বেগম খালেদা জিয়া পরবর্তী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতারা সাংবাদিক এড়িয়ে চলছেন। দলটির গুলশানে চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয় (সাবেক চেয়ারপারসনের কার্যালয়) ও বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কার্যালয়ে প্রবেশ করতে পারছেন না গণমাধ্যম কর্মীরা। সংবাদের জন্য চাইলেও বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ কারও সাথে কল দিয়েও কথাও বলতে পারছেন না।
এতে বিএনপির সংবাদ প্রকাশ করতে গণমাধ্যমকর্মীরা প্রেস রিলিজ নির্ভর হয়ে পড়ছেন। তাও আবার সবাই পান না। শুধু মাত্র পছন্দের সাংবাদিক নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ যে সকল গ্রুপ আছে সেখানে যারা যুক্ত আছেন তারা পান। অন্যদের বিএনপির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন পেজের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। সেখানে আবার কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে হয়ে যায়। এ ছাড়া, বিএনপির অনেকে গণমাধ্যমের সামাজিক যোগযোগমাধ্যমের সঙ্গে ইউটিউবারের কার্যক্রমের সাথে গুলিয়ে ফেলছেন।
তবে নতুন বছরে একদিন মাত্র নিরাপত্তা ব্যবস্থার কড়াকড়ির মধ্যে স্বল্পসংখ্যক সাংবাদিক নিয়ে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রথম সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করা হয়। দেশের একটি বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কাছে তথ্য নিতে গিয়ে অবাধে প্রবেশ করতে না পেরে হয়রানির শিকার হচ্ছেন গণমাধ্যম কর্মীরা। বিশেষ করে তরুণ ও নতুন গণমাধ্যমে যুক্ত সাংবাদিকরা বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন। তারা বিএনপির দুর্দিনের আন্দোলন সংগ্রামে কাভারেজ দিয়েছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশও করছেন।
তারা জানান, বিএনপির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শুধুমাত্র দলটির পছন্দের সাংবাদিক ছাড়া অন্যদের আমন্ত্রণ জানানো হয় না। বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সংবাদ সংগ্রহে গিয়ে কার্যালয়ে প্রবেশে বাধাপ্রাপ্ত হন। এ ছাড়া, গত ১০ জানুয়ারি বনানীর শেরাটন হোটেলে দলটির সদ্য নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রবেশে বাধাপ্রাপ্ত হন বিএনপির বিটের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত সংবাদকর্মীরা।
এ ছাড়া, সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির চেয়ারম্যানের গুলশানের কার্যালয়ের সামনে তীব্র শীত ও মশার কামড়ের মধ্যে সড়কে দিনভর দায়িত্ব পালন করছেন সংবাদকর্মীরা। সেখানে তাদের জন্য নেই কোনো শৌচাগার। এতে অফিস অ্যাসাইমেন্ট নিয়ে দিনভর অবস্থান করা গণমাধ্যমকর্মীরা দুর্ভোগের মধ্যেই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তার উপর বিএনপির দায়িত্বশীল অনেককে দিনের পর দিন কল দিলেও রিসিভ করেন বা পরেও কলব্যাক করেন না। এমনকি বার্তা পাঠালেও সাড়া দেন না। বিএনপির বিভিন্ন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ক্ষমতায় চলে এসেছেন বলে এক রকম অহংকারবোধ কাজ করছে বলে সমালোচনা করছেন খোদ গণমাধ্যমে কাজ করা কর্মীরা।
২০০৬ সালে বিএনপি ক্ষমতা থেকে বিদায় নেয়ার সময় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক্স মাধ্যমে বিএনপি বিট কাভার করা সংবাদকর্মীর সংখ্যা ছিল সবমিলিয়ে ৫০ জনের মতো। কিন্তু বিগত দুই দশকে ছাপানো পত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেলের পাশাপাশি অনলাইন ও মাল্টিমিডিয়া রিপোর্ট গণমাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। রীতিমতো ছাপানো পত্রিকা ও টেলিভিশনের চেয়ে অনলাইন ও মাল্টিমিডিয়ার পাঠক-দর্শক ছাড়িয়ে গেছে। শুধু বাংলাদেশ নয় গণমাধ্যমের নতুন ফরমেটটির বিশ্বব্যাপীই জয়জয়কার। বর্তমানে এর আয়ের উপরে সংবাদমাধ্যমের ব্যয় নির্বাহে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায় বাধ্য হয়ে প্রায় সকল মিডিয়া হাউজে গণমাধ্যমের নতুন ফরমেট চালু রয়েছে।
স্বাভাবিকভাবে গণমাধ্যমে অনলাইন ও মাল্টিমিডিয়ায় কাজ করা সংবাদকর্মীরা পরিশ্রম করলেও বিএনপি সংশ্লিষ্টরা বাস্তবতায় বিষয়টি অনুধাবন না করে বরং গুরুত্বপূর্ণ এই মাধ্যমকে এড়িয়ে চলছেন। এমনকি অনেকের আচরণে রীতিমতো নতুন ফরমেটের প্রতি বিরুক্তি প্রকাশ পাচ্ছে। তাদের অনেকে গণমাধ্যমের সামাজিক যোগযোগমাধ্যমের সঙ্গে ইউটিউবারের কার্যক্রমের সাথে গুলিয়ে ফেলেন। এই কারণে তারা গণমাধ্যমকে সহযোগিতার বদলে উল্টো বাধাগ্রস্ত করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এ বিষয়ে বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে দলটির মিডিয়া উইংয়ে কাজ করা সদস্যরাও অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন।
