Image description

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র ১৯ দিন বাকি। এ নির্বাচনের প্রচারকে কেন্দ্র করে সারাদেশে চলছে ভোট উৎসব। রাজনৈতিক দলগুলো নানা কৌশলে প্রার্থীদের জন্য ভোট প্রার্থনা করছে। কোন দলকে পেছনে ফেলে কোন দল এগিয়ে যাবে এ নিয়ে শুরু হয়েছে জোরালো প্রতিযোগিতা। স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও বসে নেই। ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে  চলছে বিরামহীন গণসংযোগ।

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই সারাদেশে শুরু হয়েছে নির্বাচনী জোয়ার। শুরু হয় নির্বাচনমুখী রাজনৈতিক দলগুলোর ভোটযুদ্ধ। তবে ২১ জানুয়ারি প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দের পর এ যুদ্ধ আরও তীব্র হয়। ভোটের মাঠে নিজেদের পথ সুগম করতে মাঠে অধিক সক্রিয় হয় রাজনৈতিক দলগুলো। কেন্দ্রীয়ভাবে দলীয় কর্মকাণ্ড জোরদার করার পাশাপাশি প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার দলীয় ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় ভোটের প্রচারে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কে কাকে পেছনে ঠেলে গণসংযোগ জোরদার করে ভোটারদের মন জয় করতে পারবেন এ জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়।

তফসিল অনুসারে ২২ জানুয়ারি ভোটের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুর দিন থেকে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল দেশব্যাপী জমজমাট নির্বাচনী প্রচার শুরু করে। দেশের বড় রাজনৈতিক দল বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সিলেট থেকে এবং জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করেন নির্বাচনী প্রচার। অন্যান্য দলের শীর্ষ নেতারাও নিজ নিজ সুবিধাজনক এলাকা থেকে তাদের নির্বাচনী প্রচার শুরু করেনে। এ ছাড়া নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব দলের এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটের প্রচার শুরু করেন। এর ফলে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের প্রচারকে কেন্দ্র করে সারাদেশেই নির্বাচনী উৎসব শুরু হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সারাদেশের প্রতিটি সংসদীয় আসনেই প্রার্থীদের পাশাপাশি তাদের স্বজনসহ ঘনিষ্ঠজনরা পাড়া, মহল্লা, রাজপথ, গলিপথ, বাজার, মার্কেট এবং মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট প্রার্থনা করছেন। এছাড়া প্রতিদিনই সমাবেশ, পথসভা, মিছিল ও স্লোগানসহ দলে দলে ঘুরে ঘুরে গণসংযোগ চালিয়ে নিজ নিজ প্রার্থীর পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটের প্রচার শুরুর দিনেই সারাদেশে উৎসবমুখর  পরিবেশ লক্ষ্য করা গেছে, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সিলেট থেকে দলের পক্ষে ভোটের প্রচার শুরু করে ঢাকায় ফেরার পথে আরও ৬ জেলায় ভোট প্রার্থনা করেন।

সিলেট আলিয়া মাদ্রাসা মাঠের বিশাল জনসভা থেকে শুরু করে মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, বি’বাড়িয়া, কিশোরগঞ্জের ভৈরব, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জ জেলার জনসভায় বক্তব্য রাখেন। প্রতিটি জনসভাতেই বিপুল সংখ্যক লোকের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। ধানের শীষ প্রতীক ও জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে স্লোগান দিয়ে তারা তারেক রহমানকে স্বাগত জানায়। আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচারের দ্বিতীয় দিনে নিজ নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-১৭ এর ভাষানটেকের সমাবেশে নির্বাচনী প্রচার চালান তারেক রহমান। এই সমাবেশকে কেন্দ্র বিশাল শোডাউন করে বিএনপি।  

আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটের প্রচার শুরুর দিনে নিজের নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-১৫ আসনের (মিরপুর-কাফরুল) মিরপুর ১০ নম্বরের আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে জনসভা আয়োজনের মাধ্যমে নিজের ও দলের জন্য ভোট প্রার্থনা করেন জামায়াতে ইসলামীর ডা. শফিকুর রহমান। হাজার হাজার মানুষ দাঁড়িপাল্লা প্রতীক ও মিছিল-স্লোগানসহ ডা. শফিকুর রহমানকে স্বাগত জানায়। দাঁড়িপাল্লা মার্কার পক্ষে স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয় সমাবেশস্থল। ব্যানার-ফেস্টুনে ছেয়ে যায় গোটা এলাকা। জনসভাকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে বিশাল শোডাউন করে জামায়াতে ইসলামী। এই জনসভায় এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোটের নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়াও নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রতিটি রাজনৈতিক দল উৎসবমুখর পরিবেশে সভা-সমাবেশ ও গণসংযোগ করে নিজেদের প্রার্থীর পক্ষে ভোট প্রার্থনা করে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আর মাত্র ১৯ দিন পর ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে। এখন পর্যন্ত নির্বাচনের যে পরিবেশ তা অব্যাহত থাকলে ওইদিন সারাদেশে ভোট উৎসব হবে। অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকেও বলা হচ্ছে ১২ ফেব্রুয়ারি সারাদেশে ভোট উৎসব হবে।

