চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে গুলিতে জামাল উদ্দিন (৩৮) নামে এক যুবকের মৃত্যু সাধারণ কোনো ঘটনা নয়-এমন ইঙ্গিত মিলছে পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধানেই। একটি নির্জন সড়কে পরিকল্পিতভাবে ঘটানো এই খুনের চেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে আরেকটি বিষয়, পুলিশ ঘটনাটির খবর পাওয়ার আগেই নগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও পলাতক সন্ত্রাসী নুরুল আজিম রনি কীভাবে হত্যার খবর ফেসবুকে পোস্ট করলেন? উঠে এসেছে নানা প্রশ্ন, সন্দেহ এবং নতুন তদন্ত–কোণ।
শনিবার রাত সাড়ে ৭টা ১০ মিনিটের দিকে উপজেলার লেলাং ইউনিয়নের একটি নির্জন সড়কে স্থানীয় বাসিন্দারা গুলিবিদ্ধ অবস্থায় একজনকে পড়ে থাকতে দেখেন। দ্রুত কাছে গিয়ে তারা দেখেন, ব্যক্তিটির মাথা, বুকে ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলির চিহ্ন রয়েছে। এরপরই তারা থানায় খবর দেন। পুলিশ গিয়ে লাশটি উদ্ধার করে। পরে জানা যায়, নিহত ব্যক্তির নাম জামাল উদ্দিন, বয়স আটত্রিশ। এ সময় এলাকায় তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নির্জন সড়ক হওয়ার কারণে ঘটনাটি ঠিক কীভাবে ঘটেছে, তা কেউ বলতে পারেনি।
হাটহাজারী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজ জানান, ঘটনাটি স্পষ্টতই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে মনে হচ্ছে। তিনি বলেন, ঘটনা ঘটে রাত ৭টা ১০ মিনিটে। আমরা খবর পাই ৭টা ৪১ মিনিটে। সময়ের এই দীর্ঘ ব্যবধান তদন্তের প্রথম দিকেই গুরুত্ব পাচ্ছে।
ঘটনাস্থলটি জনবসতি থেকে খানিকটা দূরে। পুলিশ বলছে, হত্যাকারীরা জায়গাটি বেছে নিয়েছে সচেতনভাবেই। আশপাশে কোনো সিসিটিভি নেই, মানুষজনের চলাচলও কম। তাই তাঁকে হয়তো আগে থেকে ধরে এনে এখানে হত্যা করা হয়।
নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের পলাতক সন্ত্রাসী নুরুল আজিম রনি পোস্ট
কিন্তু পুলিশের তদন্তকে নতুন দিক দিয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি পোস্ট। আলোচিত সন্ত্রাসী রনি ঠিক রাত ৭টা ৪০ মিনিটে তার ফেসবুক আইডিতে একটি পোস্ট দেন। সেই পোস্টে তিনি লিখেন, চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে শিবির ক্যাডার জামাল দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত। তার বিরুদ্ধে ৫ আগস্টের পর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে।
অর্থাৎ তিনি পুলিশের খবর পাওয়ার আগেই হত্যার খবর জানালেন।
রনি পোস্টটি লিখতে ৩–৪ মিনিট সময় নিয়েছেন বলেই পুলিশ ধরে নিচ্ছে। সে হিসাবে রনি খবরটি পেয়েছেন আনুমানিক ৭টা ৩৬–৩৭ মিনিটের দিকে। অথচ তখনো পুলিশ ঘটনাটি জানতেই পারেনি। এই সময়ের অসঙ্গতিকে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন তদন্ত–সংশ্লিষ্টরা।
প্রশ্ন, রনির হাতে এত দ্রুত তথ্য গেল কীভাবে?
তদন্ত–সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, এখানে দুটো সম্ভাবনা রয়েছে। এক) ঘটনাস্থলে থাকা বা হত্যার পরিকল্পনায় যুক্ত কারও সঙ্গে রনির সরাসরি যোগাযোগ ছিল। দুই) রনি এমন একটি নেটওয়ার্কের অংশ, যেখানে খুন বা সহিংসতার ঘটনার তথ্য সঙ্গে-সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে।
এএসপি তারেক আজিজ বলেন, আমরা সব বিষয় তদন্ত করবো।
একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, রনির পোস্টের সময়, লেখা, তথ্যের উৎস—সব কিছুই তদন্ত করা হচ্ছে। কে তাকে জানালো, কেন জানালো, এত দ্রুত কীভাবে জানলো -সবই গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে রনির ফোনকল, মেসেঞ্জার বা অন্য ডিজিটাল মাধ্যমের তথ্য সংগ্রহের প্রস্তুতি নিচ্ছে পুলিশ।
তার বিরুদ্ধে ‘৫ আগস্টের পর কর্মকাণ্ডের অভিযোগ’ রনির পোস্টে দেওয়া এই বক্তব্যও পুলিশ যাচাই করছে।
এলাকাবাসী বলছেন, জামাল উদ্দিন অতীতে জামায়াত–শিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তিনি সক্রিয় কর্মী ছিলেন কি না, সেটি নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
ফটিকছড়ি উপজেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর ইসমাইল গনি আমার দেশকে বলেন, জামাল উদ্দিন নামে একজন জামায়াত কর্মী গুলিতে নিহত হওয়ার খবর শুনেছি, তবে খবর নিয়ে দেখতে হবে
তদন্তকারীরা বলছেন, রাজনৈতিক শত্রুতা বা ব্যক্তিগত বিরোধ বা ব্যবসায়িক হিসাব-নিকাশ, স্থানীয় আধিপত্য- সব দিকই তারা খতিয়ে দেখছে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পুলিশের তারেক আজিজ বলছেন, হত্যাকারীরা মোটামুটি নিশ্চিত ছিল যে তড়িঘড়ি করে কেউ সেখানে আসবে না। জায়গাটি অন্ধকার এবং সড়কের দুপাশে ঝোপঝাড়। কাছাকাছি কোনো বাড়ি নেই। পুলিশের সন্দেহ, খুনিরা জায়গাটি আগেই রেকি করে রেখেছিল। মরদেহ যেভাবে ফেলে রাখা হয়েছে, তাতে অপরাধীরা দ্রুত চলে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।