Dr-Raihan Lam (ডঃ এম.এল. রায়হান)
এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও পোস্টডক্টরাল গবেষক, সোকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান
বাংলাদেশে আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে মাথায় রেখে গত এক বছরে বেশ কিছু জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যম তাদের পরিচালিত জরিপের ফলাফল প্রকাশ করেছে যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যানে দেশের অধিকাংশ মানুষ জানতে পেরেছেন। এগুলোতে জনগণের ভোটের প্রবণতা, রাজনৈতিক দলগুলোর জনপ্রিয়তা এবং ভোটার মনোভাব সম্পর্কে বিভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। মোটা দাগে এসব জরিপের ফলাফলগুলো নিম্নরুপঃ
১. সাম্প্রতিক প্রকাশিত ই.এ.এস.ডি জরিপ যেখানে দেখা যায় যে বিএনপিকে ৭০%, জামায়াতে ইসলামীকে ১৯% এবং এনসিপিকে ২.৬% মানুষ ভোট দিবেন। এই জরিপে অংশ নিয়েছে ২০,৪৯৫ জন।
২. ডিসেম্বর ২০২৫ এ জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো প্রকাশিত জরিপ (কিমেকারস কনসাল্টিং লিমিটেড দ্বারা পরিচালিত) যেখানে বিএনপি ৬৬%, জামায়াতে ইসলামী- ২৬% মানুষের ভোট পাবেন বলে জরিপে অংশগ্রহনকারীগণ মত প্রকাশ করেন। এই জরিপে অংশ নিয়েছেন মাত্র ১,৩৪২ জন।
৩. আই.আর.আই জরিপ যেখানে বিএনপিকে ৩৩%, জামায়াতে ইসলামীকে ২৯%, এবং এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলনকে ৬% মানুষ ভোট দিবেন বলে মত আসে। এই জরিপে অংশ নেয় ৪,৯৮৫ জন। এই জরিপটির ফলাফলও ডিসেম্বর ২০২৫ এ প্রকাশিত হয়েছিল।
৪. মার্চ ২০২৫ এবং দ্বিতীয়বার ফলো-আপ জরিপ সেপ্টেম্বর ২০২৫ এ প্রকাশিত ইনোভিশন কনসাল্টিং কর্তৃক জরিপে প্রকাশ পায় যে বিএনপিকে ৪১.৩%, জামায়াতে ইসলামীকে ৩০.৩% এবং এনসিপিকে ৪.১% উত্তরদাতা ভোট দিবেন। এই জরিপে অংশ নেয় ১০,৪১৩ জন।
গবেষণায় একটা কথা প্রচলিত আছে যে, "your result doesn't matter but your methodology does" অর্থাৎ গবেষণা বা জরিপে ফলাফলের চাইতেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে যে সেটা কিভাবে করা হয়েছে। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে চিন্তা করলে মোটা দাগে বাংলাদেশে পরিচালিত দুটি জরিপেরই গ্রহণযোগ্যতা এবং জেনারালাইজিবিলিটি নিয়ে সিরিয়াস প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট সুযোগ আছে যা ভিন্ন আলোচনা তথাপিও এসব জরিপের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। প্রতিটি জরিপেরই কিছু সীমাবদ্ধতা আছে তারপরও জাতীয় নির্বাচন সম্পর্কে একটা মোটামুটি ধারণা পাওয়ার জন্য জরিপগুলো কার্যকরী।
এবার আসুন এই নির্বাচনকে সামনে নিয়ে সবচেয়ে বৃহৎ, স্বচ্ছ, বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং ভীষণ তাৎপর্যপূর্ণ জরিপের ফলাফলটা আপনাদের সাথে শেয়ার করি। এই জরিপগুলো করা হয়েছে গত বছরের স্পেটেম্বর থেকে এই বছরের জানুয়ারি মাসের ৬ তারিখ পর্যন্ত পাঁচটি ধাপে। এখানে অংশগ্রহণ করেছে মোটামুটি ৮৭ হাজার জন। জরিপে অংশ নেয়া ব্যক্তিগণ বাংলাদেশের সকল জেলা তো বটেই সকল উপজেলাকেও প্রতিনিধিত্ব করে। জরিপে অংশ নেয়াদের মধ্যে পুরুষ এবং নারীর অনুপাত মোটামুটি ৫৫:৪৫ এবং যাদের বয়স মোটামুটি ১৮ থেকে ২৮ এর মধ্যে অর্থাৎ যারা টিপিক্যালি জেন-জি প্রজন্মের। জরিপে অংশ নেয়া সকলেই শিক্ষিত, রাজনৈতিকভাবে সচেতন এমনটা ধরে নেয়া যেতে পারে কারণ তাদের সকলেই দেশের প্রতিষ্ঠিত পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রী। উপরন্তু দেশে ২০২৪ এর জুলাইতে ছাত্র জনতার যে ঐতিহাসিক, অভূতপূর্ব এবং রক্তাত্ব গণঅভ্যুথান সংগঠিত হয়েছিল সেখানে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিল এই সকল তরুণরাই। জ্বি, আপনি ঠিক ধরেছেন। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং সর্বশেষ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক সময়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোর কথাই বলছি।
