Image description

ব্যবসা ও ভ্রমণের উদ্দেশ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যেতে জামানত দিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রে ভিসার অপব্যবহার রোধে নতুন এ ব্যবস্থা চালু করেছে স্টেট ডিপার্টমেন্ট। বাংলাদেশসহ ৩৮টি দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রের বি১ ও বি২ ক্যাটাগরিতে ভিসা আবেদনের ক্ষেত্রে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত জামানত দিতে হবে। বাংলাদেশের জন্য আগামী ২১ জানুয়ারি থেকে এ নিয়ম প্রযোজ্য হবে। মার্কিন নতুন এই নিয়মে কেউ কেউ সংশয় প্রকাশ করলেও যারা সত্যিকার অর্থে ভ্রমণ কিংবা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ভিসা নেবেন, তাদের জন্য এটি উৎসাহমূলক বলে করেন সংশ্লিষ্টরা। তারা মনে করছেন, ব্যবসায়িক কিংবা ভ্রমণ ভিসা নিয়ে ওই দেশে থেকে যাওয়ার প্রবণতা বন্ধ হবে।

এক দেশের ভ্রমণ ভিসা নিয়ে তৃতীয় দেশে যাওয়া, কিংবা সে দেশে দীর্ঘ সময় অবস্থান করাকে ভিসার অপব্যবহার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এ জন্য বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশিদের ভিসা পেতে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। একই কারণে বেশ কিছু দেশ ভিসা দেওয়াও বন্ধ রেখেছে। অভিবাসী নিয়ে কিছু দিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর অবস্থানে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে আসছিল। এর মধ্যে দুই ক্যাটাগরির ভিসার ক্ষেত্রে ঘোষণা করলো নতুন এই স্কিম।

গত বছরের ৫ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রেজিস্টারে প্রকাশিত পররাষ্ট্র দফতরের অস্থায়ী চূড়ান্ত নীতিমালা অনুযায়ী, এ কর্মসূচি এমন দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য করা হবে, যেসব দেশের ভিসাধারীদের নির্ধারিত মেয়াদ শেষে যুক্তরাষ্ট্রে থাকার (ওভার স্টে) হার ঐতিহাসিকভাবে বেশি। তবে ভ্রমণকারীরা জামানতের শর্ত মেনে চললে জমা করা অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। গত ২০ আগস্ট থেকে এই কার্যক্রমের পাইলটিং শুরু হয়। প্রথমে দুটি দেশ দিয়ে শুরু হলেও বুধবার (৭ জানুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্র এই তালিকায় আরও ৩৬টি দেশ যুক্ত করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শুধু নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের নাম তালিকায় আছে।

ওভার স্টে হার সবচেয়ে বেশি হলেও নাম নেই মিয়ানমারের

মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটির কাছে বিদেশি নাগরিকদের প্রবেশ এবং প্রস্থানের তথ্য থাকে। ২০২৪ সালে সেই তথ্য অনুযায়ী, ৩৮ হাজার ৫৯০ জন বাংলাদেশি নাগরিকের বি১ /বি২ ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করার কথা ছিল। কিন্তু হোমল্যান্ড সিকিউরিটি দেখতে পায়, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ৫১ জন অন্য দেশে চলে গেছেন, আর ২ হাজার ১৬২ জন অতিরিক্ত মেয়াদে অবস্থান করছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশিদের ওভার স্টে’র হার ৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। তবে পুরো তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে—বাংলাদেশের চেয়ে ওভার স্টে’র হার বেশি—এমন অনেক দেশকে তালিকার বাইরে রাখা হয়েছে। যেমন- মধ্য আফ্রিকার দেশ নিরক্ষীয় গিনির ওভার স্টে হার ২১ দশমিক ৬৮ শতাংশ। কিন্তু বন্ড দিতে হবে এমন দেশের তালিকায় দেশটির নাম নেই। একইভাবে আফগানিস্তান, ইরিত্রিয়া, ইথিওপিয়া, জর্জিয়া, ঘানা, হাইতি, কেনিয়া, লাওস, লাইবেরিয়া, মাইক্রোনেশিয়া, নিগার, পালাউ, সিয়েরা লিওন, সোমালিয়া, সুদান, সুরিনাম, সোয়াজিল্যান্ড, সিরিয়া, ইয়েমেনের ওভার স্টে হার বাংলাদেশের কয়েকগুণ বেশি হলেও তালিকায় নাম নেই। সবচেয়ে বেশি ওভার স্টে হার মিয়ানমারের হলেও ভিসা বন্ডের তালিকায় দেশটির নাম অনুপস্থিত।

যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা দেশের  ভিসা নিয়ে পরামর্শকের কাজ করেন আইনজীবী তানভীর সিদ্দিকী। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘যেসব দেশ থেকে ভ্রমণকারীরা ইমিগ্রেশন অনুমোদিত নির্ধারিত সময়ের বাইরে অতিরিক্ত সময় অবস্থান করেন, রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেন, কিংবা ভিসার শর্ত  লঙ্ঘন করেন—মূলত তাদেরই ভিসা আবেদনে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। যদি কোনও কারণে তারা ভিসার শর্ত লঙ্ঘন করেন, তাহলে তারা ভিসা বন্ডের টাকা আর ফেরত পাবেন না।’’ তিনি বলেন, ‘‘এই পলিসির আরেকটা দিক হচ্ছে—যারা প্রকৃত ভ্রমণকারী তাদের উৎসাহিত করা। সে জন্য যারা এখন ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তারা বুঝে-শুনে করবেন। তাদের কী পরিমাণ অর্থ বন্ড হিসেবে দিতে হবে, সেটা ভিসা অফিসার নির্ধারণ করবেন। নিয়ম অনুযায়ী সে দেশ ত্যাগ করলে বন্ডের অর্থ ফেরত পাবেন। এতে অবৈধ অভিবাসী কমবে এবং অতিরিক্ত সময় অবস্থান যারা করবেন, তারাই  ক্ষতিগ্রস্ত বেশি হবে।’’

তানভীর আরও বলেন, ‘‘এই ডিপোজিট প্রত্যেকের জন্য আলাদা-আলাদা। ফ্যামিলি আবেদনের ক্ষেত্রে সবার জন্য আলাদা ডিপোজিট দিতে হবে বা দিতে হতে পারে। পরিবারের প্রত্যেক আবেদনকারীকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হবে, স্বামী-স্ত্রী বা পরিবারের একাধিক সদস্য থাকলে, প্রত্যেকের জন্য আলাদা ডিপোজিট চাওয়া হতে পারে। ভিসা অফিসার আবেদনকারীর প্রোফাইল অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবেন, কাকে কত ভিসা-বন্ড দিতে হবে। ভিসা ইন্টারভিউয়ের সময় ভিসা অফিসার জানিয়ে দেবেন কত ডলার ডিপোজিট করতে হবে।’’

ভিসা-বন্ড আসলে কী

নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাধারী অনুমোদিত মেয়াদের চেয়ে বেশি সময় যুক্তরাষ্ট্রে থাকলে, সেটি ভিসা ওভার স্টে বলে গণ্য হয়। এটি রোধ করতে নতুন এই জামানত ব্যবস্থা চালু করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর বলছে—তালিকায় থাকা দেশগুলোর মধ্যে কোনও একটি পাসপোর্টে যদি মার্কিন ভিসা বি১ ও বি ২ প্রাপ্তির সম্ভাবনা থাকে, তাকে অবশ্যই এই জামানত দিতে হবে। ভিসা ইন্টারভিউয়ের সময় এই অর্থের পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে।  আবেদনকারীকে অবশ্যই হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের ফরম ‘আই-৩৫২’ জমা দিতে হবে। আবেদনকারীদের অবশ্যই ট্রেজারি বিভাগের অনলাইন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম ‘Pay.gov’-এর মাধ্যমে বন্ডের শর্তাবলির সঙ্গে সম্মত হতে হবে এবং অনলাইনে শুধু ‘Pay.gov’-এর মাধ্যমে অর্থ জমা দেওয়া যাবে।

নিয়ম অনুযায়ী কনস্যুলার অফিসার আবেদনকারীকে নির্দেশ দেওয়ার পরেই আবেদনকারীদের বন্ড পোস্ট করার জন্য ফরম ‘আই-৩৫২’ জমা দিতে হবে। আবেদনকারীরা ‘Pay.gov’-এর মাধ্যমে অর্থ দিতে একটি সরাসরি লিঙ্ক পাবেন। তবে এই জামানত ভিসা ইস্যুর গ্যারান্টি দেয় না। কনস্যুলার অফিসারের নির্দেশনা ছাড়া কেউ ফি পরিশোধ করলে ফি ফেরত দেওয়া হবে না।

বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যে ভ্রমণ করেছেন এমন কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পলিসি এমনিতেও অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশ কঠিন। ভিসা বন্ড ভ্রমণকারীদের জন্য কিছুটা কঠিন হয়ে উঠবে।

