Image description

কথার লড়াইয়ে জমে উঠেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটের মাঠ। প্রচার-প্রচারণায় নেমেই বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপিসহ প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর প্রার্থী এবং শীর্ষ নেতারা মেতেছেন বাহাসে। নিজেদের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি প্রতিপক্ষ দলকে ঘায়েল করতে তারা অভিযোগ-পালটা অভিযোগ তুলছেন। যদিও এসব অভিযোগের বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এখন পর্যন্ত সরাসরি কোনো ব্যক্তি বা দলের নাম উল্লেখ করেননি কেউই। তবে ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষায় এক দলের প্রতিশ্রুতির সমালোচনা করছে অন্য দল। আবার প্রতিদ্বন্দ্বীদের নির্বাচনি ‘প্রচারের কৌশল’কে টার্গেট করেও দেওয়া হচ্ছে পালটা বক্তব্য। কেউ কেউ একে-অন্যের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগও আনছেন।

প্রায় ২৫ বছর পরস্পরের রাজনৈতিক মিত্র ছিল বিএনপি ও জামায়াত। কিন্তু ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর এই দুটি দলই নির্বাচনে এখন একে অন্যের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী। ফলে ভোটের মাঠে কেউ কাউকে ছেড়ে কথা বলছে না। তারা বাহাসে লিপ্ত হয়েছেন। বাহাস থেকে দূরে নেই জামায়াতের নির্বাচনি মিত্র এনসিপিও।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে মত, কর্মসূচি ও প্রতিশ্রুতির পার্থক্য থাকবেই। থাকবে সমালোচনাও। কিন্তু সেটা ব্যক্তিগত আক্রমণ, হুমকি কিংবা অসহিষ্ণুতার পর্যায়ে যেন না যায় সেদিকে সব দলকে সতর্ক থাকতে হবে। সতর্ক না থাকলে সংঘাত সৃষ্টি হতে পারে; যা কারও জন্যই মঙ্গল হবে না। ফলে নির্বাচনি প্রচার বা বিতর্কে জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট পলিসি বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলেও মনে করেন তারা।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, প্রতিযোগীদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকবে, কর্মসূচির পার্থক্য থাকবে। তাদের ভিন্ন ভিন্ন প্রতিশ্রুতিও থাকবে। একে অপরের সমালোচনাও থাকবে। কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ, হুমকি কিংবা অসহিষ্ণুতা এখানে সংগতিপূর্ণ নয়। যুগান্তরকে তিনি বলেন, অসহিষ্ণুতা থেকে সংঘাতের সৃষ্টি হতে পারে। ফলে আমাদের রাজনৈতিক দল এবং তাদের মনোনীত প্রতিনিধিদের সহনশীলতা প্রদর্শন করতে হবে। কথা বলার বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত। এই সতর্কতা হবে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষার জন্য। এই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা আমাদের করতে হবে। এটা করতে না পারলে কিন্তু সেই সহিংসতা সৃষ্টি হতে পারে। আর সহিংসতা কারও জন্যই মঙ্গল বয়ে আনবে না।

একই বিষয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ের গবেষক আলতাফ পারভেজ যুগান্তরকে বলেন, আমাদের এখানে পুরো রাজনীতিটা হচ্ছে ব্যক্তিনির্ভর। ফলে তারা ব্যক্তিকে টার্গেট করে এবং ব্যক্তির সাংস্কৃতিক দিকগুলো নিয়ে পরস্পরকে আক্রমণ-পালটা আক্রমণ করছে। এটা কিন্তু বৈশ্বিক মানদণ্ডের নির্বাচনি প্রচারণা বা নির্বাচনি বিতর্ক নয়। তিনি আরও বলেন, বিতর্ক হওয়ার দরকার ছিল জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট পলিসির বিষয়ে। সেটা অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক বা স্থানীয় সরকার কিংবা জাতীয় সরকার এবং চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের এজেন্ডা নিয়ে হলে ভালো হতো। কিন্তু সেই পলিসিভিত্তিক আলাপ হচ্ছে না। জনগণের দিক থেকেও তেমন শক্তিশালী কোনো দাবি নেই। কেউ প্রশ্ন তুলছে না প্রার্থীরা স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নয়নে কি করবে? পরিবহণের জন্য কি করবে? আবার কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে তারা কি করবে, সে প্রশ্নও কেউ তুলছে না। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনি প্রচারণার বিষয়বস্তুগুলো অনেক পেছানো বলেও মন্তব্য করেন আলতাফ পারভেজ।

নির্বাচনি প্রচারের প্রথমদিন বৃহস্পতিবার সিলেটের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠ থেকে শুরু করে হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের শেরপুরসহ আটটি স্থানে জনসভা করেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ সময় বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি প্রতিপক্ষকে উদ্দেশ করে নানা বক্তব্য দেন তিনি। জামায়াতের নাম উচ্চারণ না করলেও দলটির নেতাদের দেওয়া বক্তব্যের প্রতি ইঙ্গিত করেন বিএনপি চেয়ারম্যান। তিনি ‘একটি দল’ সম্বোধন করে তাদের বিরুদ্ধে ‘মিথ্যাচার’, মানুষকে ‘ঠকানো’ ও ‘শিরক’ করার মতো অভিযোগ তুলেন। তারেক রহমান বলেন, যারা বেহেশতের টিকিট দেওয়ার কথা বলে ভোট চাইছে, তারা নিজেরা শিরক করছেন, ভোটারদেরও ঠকাচ্ছেন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে দলটির কী ভূমিকা ছিল, সে কথাও ভোটারদের স্মরণ করিয়ে দেন তারেক রহমান।

শুক্রবার বিকালে দেবীপুর ইউনিয়নের শোল্টিহরি বাজারের পথসভা ও নির্বাচনি জনসংযোগের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনি প্রচার শুরু করেন বিএনপির মহাসচিব এবং ঠাকুরগাঁও-১ আসনের বিএনপি প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এসময় জামায়াতকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, তারা কোনোদিন ক্ষমতায় যায়নি। ফলে মানুষের জন্য কিভাবে কাজ করতে হয় তারা জানেন না। তিনি বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে জনসাধারণ, বিশেষ করে মা-বোনদের ফ্যামিলি কার্ড প্রদান এবং কৃষকদের কৃষি কার্ড দিয়ে তাদের উচ্চ জীবনমান নিশ্চিত করবে। এ ব্যাপারে আমাদের চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

একই দিন জুমার নামাজের আগে চকরিয়া উপজেলার সুরাজপুর-মানিকপুর ইউনিয়নের উত্তর মানিকপুরে পথসভায় বক্তব্য রাখেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। এ সময় কোনো দলের নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, ‘যারা ভারতের পক্ষের শক্তি ছিল তারা ভারতে পালিয়েছে। আরেকটি শক্তি বিদেশি শক্তির গোলামি করে। তারা বাংলাদেশে বিভিন্ন রকম বিভ্রান্তি করে রাজনীতি করছে। আমরা বাংলাদেশের শক্তি, বাংলাদেশের মানুষের পক্ষের শক্তি। আমাদের স্লোগান হচ্ছে সবার আগে বাংলাদেশ।’

এবারের নির্বাচনে বিএনপির অন্যতম প্রতিশ্রুতি হচ্ছে চার কোটি পরিবারকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়া হবে। এই বিষয়ে প্রচারণা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে সমালোচনা করতে দেখা গেছে জামায়াত এবং এনসিপির শীর্ষ নেতাদের। শুক্রবার পঞ্চগড়ের ঐতিহাসিক চিনিকল মাঠে ১০ দলীয় জোটের নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। এ সময় বিএনপির নাম উল্লেখ না করলেও ‘ফ্যামিলি কার্ড’র বিষয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘ভাই, আমাদের কাছে কোনো কার্ড নেই। আপনারা সবাই ভাইবোনেরা আমাদের কার্ড। আপনাদের বুকে আমরা একটা ভালোবাসার কার্ড চাই।’ যদিও এদিন সকালে উত্তরবঙ্গের আট জেলায় নির্বাচনি প্রচার শুরুর সময় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তিনি দেশের স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, ‘পরস্পরকে আঘাত না করে নিজের কর্মসূচি নিয়ে জনগণের কাছে যাওয়া প্রয়োজন।’

শুক্রবার ডুমুরিয়া উপজেলার গুটুদিয়ায় নির্বাচনি সমাবেশে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্যের প্রতি ইঙ্গিত করে তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘কোনো একজন মুসলমান, যিনি আল্লাহ, রাসুল ও আখেরাত বিশ্বাস করেন, তিনি পরকালে বিশ্বাসী আরেকজনকে কাফের বলতে পারেন না, এটি জায়েজ নয়। তিনি এটা বড় অপরাধ করেছেন। গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, ‘আমরা ধারণা করেছিলাম, উনি লন্ডনে গেছেন, পড়াশোনা করেছেন, কিছুটা পলিটিক্যাল ম্যাচিউরিটি হয়তো আছে। কিন্তু দেখি যে উনি তো এখন বড় মুফতি হয়ে গেছেন। বিলেত থেকে এসে ফতোয়া দিচ্ছেন, কে মুসলমান আর কে কাফের। এটা বলার তার কোনো অধিকার নেই। রাজনৈতিক নেতা হিসাবে সৌজন্য, শিষ্টাচারবোধের জায়গা থেকেও এই কথা বলা যায় না।’

এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম শুক্রবার সকালে রাজধানীর শাহজাদপুর এলাকায় ঢাকা-১১ আসনে নির্বাচনি প্রচার শুরু করেন। এ সময় বিএনপিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘১০ দলীয় জোটের গণজোয়ারে আতঙ্কিত হয়ে একটি দল এখন উলটাপালটা বক্তব্য দিচ্ছে।’ এর আগে নির্বাচনি প্রচারের প্রথম দিন বৃহস্পতিবার মিরপুর-১০ এর স্থানীয় একটি স্কুল মাঠে জামায়াতের সমাবেশে বক্তব্য রাখেন নাহিদ ইসলাম। এ সময় তিনি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ নিয়ে তারেক রহমানের প্রতিশ্রুতির সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘একদিকে তারা কার্ড দেওয়ার কথা বলছেন, আরেক দিকে ঋণখেলাপিদের মনোনয়ন দিচ্ছে।’