মোট শিক্ষার্থী হিসেবে করলে দেখা যায় যে এখানে ডাকসু নির্বাচনে প্রায় ৩০,০০০ জন, জাকসু নির্বাচনে প্রায় ৮,০০০ জন, রাকসু নির্বাচনে প্রায় ২০,০০০ জন, চাকসু নির্বাচনে প্রায় ১৮,০০০ জন এবং সর্বশেষ গত পরশু অনুষ্ঠিত জকসু নির্বাচনে প্রায় ১১,০০০ জন অংশগ্রহণ করে। প্রচলিত অর্থে এগুলোকে ঠিক 'জরিপ' বলা যায়না তবে ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বৃহৎ অংশ যারা জীবনে প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিবে তাদের মনোভাব বোঝার জন্য অবশ্যই এসব ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফলাফলগুলো মারাত্মক তাৎপর্যপূর্ণ সেটা বলার অপেক্ষাই রাখেনা।
এই জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রায় এক চতুর্থাংশ ভোটার হচ্ছেন তারা যাদের বয়স ১৮ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে এবং এই সংখ্যাটা প্রায় তিন কোটি। এরাই জেনারেশন জেড। এদের মনোভাব মারাত্মক প্রভাব ফেলে বাকি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিশেষত যাদের বয়স পঁয়ত্রিশের নিচে এবং যারা এই গণঅভ্যুথানের পরে পরিবর্তনের প্রত্যাশা করেন এবং যাদের একটা বৃহৎ অংশ কখনোই সংসদ নির্বাচনে ভোটই দেয়ার সুযোগ পান নাই ফ্যাসিস্ট জামানায়। সেই সংখ্যাটাও প্রায় এক কোটির উপরে। এই তরুণদের চিন্তাধারা, রাজনৈতিক মনোভাব, প্রবণতা ইত্যাদির প্রভাব কেবল তাদের পরিবারগুলোর উপরে নয় বরং সামগ্রিকভাবে তাদের সমাজে এবং জনপদে পড়বে এটা বলার জন্য রকেট সাইন্টিস্ট হবার প্রয়োজন নেই।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিন পর ছাত্র সংসদ নির্বাচন ফিরে আসা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। ২০২৫ ও ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোতে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ আমাদের গণতান্ত্রিক চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক তা বলাই যায়। ডাকসু, জাকসু, রাকসু, চাকসু এবং সর্বশেষ জকসু নির্বাচনে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির–সম্পৃক্ত বা সমমনা প্যানেলগুলোর এক চেটিয়া ভূমিধ্বস বিজয় এবং প্রচন্ড শক্ত অবস্থান কেবল বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতিতে একটি স্পষ্ট ধারা নির্দেশ করেনা বরং এর গুরুত্ব ও প্রভাব সুদূরপ্রসারী এবং বহুমুখী যা জাতীয় রাজনীতির জন্য একটা স্পষ্ট দিক নির্দেশনা প্রদান করে। এই ধারাটি মূলত কর্তৃত্ববাদবিরোধী মনোভাব, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং নৈতিক রাজনীতির আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে দেখা যায়। শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে রাজনৈতিক প্রবণতা ও মতাদর্শগত স্রোত লক্ষ করা যাচ্ছে, তা ঐতিহাসিকভাবে ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জাতীয় রাজনীতির সংযোগের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ছাত্র সংসদ নির্বাচন বহুবার জাতীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ ইঙ্গিত বহন করেছে বিশেষত ১৯৯০ তে যখন দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ভূমিধ্বস বিজয় অর্জন করেছিল এবং যার ফলশ্রুতিতে বিএনপি অভাবনীয় বিজয় করেছিল স্বৈরাচার এরশাদ পতনের পরের নির্বাচনে ১৯৯১ সালে। সে বিবেচনায়, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ধর্মভিত্তিক কিন্তু নিয়মতান্ত্রিক ও কল্যানমুলক সাংগঠনিক রাজনীতির প্রতি শিক্ষার্থীদের সমর্থন আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক-রাজনৈতিক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হবে নিঃসন্দেহে। আমার বক্তব্য এবং মতামত কোনো যান্ত্রিক পূর্বাভাস নয়, বরং সমাজের তরুণ অংশের মানসিক প্রস্তুতি, মূল্যবোধ ও রাজনৈতিক প্রত্যাশার একটি প্রতিফলন—যা জাতীয় রাজনীতির গতিপথ বুঝতে সহায়ক হতে পারে।
(উপরের মতামত একজন একাডেমিশিয়ান হিসাবে লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত, তার সাথে কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন বা অন্য কেউই বা কিছুই জড়িত নয়। )