এই অবস্থায় সম্প্রতি গণমাধ্যমের নতুন ফরমেটে বিএনপি বিটের সংবাদকর্মীদের দুর্ভোগ নিয়ে বেশ কয়েকজন সংবাদকর্মী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম যুগান্তরের লিড মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার ফখরুল ইসলাম ও এনপিবি নিউজের হেড অব ডিজিটাল আকরাম হোসেন খান নাঈম। তিনি এর আগে কালবেলার লিড মোজো ছিলেন। আর ফখরুল ইসলাম মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (এমআরএ) এর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ফেসবুক পোস্টে এনপিবি নিউজের হেড অব ডিজিটাল আকরাম হোসেন খান নাঈম লিখেন, বিএনপি মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকদের সাংবাদিক মনে করছেন না—খুবই ভালো। শুধু স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি— আজ যাদের নিয়ে জনাব তারেক রহমান সভা করেছেন, এই এলিট সাংবাদিকরাই একসময় তারেক রহমানকে দুর্নীতির বরপুত্র হিসেবে সারা পৃথিবীর কাছে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। এই এলিট সাংবাদিকরাই ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগমুহূর্ত পর্যন্ত তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচার করেননি। এই এলিট সাংবাদিকরাই তারেক রহমানকে দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য করার ‘ক্ষেত্র’ তৈরি করেছিলেন। এই এলিট সাংবাদিকরাই এক-এগারোর প্রেসক্রিপশন বাস্তবায়নে ভূমিকা রেখেছিলেন।
অন্যদিকে— যখন মাঠে বিএনপি ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়ছিল, পাচ্ছিল না কোনো মিডিয়া ফোকাস, সহযোগিতা করছিল না কোনো গণমাধ্যমের হর্তাকর্তারা— ঠিক তখনই দলটি ভরসা রেখেছিল মাল্টিমিডিয়ার ওপর। সবার মনে থাকার কথা— ২০২২ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বিএনপির ছোট-বড় প্রায় প্রতিটি কর্মসূচির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টারা সর্বোচ্চ কাভারেজ দিয়েছেন/ লাইভ করেছেন। ঢাকার বাহিরের সমাবেশ গুলোও সর্বোচ্চ কাভারেজ দিতেন মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টারা। রাত ২/৩ টার সময়ও বিএনপির নয়াপল্টনে অফিসে ছুটে যেতেন। মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টারদের সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় করতেন দিদার ভাই— এটি সবাই জানেন। আমার ফ্রেন্ডলিস্টে বিএনপি, ছাত্রদলসহ অঙ্গসংগঠনের অনেকেই আছেন; তারা সরাসরি সাক্ষী, সে সময় মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টাররা কী ভূমিকা রেখেছিলেন।
তিনি আরও লিখেন, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে বিএনপির এখন সুদিন। বহু কোকিল দলে ভিড়েছেন, মিডিয়া সেলেও এসেছেন অনেক ‘কুতুব। ধীরে ধীরে দলের কাছে গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছেন মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টাররা। আজ বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সাংবাদিকদের নিয়ে মতবিনিময় সভা করেছেন। সেখানে জুলাইয়ে ঘটে যাওয়া হত্যা মামলার আসামিদেরকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। অথচ দুর্দিনে পাশে থাকা কোনো মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার আমন্ত্রিত হননি।
এ ছাড়া, অপর এক ফেসবুক পোস্টে সাংবাদিকদের নিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মতবিনিময় নিয়ে যুগান্তরের লিড মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার ও মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (এমআরএ) এর সভাপতি ফখরুল ইসলাম লিখেন, দলটি হয়তো মনে করছেন মাল্টিমিডিয়ার কভারেজ আর তাদের প্রয়োজন নেই। ওকে ফাইন, আমরা মেসেজ পেয়ে গেলাম।
এ বিষয়ে জানতে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপদেষ্টা ও দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিনকে কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি এবং এবং টেক্সট পাঠালেও সাড়া দেননি।
এ ছাড়া, বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ডা. মওদুদ হোসাইন আলমগীর পাভেলও রিসিভ করেননি এবং এবং টেক্সট পাঠালেও সাড়া দেননি।