দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে সারাদেশে একযোগে পরিচালিত হচ্ছে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২’। সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব ও পুলিশ সদস্যদের যৌথ পরিচালিত এই অভিযানে প্রায় ৩০ হাজার জনকে বিভিন্ন অপরাধের দায়ে গ্রেফতার করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে পাঁচ শতাধিক আগ্নেয়াস্ত্রসহ দেশীয় অস্ত্র। এরপরও কমেনি হত্যাকাণ্ড।
আর কয়েক দিন বাদেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্প্রতি বেশ কিছু হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। যার মধ্যে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডই বেশি। এতে যেমন রাজনৈতিক অঙ্গনে, তেমনি জনমনেও আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের শঙ্কা, ভোটের আগে এ ধরণের সহিংসতা নির্বাচনের পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানোর পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলার পরামর্শ দিচ্ছেন।
গত বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি গাজীপুরে সাবেক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের বাড়িতে হামলা এবং ভাঙচুর এবং সেখানে জুলাই ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীদের উপর প্রাণঘাতী আক্রমণ ঘটনার পর অপারেশন ডেভিল হান্ট শুরু হয়। এই বিশেষ অভিযানে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ১২ হাজার ২২০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এছাড়া উদ্ধার করা হয় ৫০টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ১৮৮টি দেশীয় অস্ত্র।
এরপর নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার পরদিন রাজধানীতে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান বিন হাদিকে গুলি করার ঘটনার পর আবারও শুরু হয় বিশেষ অভিযান অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২। ১৩ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৮ হাজার জনকে নানা অপরাধে গ্রেফতার করা হয়েছে।
পুলিশ বলছে, দু’বার পরিচালিত এই বিশেষ অভিযানে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের মধ্যে থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রও রয়েছে। আর গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে চিহ্নিত অপরাধীরাও রয়েছেন।
তবে, এরপরও থামছে না হত্যাকাণ্ড। গত বছরের ১৭ নভেম্বর মিরপুরে বিএনপি নেতা গোলাম কিবরিয়াকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর এক মাস না যেতেই গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর বিজয়নগরে প্রকাশ্যে দিনের বেলায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে গুরুতর আহত হন ওসমান হাদি। চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টার পরও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো যায়নি। হাদির হত্যাকাণ্ডের মতো একই কায়দায় চট্টগ্রামের রাউজানে যুবদল নেতা জানে আলম সিকদারকেও হত্যা করা হয়। সর্বশেষ ৭ জানুয়ারি তেজগাঁওয়ে খুন হন স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আজিজুর রহমান মোসাব্বির। এছাড়া গত ৮ জানুয়ারি গাজীপুরে এক এনসিপি নেতাকে গুলির ঘটনা ঘটেছে। তিনি প্রাণে বেঁচে গেলেও দুর্বৃত্তরা তার মোটরসাইকেলটি নিয়ে যায়।
২০২৫ সালে দেশে প্রতিদিন গড়ে ১১ জন খুন হয়েছেন, যা আগের দুই বছরের তুলনায় বেশি। এর মধ্যে শুধু গত বছরই রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা একশোর বেশি।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন অন্তত ১০২ জন। এর আগের বছর অর্থাৎ, এই সংখ্যা ছিল ১০০ জন।
অপরদিকে, পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সব মিলিয়ে গত বছর সারা দেশে তিন হাজার ৭৮৫টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৫৩টি বেশি।
পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ সবসময়ই কাজ করে যাচ্ছে। তারপরও কিছু ঘটনা ঘটে গেছে। এসব ঘটনায় পুলিশ অপরাধীদের গ্রেফতারে অভিযান চালাচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেক ঘটনার রহস্যও উদঘাটন করা হয়েছে। সেইসঙ্গে ঝুঁকি বিবেচনা করে অনেককে এরইমধ্যে গানম্যান দেওয়া হয়েছে। আরও অনেককেই দেওয়ার প্রক্রিয়া অব্যাহত। যদি কোনও ব্যক্তি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেন, তাহলে তিনি গানম্যানের জন্য আবেদন করতে পারেন। আমরা খতিয়ে দেখবো।”
তিনি আরও বলেন, “অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আমাদের বিশেষ অভিযানের পাশাপাশি নিয়মিত অভিযান চলছে। সন্ত্রাসী গ্রেফতারের জন্য আমাদের অধিকাংশ সদস্য অভিযানে অংশ নিচ্ছেন। হত্যাসহ নানা অপরাধ দমনে আমাদের সকল ইউনিটকে এলার্ট করা হয়েছে। কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কারাগার থেকে পালানো চরমপন্থি ও আন্ডারওয়ার্ল্ড সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। সেইসঙ্গে নানা অপরাধে জামিন পাওয়া বন্দিদেরও নজরদারিতে রাখা হয়েছে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “সম্প্রতি যে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড দেখছি, এগুলোর পেছনের মূল বিষয়টাও রাজনৈতিক। আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের জন্যই টার্গেট কিলিং কিংবা রাজনৈতিক নেতাকর্মী হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বাড়ছে। এসব ঘটনা যখন ক্রমাগত বাড়তে থাকে তখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর যে সক্ষমতা, তাতে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। আর এই ঘাটতি বিভিন্ন অপরাধে কাজে লাগাচ্ছেন অপরাধীরা।”
তিনি বলেন, “আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকে আরও সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। নইলে নির্বাচনের আগে সহিংসতার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।”