ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। গত বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয়েছে নির্বাচনী প্রচার। সারা দেশে বইছে নির্বাচনী হওয়া। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ভোটারদের মন জয় করতে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা, বয়স ও ধর্মের ভোটারের জন্য রয়েছে পৃথক প্রতিশ্রুতি। তবে এর মধ্যে তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে সব প্রার্থী বিশেষ মনোযোগ দিচ্ছেন। কারণ নির্বাচনের ফলাফলে বড় ভূমিকা রাখবে তরুণ ভোটারদের ভোট। মোট ভোটারের এক-তৃতীয়াংশই তরুণ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিগত নির্বাচনগুলোতে তরুণ ভোটাররা সেভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি। এ ছাড়া ২০২৪ সালের গণ-আন্দোলনে মূল ভূমিকা ছিল তরুণদের। ফলে তাঁরা ভোট দিতে বেশ আগ্রহী। আর অন্য যেকোনো নির্বাচনের চেয়ে এবার তরুণ ভোটারের সংখ্যা বেশি।
মোট ভোটারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই তরুণরা। তাঁরা যদি সক্রিয়ভাবে ভোটকেন্দ্রে যান, তাহলে নির্বাচনের ফলাফল যেকোনো দিকে মোড় নিতে পারে। ফলে আসন্ন নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের চাবিকাঠি তরুণদের হাতেই থাকবে।
নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মোট ভোটারের সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ছয় কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭, নারী ভোটার ছয় কোটি ২৮ লাখ সাত হাজার ৯৪২ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার এক হাজার ২৩৪ জন।
ভোটারদের বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সী ভোটার প্রায় চার কোটি ৩২ লাখ। এর মধ্যে ১৮ থেকে ২১ বছর বয়সী ভোটার ৮৫ লাখের বেশি, ২২ থেকে ২৫ বছর বয়সী প্রায় এক কোটি ২০ লাখ, ২৬ থেকে ২৯ বছর বয়সী প্রায় এক কোটি ২১ লাখ এবং ৩০ থেকে ৩৩ বছর বয়সী ভোটার প্রায় এক কোটি ছয় লাখ।
জাতীয় যুবনীতি অনুযায়ী ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সসীমাকেই ‘যুব’ বা ‘তরুণ’ হিসেবে গণ্য করা হয়। এতে দেখা যায়, দেশের মোট ভোটারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই তরুণ জনগোষ্ঠী।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আসন্ন নির্বাচনে তরুণ ভোটার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাক্টিভ। গত তিনটি নির্বাচনে তাঁরা ভোট দিতে পারেননি। ফলে তাঁদের মন বোঝা খুবই কঠিন হবে। তাঁদের নেচার আমরা এখনো জানি না। তবে আসন্ন নির্বাচনে তাঁরা যে জয়-
পরাজয় নির্ধারণ করবেন—এটা পরিষ্কার। এ জন্য তাঁদের ভোট টানতে রাজনৈতিক দলগুলোকে অনেক বেশি কাজ করতে হবে। তরুণদের চাহিদা পূরণ করবে—নির্বাচনী ইশতেহারে এমন এজেন্ডা রাখতে হবে।’
সূত্র জানায়, ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশে মোট ভোটার ছিল আট কোটি ১০ লাখ ৮৭ হাজার তিনজন। নির্বাচন কমিশনের ২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বর হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ভোটার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন। অর্থাৎ গত ১৭ বছরে ভোটার বেড়েছে প্রায় চার কোটি ৬৬ লাখের বেশি।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ২০০৮ সালের পর গত ১৭ বছরে তিনটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও তরুণদের বড় অংশ ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি। তাঁদের অনেকের বয়স এর মধ্যে ৩০ পেরিয়ে গেছে। তাঁরা এবার প্রথম ভোট দেওয়ার জন্য মুখিয়ে আছেন। তবে এ বছর নির্বাচনে ডিজিটাল প্রচারের প্রাধান্য বেশি। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে তরুণরা দল ও প্রার্থীদের কর্মকাণ্ড ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারছেন। ফলে তাঁরা এবার অনেকটাই বুঝেশুনে ভোট দেবেন। এতে একটি আসনের জয়-পরাজয়ের নিয়ামক হয়ে উঠতে পারেন তরুণ ভোটাররা।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান গত বৃহস্পতিবার সিলেটে বিশাল জনসভার মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেন। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বরে এক জনসভার মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছেন। জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) বৃহস্পতিবার শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদির মাজার এবং জাতীয় তিন নেতার মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছে।
অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীও গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছেন। ক্ষমতায় এলে তরুণসহ দেশের মানুষের জন্য তাঁরা কী করবেন—এ ব্যাপারে নানা প্রতিশ্রুতি নির্বাচনী প্রচারে তুলে ধরছেন। দলগুলো শিগগিরই তাদের নির্বাচনী ইশতেহার জনগণের সামনে তুলে ধরবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগে আমাদের একটা ধারণা ছিল, জেন-জিরা মোবাইলে বুঁদ হয়ে থাকে, তারা রাজনীতিসচেতন নয়। কিন্তু আমাদের সেই ধারণা তারা চব্বিশের আন্দোলনে ভুল প্রমাণিত করেছে। তারা এবার অন্ধভাবে কোনো দলকে ভোট দেবে না। অর্থাৎ তাদের ভোট কোনো এক দল পাবে না। তারা অতীত দেখবে, কারা তাদের অধিকার রক্ষা করতে পারে, স্বার্থ রক্ষা করতে পারে—সেটা দেখবে। আমার মনে হয়, রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত হবে, তাদের ইশতেহারে পরিষ্কারভাবে তরুণদের স্বার্থ তুলে ধরা। ভোটের চর্চায় তরুণরা যে গুরুত্বপূর্ণ, সেটাও বোঝাতে হবে। তাদের অধিকার প্রয়োগের ব্যাপারে সজাগ করে তুলতে পারে রাজনৈতিক দলগুলো।’
বিএনপি এখনো তাদের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ না করলেও তারা ক্ষমতায় এলে ১৮ মাসের মধ্যে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিক্ষিত বেকারদের জন্য এক বছরের ভাতা চালুর কথা বলেছে। এ ছাড়া দেশের সব জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে বিএনপি তাদের প্রচারে খাদ্য সহায়তার জন্য ফ্যামিলি কার্ড, বীজ, সার ও অন্যান্য সহায়তার জন্য কৃষক কার্ড এবং চিকিৎসা কার্ড চালুর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে।
এ ছাড়া দেশের আইটি পার্কগুলোকে কাজে লাগিয়ে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ছোট ছোট অফিস স্পেস ও ফ্রি ওয়াই-ফাই সুবিধা দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। ফ্রিল্যান্সারদের আয়ের টাকা দেশে আনার ক্ষেত্রে পেপালসহ আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়েগুলোর সমস্যা সমাধানেও বিএনপি কাজ করবে। এতে কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয় আরো বাড়বে বলে দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী সম্প্রতি তাদের পলিসি ডায়ালগে বলেছে, গ্র্যাজুয়েশন শেষে চাকরি পাওয়া পর্যন্ত সময়ে পাঁচ লাখ গ্র্যাজুয়েটকে সর্বোচ্চ দুই বছর মেয়াদি মাসিক সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা সুদমুক্ত ঋণ দেওয়া হবে। মেধা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে এক লাখ শিক্ষার্থীর জন্য মাসিক ১০ হাজার টাকা সুদমুক্ত শিক্ষাঋণ দেওয়া হবে।
এ ছাড়া তরুণদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে একটি বিশেষায়িত ‘জব প্লেসমেন্ট ও দক্ষ জনশক্তি মন্ত্রণালয়’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছে জামায়াত। এর আওতায় আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি তরুণকে বৈশ্বিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পেশাদার প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। উচ্চশিক্ষিত যুবকদের কারিগরি উৎকর্ষ সাধনে প্রতিটি উপজেলায় ‘ইয়ুথ টেক ল্যাব’ স্থাপন করা হবে এবং জেলা পর্যায়ে ‘জেলা জব ইয়ুথ ব্যাংক’ গঠনের মাধ্যমে ৫০ লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। এ ছাড়া প্রযুক্তিভিত্তিক অর্থনীতি গড়তে ১৫ লাখ ফ্রিল্যান্সার তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
গত জুলাইয়ে প্রকাশ করা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) ও অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের যৌথভাবে পরিচালিত ‘ইয়ুথ ইন ট্রানজিশন’ শীর্ষক জরিপে দেখা যায়, ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী৩৮.৭৬ শতাংশ তরুণ ভোটার বিএনপিকে ভোট দিতে চান। ২১.৪৫ শতাংশ ভোটারের পছন্দের দল জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ। এ ছাড়া এনসিপির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন ১৫.৮৪ শতাংশ ভোটার।
জরিপে অংশ নেওয়া তরুণ ভোটারদের ৭৬.৭৮ শতাংশ জানিয়েছে, তারা আগামী নির্বাচনে ভোট দিতে চায়। তবে রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে তরুণদের অংশগ্রহণের বিষয়ে হতাশা ও অনাগ্রহ আছে। ৮২.৭ শতাংশ তরুণ জানিয়েছেন, তাঁরা রাজনীতিতে যুক্ত হতে চান না। কারণ হিসেবে তাঁরা উল্লেখ করেছেন রাজনৈতিক সহিংসতা ও রাজনীতিবিদদের নৈতিকতার অভাব।
রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সিফাত ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, “এবারই আমি প্রথম ভোটার হয়েছি। অবশ্যই ভোট দিতে যাব। আমার ব্যক্তিগত অভিমত হলো মার্কা নয়, প্রার্থী দেখে ভোট দেব। যাঁকে সবচেয়ে বেশি যোগ্য মনে করব, যিনি দুর্নীতি করবেন না, যিনি আমাদের এলাকার জন্য দেশের জন্য কাজ করতে পারবেন—তাঁকেই ভোট দেব। তবে গণভোটের ক্ষেত্রে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেব, সেটা আগে থেকেই বলতে পারি।”