দায়িত্ব নেওয়ার ১৩ মাস পার হলেও এখনো আস্থা অর্জনের পরীক্ষায় রয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ১২ ফেব্রুয়ারি একই দিনে অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ ও গণভোট সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার ওপর নির্ভর করছে ইসির গ্রহণযোগ্যতা। জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিরপেক্ষভাবে আয়োজনে ইসির ওপর পুরোপুরি ভরসা রাখতে পারছে না কয়েকটি রাজনৈতিক দল। নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা বজায় রাখার বিষয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন তুলেছে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও ইসলামী আন্দোলন। তারা নির্বাচন কমিশনকে উদ্যোগী ও কঠোর হওয়ার জন্য বারবার পরামর্শ দিয়ে আসছে। তবে ইসির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনেনি বিএনপি।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের নভেম্বরে দায়িত্ব নেয় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন নেতৃত্বাধীন বর্তমান ইসি। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতির দিকে মনোযোগ দেয় কমিশন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ ও নতুন রাজনৈতিক দল নিবন্ধন প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। সীমানা পুনর্নির্ধারণ নিয়ে এবার ৩০টির বেশি রিট হয়েছে। তিনটি রিটের রায়ও হয়েছে। আদালতের রায়ে কয়েকটি আসনের সীমানায় ফের পরিবর্তন আনা হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রধান আইন আরপিও এবং রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালায় বারবার সংশোধনী এনেছে ইসি। এভাবে বারবার সংশোধনী আনায় ইসির সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও ইসির মধ্যে সমন্বয়হীনতা দেখা যাচ্ছে। নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসিকে আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আইন প্রয়োগে কঠোর হতে পারে তাহলে ইসির ওপর মানুষের আস্থা বাড়বে। নির্বাচনও ভালো হবে।
ইসি মনে করছে, তাদের কার্যক্রমে কিছুটা ভুলত্রুটি থাকলেও মোটাদাগে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে পেরেছে। এ কারণে কমিশনের ওপর কারও অনাস্থা নেই। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা যেভাবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন, তাতে প্রতীয়মান হচ্ছে ইসির ওপর তাদের আস্থা রয়েছে। আস্থার সংকট থাকলে এত দল ও প্রার্থী অংশ নিতেন না। তিনি বলেন, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের পর যখন নির্বাচনি প্রচার শুরু হবে তখনই স্বতঃস্ফূর্ত ও উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হবে বলে আমরা মনে করি। নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম মূল্যায়ন বিষয়ে জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ও সাবেক নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. বদিউল আলম মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, কমিশন মনে করে তাদের ওপর মানুষের আস্থা রয়েছে। আমরাও তা বিশ্বাস করতে চাই। কিন্তু তাদের কিছু কার্যক্রম তাদের গ্রহণযোগ্যতা ও তাদের ওপর আস্থা রাখার বিষয়ে প্রশ্নের উদ্রেক করে। তিনি বলেন, পাবনা-১ ও ২ আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ নিয়ে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল নিষ্পত্তির আগেই তা প্রত্যাহার করা এবং এ দুটি আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তিনি আরও বলেন, এছাড়াও তাদের আরও কিছু কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সংসদ নির্বাচনে নিয়ম ও আইন প্রয়োগে তাদের কঠোরতা দেখা যাচ্ছে না। সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। ওই শঙ্কা দূর করতে দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। মানুষের মধ্যে প্রশ্ন জাগে, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে ইসি কঠোর হতে পারবে কিনা?
দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়েও জনমনে উদ্বেগ আছে। নির্বাচনের তফশিল ঘোষণার পর পুলিশ ও প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের হাতে থাকলেও ইসির চাহিদা অনুযায়ী ওই দুটি বিভাগ পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু দেশে একের পর রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে। অনেকের মতে, আইনশৃঙ্খলার এই অবনতির দায়ও পরোক্ষভাবে ইসির ওপর পড়ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে-আইনশৃঙ্খলা ভালো রেখে এ ইসি সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন করতে পারবে কিনা। বিশ্লেষকদের মতে, এটিও ইসির অন্যতম আরেকটি পরীক্ষা।
সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনে নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড না থাকা ও প্রশাসনের পক্ষপাতের অভিযোগ করেছেন জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতারা। একই সঙ্গে কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তারা। এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া অভিযোগ করেন, নির্বাচন নিয়ে মানুষের মনে বেশি শঙ্কা রয়ে গেছে। নির্বাচনকেন্দ্রিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পর্যাপ্ত ও দৃশ্যমান উপস্থিতি নেই। তারা প্রশাসনকে নিরপেক্ষ রাখতে নির্বাচন কমিশনকে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
এরপর ইসিতে এসে প্রায় একই ধরনের অভিযোগ করেন জামায়াতে ইসলামীর নেতারা। দলটির নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের প্রশাসনের পক্ষপাত, একটি দলকে (বিএনপি) বিশেষ প্রাধান্য দেওয়া, নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি না হওয়াসহ বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ করেন। তিনি পক্ষপাতদুষ্ট ডিসি-এসপিদের সরিয়ে দেওয়া, নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি ও আচরণ বিধিমালা প্রতিপালনে নির্বাচন কমিশনকে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানান।
এ প্রসঙ্গে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল যুগান্তরকে বলেন, ইসিকে যে কেউ যে কোনো কথা বলতে পারেন। কারণ ইসি স্বাধীন। আমাদের অনেক প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। এরপরও আমরা ইসি নিয়ে কোনো অভিযোগ করিনি। বিএনপির শেকড় অনেক গভীরে। সেই শেকড়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কেউ যদি জনপ্রিয়তায় না পারে তাহলে সেই দায়টা ইসির ওপর চাপায়। এটা নির্বাচনকে বিঘ্নিত করার রাজনৈতিক একটা কৌশল।
নির্বাচন নিয়ে যে কোনো অভিযোগের বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া ইসির দায়িত্ব বলে মনে করেন ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী। সংসদ নির্বাচন ইসির আস্থা অর্জনের পরীক্ষা বলেও মন্তব্য করেন তিনি। জেসমিন টুলী যুগান্তরকে বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর মানুষের মধ্যে আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। এই কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর স্থানীয় সরকারের কোনো নির্বাচন ছাড়াই সরাসরি জাতীয় সংসদ ও গণভোট নির্বাচন করছে। এই দুটি নির্বাচনেই কমিশনের আস্থা অর্জনের বড় পরীক্ষা। ওই পরীক্ষায় কমিশন তখনই উত্তীর্ণ হবে, যখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে, আচরণবিধিমালা মানতে রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও ভোটারকে বাধ্য করতে পারবে। এর মধ্য দিয়ে কমিশনের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে। তিনি বলেন, পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়ায় ১৫ লাখের বেশি ভোটারের নিবন্ধন ইতিবাচক দিক।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ড. মো. আব্দুল আলীম মনে করেন, ইসিকে যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হবে নিরপেক্ষ এবং আইনানুগভাবে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচন কমিশন যেসব সিদ্ধান্ত নেবে তা হবে আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও পরিষ্কার। যাতে মানুষের কাছে ধারণা তৈরি হয় যে, নির্বাচন কমিশনের আত্মবিশ্বাস রয়েছে এবং তাদের সিদ্ধান্ত সঠিক। তাহলেই তারা মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারবে।