চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহর থানার নাথপাড়া নিশি মহাজন বাড়ির বাসিন্দা সন্তোষ চন্দ্র নাথ। ১৯৯৮ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ১৮ বছর ছিলেন প্রবাসে। দেশে ফিরে ছোট ভাই আশুতোষ নাথকে নিয়ে একই থানার চুনা ফ্যাক্টরি মোড় এলাকায় একটি ফার্মেসি দেন। গত এক দশক ধরে দুই ভাই মিলে সেই ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন। অন্য এক ব্যক্তির সঙ্গে জায়গা-জমির বিরোধের জেরে সম্প্রতি সন্তোষ চন্দ্র নাথকে দোকান থেকে তুলে নিয়ে যায় হালিশহর থানা পুলিশ। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে থানার একটি মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। অনুসন্ধানে ওঠে এসেছে, প্রতিপক্ষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ‘আওয়ামী লীগ ট্যাগ’ দিয়ে ফাঁসানো হয়েছে সন্তোষ চন্দ্রকে। ফার্মেসি থেকে তুলে নিলেও আসামিকে আদালতে পাঠানোর ফরোয়ার্ডিংয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, চুনা ফ্যাক্টরি মোড় থেকে তাকে আটক করা হয়েছে। এ ঘটনার প্রমাণ না রাখতে ফার্মেসি থেকে জোরপূর্বক সিসিটিভি ডিভাইস খুলে নিয়ে গেছে হালিশহর থানা পুলিশ।
শুধু হালিশহর থানা পুলিশ নয়, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) প্রতিটি থানার পুলিশ ফের বেপরোয়া হয়ে ওঠেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে যেমন ‘বিএনপি-জামায়াত ট্যাগ’ দিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা হতো, ‘গায়েবি’ মামলায় ফাঁসানো হতো, তেমনি বর্তমানেও একই কায়দায় ‘আওয়ামী লীগ ট্যাগ’ দিয়ে ফাঁসানো হচ্ছে নিরীহ মানুষজনকে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পূর্বশত্রুতার জের, জায়গা-জমির বিরোধ, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বসহ নানা কারণে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে রাজনৈতিক মামলাকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফেসবুক থেকে ভুক্তভোগীর ছবি সংগ্রহ করে প্রযুক্তির মাধ্যমে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে। আর টাকার বিনিময়ে এ ধরনের যে কোনো মানুষকে সরকারবিরোধী কিংবা সন্ত্রাসবিরোধী মামলার ‘অজ্ঞাত’, ‘তদন্তে প্রাপ্ত’ অথবা ‘সন্দিগ্ধ’ আসামি উল্লেখ করে আদালতে পাঠিয়ে দিচ্ছে পুলিশ। এছাড়া থানা-পুলিশের ‘অ্যাচিভমেন্ট’ দেখাতেও ফাঁসানো হচ্ছে নিরপরাধ লোকদের। এসব মামলায় ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে চাকরিজীবী কিংবা দরিদ্র মানুষ; কেউই বাদ যাচ্ছেন না। নির্বাচনকে সামনে রেখে এই পরিস্থিতি আরও চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সূত্র জানায়, ৩০ অক্টোবর হালিশহর থানাধীন এসি মসজিদসংলগ্ন স্থান থেকে প্রাইভেটকারচালক কফিল উদ্দিনকে আটক করে নিয়ে যায় পাহাড়তলী থানার এসআই খোকন। থানায় নেওয়ার পর তাকে বিএনপির আবদুল্লাহ আল নোমানের ওপর হামলা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছিল। সেই মামলায় ১ মাস ১০ দিন জেল খেটে তিনি বের হয়েছেন। ওই সময় পাহাড়তলী থানার ওসি হিসাবে দায়িত্বে ছিলেন জসিম উদ্দিন। অথচ প্রাইভেটকারচালক কফিল উদ্দিন কখনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। এছাড়া তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা কিংবা জিডি দায়েরের তথ্য নেই। একই ভাবে আকবরশাহ থানা ভাঙচুরের মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতালের কর্মচারী মো. পাভেল ও ফয়’স লেক এলাকার নৈশপ্রহরী মো. মামুনকে। এর মধ্যে পাভেল জেল থেকে বের হয়েছেন। তবে মামুন এখনো কারাগারে রয়েছেন।
