Image description
ভোগান্তিতে গ্রাহক

দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজারে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। ব্যবসায়ীরা সারা দেশে কারসাজি করে এলপিজি’র দাম বাড়িয়েছে। এলপিজি’র সংকট দেখিয়ে গ্রাহকদের জিম্মি করে কোথাও কোথাও দ্বিগুণ দামে সিলিন্ডার গ্যাস বিক্রি করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা তাদের কমিশন বৃদ্ধিসহ ছয় দাবিতে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট ডাকলেও বিইআরসি’র সঙ্গে গতকাল বৈঠক শেষে তা প্রত্যাহার করেছেন।

এদিকে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাইপলাইনের গ্যাস সংকট থাকায় বহু পরিবার এলপিজি গ্যাস ব্যবহার করে। অনেক এলাকায় এলপিজিই একমাত্র রান্নার জ্বালানি। অনেক এলাকায় এলপিজি গ্যাস বিক্রি বন্ধ থাকার ফলে ভোক্তারা বিপাকে পড়ে যান।
সরজমিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার পাইকারি ও খুচরা এলপিজি গ্যাসের দোকান ঘুরে দেখা যায়, দোকানগুলোতে খালি গ্যাসের সিলিন্ডারে ঠাঁসা। বেশির ভাগ দোকানে ক্রেতারা মোবাইলে কল করেই অর্ডার করতেন গ্যাসের। কিছু কিছু এলপি গ্যাসের দোকান বন্ধ পাওয়া গেছে। তেজগাঁও শিল্প এলাকার একটি খুচরা এলপিজি গ্যাস বিক্রির দোকানে গিয়ে দেখা যায়, দোকানের ক্রেতাদের উদ্দেশ্যে একটি পোস্টারে  লেখা-‘বর্তমানে দেশের গ্যাস কোম্পানিগুলো গ্যাস সংকটের কারণে নিয়মিত চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ দিতে পারছে না, এতে আপনারা ফেরত যাওয়ায় আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত’। 

খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, ডিলার তাদের গ্যাস দিচ্ছেন না। ফলে অনেক খালি গ্যাসের সিলিন্ডার দোকানে জমা পড়ে আছে, কিন্তু নতুন করে রিফিল করে সিলিন্ডার দেয়া যাচ্ছে না। তাই ক্রেতা আসলে তাদের ফেরত দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে, ডিলাররা বলছেন, সংশ্লিষ্ট কোম্পানি থেকে মাসখানেক ধরেই খুব অল্প পরিমাণ সরবরাহ দিচ্ছেন গ্যাসের। ফলে, মার্কেটে চাহিদা মোতাবেক ছাড়া যাচ্ছে না সিলিন্ডার। অল্প পরিমাণ সরবরাহ পেলে বিক্রি করতে হয় চড়া দামে। 
মোহাম্মদ হেলাল মোল্লা চারদিন হলো নতুন দোকান দিয়েছেন মগবাজার এলাকায়। এই চারদিনে তিনি সিলিন্ডারের গ্যাস কিনতে চেয়েও পারেননি। হেলাল বলেন, লাইনের গ্যাস নেই। এখন বাসা থেকে চা বানিয়ে এনে বিক্রি করতে হচ্ছে। দোকানের জন্য সিলিন্ডার কিনতে গিয়ে কোথাও পেলাম না। ২৫০০ টাকার উপরে দাম চলে গেছে। এরপরও পাওয়া যাচ্ছে না। মিরপুর-১০ নম্বর এলাকার বাসিন্দা গৃহিণী নাজমা খাতুন বলেন, তাদের পরিবার সম্পূর্ণভাবে এলপিজি গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। হঠাৎ করে যদি গ্যাস পাওয়া বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে রান্না করা বড় সমস্যায় পরিণত হবে। বাসায় শিশু ও বয়স্ক মানুষ রয়েছে। বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেই। বাজারে সিলিন্ডার না পেলে দৈনন্দিন জীবন চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।  মগবাজারের লাফাজ গ্যাসের ডিলার সেলিম বলেন, কোম্পানি থেকে জানানো হয়েছে, পার্কিং নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশে অনেকগুলো জাহাজ আসছে না। অর্থাৎ গ্যাস আমদানি করা যাচ্ছে না।

