Image description

বিএনপি’র চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শোক ও ঢাকায় তার জানাজায় এস জয়শঙ্করের উপস্থিতির মাধ্যমে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সম্ভাব্য সরকারের প্রতি ভারত নতুন ধরনের বার্তা দিচ্ছে। অনলাইন ফরেন পলিসিতে ‘ভারত-বাংলাদেশ উত্তেজনা চরমে’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ‘ভারত ও বাংলাদেশ কি সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে পারবে?’- উপ-শিরোনামে এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এসব কথা লিখেছেন আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান। এর আগে তিনি উইলসন সেন্টারে সাউথ এশিয়া ইনস্টিটিউটের পরিচালক ছিলেন। তিনি দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছেন ওই প্রতিবেদনে। এতে বাংলাদেশ অংশে লিখেছেন, সোমবার বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ক্রিকেট লিগ আইপিএলের (ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ) সম্প্রচার নিষিদ্ধ করেছে। কলকাতা নাইট রাইডার্স দল থেকে বাংলাদেশি তারকা ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে সরিয়ে দেয়ার পর এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। মাত্র গত মাসেই দলে যোগ দিয়েছিলেন মোস্তাফিজ।  তাকে সরিয়ে দেয়ার নেপথ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো কারণ জানানো হয়নি, তবে এটি নাকি ভারতের মূল ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণ সংস্থার নির্দেশে করা হয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল ঘোষণা দিয়েছে, আসন্ন টি-২০ বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো ভারতে খেলতে যাবে না তারা। এ অঞ্চলের মানুষ ক্রিকেট-পাগল। উল্লেখযোগ্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এই খেলা এখানে সাধারণত ঐক্যবদ্ধ বন্ধন তৈরি করে। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের টানাপড়েনের গভীরতা কতোটা তা সাম্প্রতিক এসব ঘটনা প্রমাণ করে। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণ-আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সম্পর্কের এই অবনতির শুরু। তবে ১২ই ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসার প্রাক্কালে এই টানাপড়েন এখন বিশেষভাবে সংকটময় অবস্থায় পৌঁছেছে। একের সঙ্গে অন্যের এই উত্তেজনার পেছনে রয়েছে উভয় দেশের ভেতরকার কিছু মৌলিক ধারণা। বাংলাদেশিরা বিশ্বাস করেন, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে হস্তক্ষেপ করে আসছে ভারত। অন্যদিকে অনেক ভারতীয় মনে করেন, শেখ হাসিনার পতনের পর ইসলামী কট্টরপন্থি ও ভারতের বিরোধী শক্তিগুলোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ এই দৃষ্টিভঙ্গিগুলোকে আরও কঠোর করেছে। ভারত হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে। তাকে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেয়ার অনুমোদন দিয়েছে এবং ঢাকার দাবির পরও তাকে হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে- যা ঢাকার অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করেছে বা বার বার তারা এ বিষয়ে তাগিদ দিচ্ছে। ২০২৪ সালের প্রতিবাদ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে কয়েক শত মানুষ নিহত হওয়ার দায়ে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তার বিরুদ্ধে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে নভেম্বরে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে বাংলাদেশি একটি আদালত।

গত মাসে বাংলাদেশে একজন গার্মেন্টস কর্মী দীপু কুমার দাসকে উত্তেজিত জনতা পিটিয়ে হত্যার পর তার শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ ধরনের ঘটনায় বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে ভারতে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের বেশ কিছু বিশিষ্ট অধিকারকর্মী সাম্প্রতিক সময়ে দিল্লির বিরুদ্ধে সমালোচনা জোরদার করেছেন। তাদের একজন শরীফ ওসমান হাদি। তাকে গত মাসে গুলি করা হয়। পরে মারা যান তিনি। পুলিশের দাবি, এই হত্যায় জড়িত দুই সন্দেহভাজন পালিয়ে ভারতে চলে গেছে। তবে তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেয়া হয়নি। তবুও আসন্ন নির্বাচন একটি সম্ভাব্য ‘সমঝোতার পথ’ খুলে দিতে পারে।

ভারত জানিয়েছে, নির্বাচিত যেকোনো সরকারের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত তারা। সম্ভাব্য বিজয়ী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) টানাপড়েনের সম্পর্ক রয়েছে ভারতের সঙ্গে। তবে ইসলামপন্থি দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের জোট ভেঙে বেরিয়ে এসেছে তারা। এরপর দলটি এখন দিল্লির কাছে তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। বিএনপি’র চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া গত মাসে মৃত্যুবরণ করার পর তার ছেলে তারেক রহমানকে উষ্ণ সমবেদনা বার্তা পাঠিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ঢাকায় খালেদা জিয়ার জানাজায়ও যোগ দেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর। এতে বোঝা যায়, বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সম্ভাব্য সরকারের প্রতি ভারত নতুন ধরনের বার্তা দিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন তারেক রহমান। তিনি বাংলাদেশের আগামী প্রধানমন্ত্রীও হতে পারেন। তিনি জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছেন। এটা হতে পারে পরোক্ষভাবে ভারতের প্রতি ইঙ্গিত যে,  তিনি সরকার গঠন করলে তার সরকার দেশের সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় পদক্ষেপ নেবে।

তবে প্রশ্ন হলো, দেশের ভেতরের রাজনৈতিক বাস্তবতা কি দুই দেশের জন্যই আপসের সুযোগ সীমিত করে দেবে? বাংলাদেশের প্রভাবশালী ইসলামপন্থি দলগুলো ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততার বিরোধী। এটা ঢাকায় নতুন সরকারের রাজনৈতিক পরিসরকে সংকুচিত করতে পারে। ভারতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্য এই ঝুঁকি তুলনামূলক কম। কারণ তিনি দেশে এখনো অত্যন্ত জনপ্রিয়।

বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকতে পারে, তবে তা কেবল ‘সমঅধিকারভিত্তিক’ হতে হবে। অক্টোবরে তারেক রহমান বলেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে ঠাণ্ডা- এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বাংলাদেশিরা। তাই আমাকে আমার দেশের মানুষের পাশেই দাঁড়াতে হবে।

অতএব, বাংলাদেশের নির্বাচন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি সুযোগ এনে দিলেও, সেই পথ তৈরি হবে কেবল তখনই, যদি উভয় দেশই রাজনৈতিক ঝুঁকি নেয়ার সাহস দেখায়।