এমন একজন ভ্রমণকারী সালাহউদ্দিন সোহেল বলেন, ‘‘বাংলাদেশিদের জন্য এখন অনেক দেশেই ভিসা-প্রাপ্তি বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পলিসি কঠিন, অনেকেই প্রথমবার আবেদন করে পান না, আবার কেউ কেউ কয়েকবার চেষ্টার পর পান। যারা বিজনেস ভিসায় যাবেন তাদের জন্য যতটা সহজ, যারা ভ্রমণ ভিসায় যাবেন, তাদের জন্য কিছুটা কঠিন। কারণ, আমার মতো অনেকেই বাজেট ট্রাভেলার আছেন, যারা বিভিন্ন দেশ বাজেট অনুযায়ী ঘোরেন। তাদের জন্য এত টাকা ডিপোজিট রাখা কষ্টকর। দেখা যাচ্ছে আমার যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ খরচ ২ লাখ টাকাও না, কিন্তু আমাকে মিনিমাম ৬ লাখ টাকারও বেশি ডিপোজিট করতে হচ্ছে।’’

বন্ড ভিসার পেমেন্ট নিয়ে আছে প্রশ্ন

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী একটি ডুয়েল কারেন্সি ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডে ৩০০ ডলারের বেশি একবারে ট্রানজেকশন করা যায় না। যেসব ক্ষেত্রে ৩০০ ডলারের বেশি ট্রানজেকশন করার প্রয়োজন হয়, সেসব ক্ষেত্রে কার্ড ইস্যুকারী ব্যাংক থেকে আগাম অনুমতি নিতে হয়। এ ক্ষেত্রে আগে আন্তর্জাতিক প্লেনের টিকিট কাটার অনুমতি ব্যাংক না দিলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের টিকিট কেনার জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে ৫ হাজার ডলার কীভাবে ট্রানজেকশন করা যাবে—সেই বিষয়টি এখনও পরিষ্কার বলতে পারছেন না কেউই। মার্কিন সংস্থার পেমেন্ট তিনভাবে নেওয়া হয়। পেপাল, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ট্রান্সফার এবং ডেবিট কার্ড। ক্রেডিট কার্ডে পেমেন্ট করার সুযোগ নেই।   

পেমেন্টের টাকা কারা ফেরত পাবেন 

মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ ও প্রস্থানের সময় ভিসাধারীদের তথ্য রেকর্ড করে। যদি ভিসার মেয়াদ থাকাকালীন সময়ের মধ্যে, কিংবা মেয়াদের শেষ দিন কেউ প্রস্থান করেন, তাহলে তার জামানতের অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। এ ছাড়া ভিসার মেয়াদের মধ্যে ভ্রমণ না করলে, অথবা ভিসা আবেদনের পর প্রত্যাখ্যান করা হলে, জামানতের অর্থ ফেরত দেবে যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়া ভিসার মেয়াদের পর যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করলে, অথবা আশ্রয় প্রার্থনা করলে জামানতের শর্ত ভঙ্গ বলে বিবেচনা করা হবে।

তবে নিয়ম অনুযায়ী কনস্যুলার অফিসার আবেদনকারীকে নির্দেশ দেওয়ার পরেই আবেদনকারীদের বন্ড পোস্ট করার জন্য ফরম ‘আই-৩৫২’ জমা দিতে হবে। আবেদনকারীরা ‘Pay.gov’-এর মাধ্যমে অর্থ দিতে একটি সরাসরি লিঙ্ক পাবেন। তবে এই জামানত ভিসা ইস্যুর গ্যারান্টি দেয় না। কনস্যুলার অফিসারের নির্দেশনা ছাড়া কেউ ফি পরিশোধ করলে ফি ফেরত দেওয়া হবে না।

প্রবেশ ও প্রস্থানে ব্যবহার করা যাবে তিনটি বিমানবন্দর 

জামানতের শর্ত হিসেবে, ভিসা বন্ড পোস্ট করা সব ভিসা হোল্ডারদের অবশ্যই তালিকাভুক্ত নির্ধারিত পোর্ট অব এন্ট্রি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ এবং প্রস্থান করতে হবে। তা না হলে এন্ট্রি বা এক্সিট রিফিউজ হতে পারে। তিনটি পোর্ট অব এন্ট্রি হলা—বোস্টন লোগান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (বিওএস), জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (জেএফকে), ওয়াশিংটন ডুলেস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (আইএডি)।

মার্কিন ভিসা বন্ড নিয়ে ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু এখনও জানায়নি। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, যেকোনও দেশের ভিসা পলিসি নিয়ে নেগোসিয়েশনের সুযোগ কম। ভিসা বন্ধ থাকলে চালু করার বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুধু অনুরোধ করতে পারে।