তেজগাঁও গভ:হকার্স মার্কেটের খুচরা এলপিজি বিক্রেতা মোহাম্মদ ইয়াসিন বলেন, ২৭টি কোম্পানির মধ্যে আমার দেখা ওমেরা, টোটাল কোম্পানি গ্যাস দিচ্ছে খুব সামান্য পরিমাণে। তাও ওমেরার গাড়ি দু’দিন আগে ঢাকার বাইরে থেকে ছাড়ছে শুনেছি, এখনো ঢাকায় এসে পৌঁছেনি।  আমার দোকানে ৭০-১০০ পিস করে সিলিন্ডার বিক্রি করি। সর্বশেষ বুধবার ১০-১২টা পেয়েছি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি টিসিবি’র গাড়ির মতো, পণ্য শেষ হয়ে যাচ্ছে কিন্তু লাইন শেষ হচ্ছে না। তেজগাঁও এলাকার ফ্রেশ এলপিজি গ্যাসের ডিলার দীপক বলেন, গ্যাস নেই, ক্রেতাদের ফেরত পাঠানো ছাড়া আমাদেরও উপায় নাই।  ইব্রাহিমপুর এলাকার সিলিন্ডারের গ্যাস ব্যবসায়ী আরাফাত বলেন, ১২ কেজি এলপি গ্যাস ২১০০ থেকে ২৩০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। 

ধর্মঘট  প্রত্যাহার: এদিকে, এলপিজি ব‍্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড সারা দেশে এলপিজি বিপণন ও সরবরাহে ঘোষিত অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট  প্রত্যাহার করেছে। গতকাল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে অংশ নেয়ার পর সংগঠনের সভাপতি মো. সেলিম খান সাংবাদিকদের এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। বৈঠকে নেতারা তিনটি দাবি উত্থাপন করেন সারা দেশে চলমান প্রশাসনিক অভিযান বন্ধ করা, বিতরণকারী ও খুচরা বিক্রেতাদের চার্জ বৃদ্ধি করা এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা। চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ আশ্বস্ত করেছেন যে, চলমান অভিযানের বিষয়ে তারা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলবেন এবং চার্জ বাড়াতে আইনগত পদক্ষেপ নেবেন। বলেন, এলপিজি অপারেটরদের সংগঠন জানিয়েছে যে, জাহাজ সংকটের মধ্যেও পণ্য আমদানির জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ফলে আগামী সপ্তাহের মধ্যে সরবরাহের সংকট কিছুটা স্বাভাবিক হতে পারে। তবে সেলিম খান বলেন, অপারেটরদের কাছ থেকে সিলিন্ডার কিনতেই তাদের ১ হাজার ৩০০ টাকার বেশি দিতে হচ্ছে। তাই ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার দেড় হাজার টাকার কম দামে বিক্রি করা সম্ভব নয়। এদিকে বিইআরসি চেয়ারম্যান বলেন, জানুয়ারি মাসের জন্য নির্ধারিত ১ হাজার ৩০৬ টাকার বেশি দামে পণ্য বিক্রির কোনো যুক্তি তিনি দেখছেন না।