হালিশহর থানা পুলিশ সূত্র জানায়, ১৫ জানুয়ারি রাত ৯টা ৪৫ মিনিটের দিকে চুনা ফ্যাক্টরির মোড় থেকে সন্তোষ চন্দ্র নাথকে আটক করা হয়। ওই অভিযানে হালিশহর থানার এএসআই মো. হান্নান হোসেন, এএসআই মিরাজ উদ্দিন ও সঙ্গীয় ফোর্স ছিলেন। থানার নভেম্বর মাসের একটি সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় সন্দিগ্ধ আসামি হিসাবে গ্রেফতার দেখিয়ে পরদিন তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। আদালতে পাঠানোর ফরোয়ার্ডিংয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘গত ২১ নভেম্বর দুপুর অনুমান ১টার সময় নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের নেতৃত্বে স্বেচ্ছাসেবক লীগ, যুবলীগসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের কতিপয় নেতাকর্মী হালিশহর থানাধীন আউটার রিং রোডের ভগির খালের সামনে গানার্স ট্রেনিং সেন্টার থেকে পতেঙ্গাগামী রাস্তার ওপর টাকার বিনিময়ে সরকারবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দেয়। ওই সময় থানার টহল পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে সন্দিগ্ধ আসামিসহ অন্যান্য আসামিরা পালিয়ে যায়। এছাড়া সন্দিগ্ধ আসামি বিভিন্ন সময়ে সরকারবিরোধী মিছিলে অংশগ্রহণ এবং মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসছে। যা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেও সন্তোষ চন্দ্র নাথ স্বীকার করেছেন।’ বর্তমানে সন্তোষ চন্দ্র নাথ কারাগারে রয়েছেন। তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভিন্ন ঘটনা। ১৫ জানুয়ারি প্রতিদিনের মতো নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাশে বসে ছিলেন সন্তোষ চন্দ্র নাথ। পাশের দোকানের একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সন্ধ্যা ৬টা ৪৬ মিনিটের দিকে সাদা পোশাকে দোকানে প্রবেশ করেন হালিশহর থানার এএসআই হান্নান হোসেন। দোকানের কর্মচারী সজিবকে বলেন, সিসিটিভি ক্যামেরার লাইন বিচ্ছিন্ন করতে। তিনি পারেন না জানালে এএসআই হান্নান নিজেই দোকানের ভেতর প্রবেশ করেন এবং লাইন বিচ্ছিন্ন করে সিসিটিভির ডিভাইস হাতে নিয়ে নেন। এরপর সন্তোষ চন্দ্রকে তাদের সঙ্গে থানায় যেতে বলেন। কিন্তু তিনি কোন অপরাধে থানায় যাবেন, তা জানতে চান। এ সময় উপস্থিত হন এএসআই মিরাজ। তারা জোর করে সন্তোষ চন্দ্রকে থানায় নিয়ে যেতে চান। এ ঘটনা দেখে উপস্থিত একজন ক্রেতা, নিজেকে ভিন্ন একটি বাহিনীর সদস্য হিসাবে পরিচয় দিয়ে বিষয়টি জানতে চাইলে তার সঙ্গে তর্কে জড়ান পুলিশ সদস্যরা। একপর্যায়ে রাত ৮টা ২০ মিনিটের দিকে থানার সেকেন্ড অফিসার এসআই মোশারফ এবং ওসি কাজী মুহাম্মদ সুলতান আহসান উদ্দীন এসে দোকান থেকে টেনেহিঁচড়ে সন্তোষ চন্দ্রকে বের করে থানায় নিয়ে যান।
জানা গেছে, সন্তোষ চন্দ্র নাথ ও আশুতোষ নাথের পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে বিজ্ঞান কুমার নাথ ও বিজন কুমার নাথের সঙ্গে। সম্প্রতি বিজ্ঞান কুমার নাথ ওই বিরোধপূর্ণ সম্পত্তি নিজের কব্জায় নিতে নানাভাবে চেষ্টা-তদবির শুরু করেছেন। এরই অংশ হিসাবে সন্তোষ চন্দ্রকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞান কুমার নাথের খালাতো ভাই কিশোর কুমার নাথ। তিনি বলেছেন, জায়গা-জমির বিষয়টি সমাধান হয়ে গেলে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।
সন্তোষ চন্দ্রের প্রতিবেশী ও হালিশহর থানা শ্রমিক দলের আহ্বায়ক মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমি কেন? এলাকার সবাই সন্তোষ চন্দ্র নাথ ও তার ছোট ভাই আশুতোষ নাথকে চেনে। তারা কখনো কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল না। থানায় নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি শুনে হতবাক হয়ে গেছি।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে হালিশহর থানার ওসি কাজী মুহাম্মদ সুলতান আহসান উদ্দীন যুগান্তরকে বলেন, ‘ফরোয়ার্ডিংয়ে যেখানে লেখা আছে সেখান থেকেই আটক করা হয়েছে।’ সিসিটিভি ডিভাইস জব্দ করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপনি থানায় আসেন, তারপর দেখা যাবে।’