের সূত্র ধরে আলোচনার বাজার জমানো হচ্ছে, যা আমলে নিয়ে মূল ধারার কিছু সংবাদমাধ্যমও কখনো কখনো খবর প্রকাশ করছে।
দেশে নির্বাচনের আগের মাসগুলোতে বিভিন্ন ধরনের ভুল তথ্য ও ভিডিওভিত্তিক অপতথ্যের ব্যাপক বিস্তারের বিষয়টি উঠে এসেছে তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানারের বিশ্লেষণেও। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, গত বছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর—এই তিন মাসে ১ হাজার ৪৪১টি ভুল তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯৫৬টি অপতথ্যই ছিল রাজনৈতিক। আবার সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে ভিডিওভিত্তিক ভুল তথ্য, যার সংখ্যা ৬৫১টি। এরপর রয়েছে তথ্যভিত্তিক ভুল তথ্য ৫৫০টি ও ছবিভিত্তিক ভুল তথ্য ২৪৫টি।
রিউমর স্ক্যানার বলছে, প্রকৃতির দিক থেকে এগুলোর মধ্যে সরাসরি মিথ্যা ছিল ১ হাজার ৫১টি, বিকৃত তথ্য ২৫৩টি, বিভ্রান্তিকর তথ্য ১৩২টি, আংশিক মিথ্যা ৩টি ও আংশিক সত্য ২টি। এতে বোঝা যায়, যাচাইহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সরাসরি মিথ্যাই এ সময়ে অপতথ্য ছড়ানোর প্রধান হাতিয়ার ছিল।
রিউমর স্ক্যানারের পরিসংখ্যান আরও বলছে, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, গুজব ও ডিপফেক ভিডিওতে সয়লাব হচ্ছে অনলাইন। শুধু গত ডিসেম্বরেই ৪৪৬টি রাজনৈতিক ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে প্রতিষ্ঠানটি। ডিসমিসল্যাবের গত ৬ জানুয়ারির এক প্রতিবেদন বলছে, ১৬ নভেম্বর থেকে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশের ৯টি ফ্যাক্টচেকিং সংস্থা নির্বাচন সংক্রান্ত ৬৩টি মিথ্যা দাবি শনাক্ত ও খণ্ডন করেছে। এর আগে ১৬ অক্টোবর থেকে ১৫ নভেম্বরে এ সংখ্যা ছিল ৫০টি, অর্থাৎ মিথ্যা দাবি প্রায় ২৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে মিথ্যা বিবৃতি ও উক্তি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রগুলো বলছে, নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলগুলোর মধ্যে পক্ষে-বিপক্ষে নানা অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে। নির্বাচনে না থাকলেও অনলাইনে অপতথ্য ছড়ানোতে বড় ঝুঁকি তৈরি করছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। দলটির নেতাকর্মীরা টেলিগ্রামসহ অনলাইনে যোগাযোগের নানা মাধ্যমে গ্রুপ তৈরি করে বিভিন্ন অপতথ্য ছড়াচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট শাখাগুলো এমন শতাধিক পেজ ও গ্রুপ শনাক্ত করেছে।
আগামী নির্বাচনে এআইর চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে জানতে চাইলে তথ্যপ্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা কালবেলাকে বলেন, শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্বাচনেই এআই চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয়। তবে বাংলাদেশে এ চ্যালেঞ্জ অনেক প্রকট। নির্বাচন কেন্দ্র করে বটবাহিনীর যে অপপ্রচার, সেটা নিয়ন্ত্রণে নির্বাচন কমিশন অথবা সরকারের পাল্টা কোনো বটবাহিনী নেই। সত্যি বলতে আমাদের প্রস্তুতি একেবারেই শূন্য। এর পরও প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশে বিটিআরসি মেটার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। ভুয়া ভিডিওসহ বিতর্কিত কন্টেন্ট সরিয়ে অথবা রিচ কমিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে তারা আশ্বস্ত করেছেন। প্রস্তুতি বলতে এটাই।