সংকট নিরসনে নানা উদ্যোগ: এলপিজি ক্রমবর্ধমান সংকট ও মূল্য অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে আমদানি ও স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট ও ট্যাক্স পুনঃনির্ধারণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। একইসঙ্গে এলপি গ্যাস আমদানির ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণ ও এলসি (ঋণপত্র) খোলার প্রক্রিয়া সহজীকরণেরও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। গতকাল জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এলপি গ্যাসকে ‘গ্রিনফুয়েল’ হিসেবে বিবেচনা করে কর কাঠামো পুনর্বিন্যাসের বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দিয়েছেন। একইদিনে বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহে এলপিজি আমদানির জন্য ঋণপ্রাপ্তি ও এলসি খোলার আবেদনসমূহ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে চিঠি দিয়েছেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।

এনবিআরকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, দেশে ব্যবহৃত মোট এলপি গ্যাসের প্রায় ৯৮ শতাংশই বেসরকারি খাতের মাধ্যমে আমদানি করা হয়, যা শিল্পখাত ও গৃহস্থালি উভয় ক্ষেত্রেই ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সাধারণত শীত মৌসুমে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি দেশে পাইপলাইনের প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ হ্রাস পাওয়ায় এলপি গ্যাসের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। চলতি শীত মৌসুমেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। ফলে বাজারে তীব্র সংকট সৃষ্টি হয়েছে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ ভোক্তার ওপর। সাম্প্রতিক সময়ে এ সংকট নিয়ে এলপিজি অপারেটরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) নেতৃবৃন্দের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক সভায় এলপি গ্যাসের আমদানি ও স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে বিদ্যমান ভ্যাট ও ট্যাক্স কাঠামো পুনঃনির্ধারণের প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। সভায় বাজার স্থিতিশীল রাখা ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। 

সেখানে বলা হয়, এলপি গ্যাসের আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট অব্যাহতি প্রত্যাহার করে ১০ শতাংশ ভ্যাট আরোপ এবং স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে বিদ্যমান ৭.৫ শতাংশ ভ্যাট, ব্যবসায়ী পর্যায়ের ভ্যাট ও আগাম কর অব্যাহতি প্রদানের প্রস্তাব সময়োপযোগী। তবে, এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগে ভোক্তা পর্যায়ে এলপি গ্যাসের দাম কতোটা কমবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণের ওপরও জোর দেয়া হয়। এজন্য জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগকে সমন্বিতভাবে পর্যালোচনার নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। উপদেষ্টা পরিষদের ওই সিদ্ধান্ত পরবর্তীতে লোয়াবের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সভায় উপস্থাপন করা হলে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এ বিষয়ে একমত পোষণ করে। তবে সভায় উপস্থিত সদস্যরা আমদানি পর্যায়ে প্রস্তাবিত ১০ শতাংশ ভ্যাটের পরিবর্তে শূন্য শতাংশ ভ্যাট আরোপের দাবি জানান। যদিও সংশ্লিষ্ট স্মারক পর্যালোচনায় দেখা যায়, উপদেষ্টা পরিষদের আলোচনার সঙ্গে লোয়াব পূর্বে নীতিগতভাবে একমত ছিল।

ব্যবসায়ীদের কারসাজি: খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা কারসাজি করে এলপিজি গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। দেশের সিলিন্ডার গ্যাসের ব্যবসার প্রায় ৯৮ শতাংশই বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে। ৬ই জানুয়ারি সচিবালয়ে সরকারি ক্রয় ও অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। কারসাজির মাধ্যমে এলপিজি’র দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়েছে, যার সঙ্গে খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা জড়িত বলে জানান উপদেষ্টা। তিনি আরও বলেন, জেলা প্রশাসন ও পুলিশের মাধ্যমে সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে, খুব শিগগিরই বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। উপদেষ্টা আরও জানান, কিছু জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় এলপিজি পরিবহনে সাময়িক জটিলতা দেখা দিয়েছে। সেটি নিরসনে কাজ চলছে। তবে সে জন্য চলতি মাসে বড় ধরনের সংকট হওয়ার আশঙ্কা নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেবিনেট সেক্রেটারিকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যাতে দেশের প্রতিটি জেলায় এলপিজি’র দাম তদারকিতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়।