ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন দাখিল করা বেশির ভাগ প্রার্থীর স্ত্রীরা ধনসম্পদে স্বামীর চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। তাঁদের কারও কারও আয় স্বামীর চেয়ে ৫২ গুণ বেশি। অনেক স্ত্রী কোটিপতি। আসন্ন নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জমা দেওয়া মনোনয়নপত্রের হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ, নগদ অর্থ, ব্যাংক জমা এবং ব্যবসায়িক বিনিয়োগে অনেক প্রার্থীর স্ত্রীরা এগিয়ে রয়েছেন।
হলফনামায় বিশ্লেষণ করে আরও দেখা যায়, অনেকের স্ত্রীর নামে একাধিক ফ্ল্যাট, কৃষিজমি, ব্যবসায়িক শেয়ার ও সঞ্চয়পত্র রয়েছে, যা প্রার্থীর ঘোষিত নিজ সম্পদের চেয়ে বেশি। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্ত্রী কীভাবে কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হলেন, তার কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা মেলেনি অনেক প্রার্থীর হলফনামায়। সম্পদের এই বিশাল ফারাক নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মনেও তৈরি হয়েছে নানা কৌতূহল।
চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হুম্মাম কাদের চৌধুরীর স্ত্রী শ্যামানজার শ্যামার সম্পদের পরিমাণ হুম্মামের চেয়ে ৫২ গুণ বেশি। একই সঙ্গে তাঁর আয়ও স্বামীর তিন গুণ বেশি। এ ছাড়া হুম্মামের রাজধানীতে কোনো এপার্টমেন্ট না থাকলেও গুলশানে তাঁর স্ত্রীর প্রায় ৫ কোটি টাকা মূল্যের দুটি এপার্টমেন্ট রয়েছে। আয়কর রিটার্ন ২০২৫-২৬ অনুসারে হুম্মাম কাদেরের সম্পদের পরিমাণ ৮৪ লাখ ২০ হাজার টাকা। এদিকে তাঁর স্ত্রী শ্যামানজার শ্যামার সম্পদের পরিমাণ ৪৩ কোটি ২০ লাখ ১২ হাজার ৫১১ টাকা।
খুলনা-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জুর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ১০ লাখ টাকা। মঞ্জুর স্ত্রীর নামে ২ কোটি ৯০ লাখ ৫১ হাজার ৫৫৫ টাকার সম্পদ রয়েছে। খুলনা-২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলালের অস্থাবর ও স্থাবর সম্পদ রয়েছে ১ কোটি ৯৮ লাখ টাকার। স্ত্রীর নামে রয়েছে ৩ কোটি ৯৬ লাখ টাকার সম্পদ। কুমিল্লা-১১ (চৌদ্দগ্রাম) আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ও দলের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের চেয়ে তাঁর স্ত্রী ডা. হাবিবা চৌধুরীর সম্পদের পরিমাণ পাঁচ গুণ বেশি। পেশায় চিকিৎসক এই দম্পতির মধ্যে ডা. তাহেরের মোট সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। অন্যদিকে তার স্ত্রী ডা. হাবিবা চৌধুরীর সম্পদের পরিমাণ ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ (বাঞ্ছারামপুর) আসন থেকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি। হলফনামায় দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জোনায়েদ সাকির চেয়ে তাঁর স্ত্রী তাসলিমা আক্তারের সম্পদের পরিমাণ প্রায় আড়াই গুণ বেশি। সাকির সম্পদের পরিমাণ ৪৬ লাখ ৬২ হাজার ৬০২ টাকা। অন্যদিকে তাঁর স্ত্রীর নামে কৃষিজমি, একটি ফ্ল্যাট ও একটি দোকান রয়েছে। তাসলিমা আক্তার পেশায় একজন শিক্ষক ও আলোকচিত্রী, যার সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ২২ লাখ ৯৩ হাজার ৩০৪ টাকা। সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি শিশির মনিরের বার্ষিক আয় প্রায় ৫২ লাখ টাকা (৫১ লাখ ৬৩ হাজার ৪০৭ টাকা)। তবে স্ত্রী সুমাইয়া সাদিয়া রায়হানের বার্ষিক আয় তার আয়ের প্রায় দ্বিগুণ, ৮৯ লাখ ২৭ হাজার ৫১৫ টাকা। অ্যাডভোকেট শিশির মনিরের অস্থাবর সম্পদ পরিমাণ ৫১ লাখ টাকা। অন্যদিকে তাঁর স্ত্রীর নামে রয়েছে প্রায় ১ কোটি ৯৫ লাখ ৬০ হাজার টাকার অস্থাবর সম্পদ। কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম) বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট মো. ফজলুর রহমান। স্থাবর সম্পদের ক্ষেত্রে প্রার্থীর চেয়ে তাঁর স্ত্রী উম্মে কুলসুম বেগমের সম্পদের অর্জনকালীন মূল্য অনেক বেশি। রাজধানীর উত্তরার ৯ নম্বর সেক্টরে তাঁর স্ত্রীর নামে দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে, যার মূল্য দেখানো হয়েছে ২০ লাখ টাকা। এ ছাড়া স্ত্রীর নামে ১২ ও ৫৫ শতকের দুটি অকৃষিজমি রয়েছে। অন্যদিকে ফজলুর রহমানের নিজের নামে কিশোরগঞ্জের ইটনায় একটি নির্মাণাধীন দোতলা ভবন রয়েছে এবং পৈতৃক সূত্রে তিনি পাঁচ একর কৃষিজমির মালিক।
সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও বিএনপি নেতা আরিফুল হক চৌধুরীর দাখিল করা হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৮ সালে আরিফুল হক চৌধুরীর বার্ষিক আয় ছিল ৭ লাখ ৫৮ হাজার টাকা, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১ লাখ ৮৩ হাজার ২৩৬ টাকায়। তাঁর স্ত্রী সামা হক চৌধুরীর সাত বছর আগে কোনো আয়ের উৎস ছিল না। বর্তমানে ব্যবসা খাত থেকে তাঁর বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে ২৪ লাখ ৭০ হাজার ৭৫৯ টাকা। সুনামগঞ্জ-১ আসনের ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী ডা. রফিক চৌধুরী সাড়ে ১২ কোটি টাকা দেখিয়েছেন হলফনামায়। আর তাঁর স্ত্রী হোসনে আরা বেগমের রয়েছে ২৫ কোটি টাকার অস্থাবর সম্পত্তি এবং ৫ কোটি টাকার স্থাবর সম্পত্তি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ (কসবা-আখাউড়া) আসনে বিএনপি প্রার্থী মুশফিকুর রহমান। স্ত্রীর মোট সম্পদ তাঁর নিজের সম্পদের চেয়ে প্রায় সাড়ে ছয় গুণ বেশি। হলফনামা অনুযায়ী, সাবেক এমপি ও অবসরপ্রাপ্ত সচিব মুশফিকুর রহমানের মোট সম্পদের পরিমাণ ৩ কোটি ৫০ লাখ ৭৫ হাজার ৪৩০ টাকা। অন্যদিকে তাঁর স্ত্রী জেবুন্নেছা এম. রহমানের মোট অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ২২ কোটি ৮৩ লাখ ২৭ হাজার ৯৫ টাকা। লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর ও সদর উপজেলার আংশিক) আসনে বিএনপির প্রার্থী আবুল খায়ের ভূঁইয়া। তাঁর স্থাবর, অস্থাবর অর্জনকালীন মোট সম্পদ রয়েছে ৬৬ লাখ ৬ হাজার টাকার। তবে পেশায় গৃহিণী ও ব্যবসায়ী স্ত্রী রওশন আরা বেগমের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ রয়েছে ১ কোটি ৩৭ লাখ ৩১ হাজার টাকার। সে হিসেবে তাঁর চেয়ে স্ত্রীর সম্পদ দ্বিগুণের বেশি। রিজিয়া আকবর খোন্দকার, চট্টগ্রাম-৬ আসনের বিএনপি প্রার্থী গোলাম আকবর খোন্দকারের স্ত্রী। আয়ের ঘরে ‘প্রযোজ্য নহে’ লেখা হলেও তাঁর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১৬ কোটি টাকা।
পারভীন মাহমুদ, চট্টগ্রাম-৫ আসনের প্রার্থী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদের স্ত্রী। আয় নেই, কিন্তু সম্পদ ১৫ কোটি টাকা। নাজনীন নিজাম, চট্টগ্রাম-১৩ আনোয়ারা আসনের বিএনপি প্রার্থী সরওয়ার জামাল নিজামের স্ত্রী। আয় নেই, সম্পদ ৮ কোটি ২৪ লাখ টাকা। তাহেরা আলম, চট্টগ্রাম-১১ আসনের বিএনপি প্রার্থী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর স্ত্রী। সম্পদের পরিমাণ ৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা। সিলেট-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী এমএ মালিক ও স্ত্রী উভয়ই কোটিপতি। তবে মালিকের চেয়ে তাঁর যুক্তরাজ্য প্রবাসী স্ত্রী দিলারা মালিকের সম্পদের পরিমাণ অনেক বেশি। মো. আবদুল মালিকের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা। অপরদিকে স্ত্রীর নামে রয়েছে মোট ১০ কোটি ৬৫ লাখ টাকার সম্পদ। দিলারা মালিকের নামে রয়েছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা।
(প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন বাংলাদেশ প্রতিদিনের সংশ্লিষ্ট জেলা প্রতিনিধিরা)