এদিকে নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের বড় দুইটি রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনীতি কিছুটা উত্তপ্ত হলেও এখন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এ পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত অব্যাহত থাকলে দেড়যুগ পরে দেশে একটি ভালো নির্বাচন হবে বলে জনগণ প্রত্যাশা করছে।

অভিজ্ঞ মহলের মতে, সর্বশেষ ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল উৎসবমুখর। এর পর আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করলে দেশের পরবর্তী ৩টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় একতরফা। এই তিনটি নির্বাচনে জনমানুষের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায়নি। দীর্ঘ প্রায় দেড়যুগ পর এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আবার দেশে উৎসবমুখর পরিবেশ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

বড় ধরনের কোনো অঘটন না ঘটলে এই উৎসবমুখর পরিবেশ ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।  খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কে কাকে ডিঙ্গিয়ে ভোটের লড়াইয়ে উত্তীর্ণ হতে পারে সেজন্য ইতোমধ্যেই রাজনৈতিক দলগুলো নিজ নিজ কৌশলে এগিয়ে যাচ্ছে। নানা সমীকরণে ভোটের পাল্লা ভারি করতে সমমনা দলগুলোকেও কাজে লাগাছে বিএনপি ও জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। এ ছাড়া বড় দলগুলো বিভিন্ন শ্রেণিপেশার প্রতিনিধিদের নির্বাচনী প্রচারের কাজে লাগাচ্ছেন। সর্বস্তরের মানুষের সম্পৃক্ততায় প্রতিদিনই তারা সভা-সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন। আর এ কারণেই এবারের নির্বাচনে জমজমাট প্রচার লক্ষ্য করা যাচ্ছে।  

দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে হচ্ছে। তাই রাজনৈতিক দলের প্রার্থী এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জমজমাট প্রচার করার পাশাপাশি সরকারও গণভোট সফল করতে ব্যাপক প্রচার চালাচ্ছে। আর এ কারণে এবারের নির্বাচন একটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারও চায় এবারের নির্বাচনটি অতীতের যে কোনো নির্বাচনের চেয়ে বেশি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে হোক। প্রধান উপদেষ্টা ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, এবারের জাতীয় নির্বাচন হবে ইতিহাসের সেরা নির্বাচন।

তফসিল ঘোষণার আগে সে বিষয়টি মাথায় রেখেই অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশন সার্বিক প্রস্তুতি নিয়েছে। তাই দেশের মানুষ প্রত্যাশা করে এবারের নির্বাচন ২০১৪,  ২০১৮ বা ২০২৪ মতো একতরফা হবে না। ভোটাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই কেন্দ্রে গিয়ে নিজ নিজ পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবেন। আর তা যদি হয় তাহলে সত্যিকার অর্থেই উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে বিভিন্ন মহল মনে করছে। 
ভিন্ন রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে অনেক আগে থেকেই এবার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মনোনীত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ভোটের মাঠে সক্রিয় হয়। তবে তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সারাদেশের সকল নির্বাচনী এলাকার পাড়া-মহল্লা ও হাটবাজারগুলোতে ভোটের প্রচার আরও জোরদার করেন তারা। বিভিন্ন শহর-বন্দরে বসবাসকারী স্বজনরাও নিজ নিজ সংসদীয় এলাকায় গিয়ে স্বজন অথবা দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করছেন। সেই সঙ্গে সাধারণ ভোটাররাও পছন্দের প্রার্থী খুঁজতে বিভিন্নভাবে তৎপর হয়েছেন।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অনুকূল পরিবেশ পেয়ে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও নতুন দল এনসিপিসহ অর্ধশতাধিক রাজনৈতিক দল এবার জোরোশোরে নির্বাচনী মাঠে সক্রিয়। জনগণের ভোটে ক্ষমতায় যেতে নানামুখী কৌশলে তারা এখন তৎপর। বড় দলগুলোর প্রচার প্রকাশ্যে বেশি দেখা গেলেও অন্যান্য দলের প্রচার চলছে ভেতরে ভেতরে। তাই দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে শেষ পর্যন্ত ভোটের হিসাব-নিকাশ কোনদিকে যায় তা দেখার বিষয়। অভিজ্ঞ মহলের মতে, বাহ্যিক দৃষ্টিতে বিএনপির অবস্থান শক্ত মনে হলেও জামায়াতসহ আরও ক’টি দল অনেকদিন ধরেই জনগণের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত ভোটের সমীকরণ কোনদিকে যায় তা আগামী ১৯ দিন পরই জানা যাবে। আর তা দেখার জন্য দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মহল অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।

দেশে এর আগে ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ, ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন, তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়  ১৯৮৬ সালের ৭ মে, ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ অনুষ্ঠিত হয় চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। পঞ্চম জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন, সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়  ১৯৯৬ সালের ১২ জুন আর  অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০০১ সালের ১ অক্টোবর। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০০৮ সালের ২ নভেম্বর,  দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর এবং দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি। আর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটার ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩। পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭ ও নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ হাজার ২৩৪ জন। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের জন্য ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোটকেন্দ্র চূড়ান্ত করেছে ইসি। প্রায় ১০ লাখ নির্বাচন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন।