Image description
মাদকবিরোধী অভিযান নাকি তেল নিয়ন্ত্রণের কৌশল

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে যুক্তরাষ্ট্র অপহরণ করায় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চাঞ্চল্যকর নতুন অধ্যায় সৃষ্টি হয়েছে। সাম্প্রতিক ইতিহাসে এটি লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক হস্তক্ষেপ, যা ১৯৮৯ সালের পানামা অভিযানকে স্মরণ করিয়ে দেয়। তখনকার মতোই এবারও প্রশ্ন উঠেছে— কোন আইনি ভিত্তিতে কোনো আন্তর্জাতিক সম্মতি ছাড়াই এমন একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রে সামরিক অভিযান চালানো হলো?

এই অভিযানের বৈধতা নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। রাশিয়া, চীনসহ একাধিক দেশ এর বিরুদ্ধে সরব হয়েছে এবং একে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এই নজির ভবিষ্যতে আরও সংঘর্ষের পথ খুলে দিতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র প্রথমদিকে দাবি করে, এটি একটি মাদকবিরোধী অভিযান। তাদের অভিযোগ, মাদুরো সরকার আন্তর্জাতিক কোকেন বাণিজ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এবং তা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হচ্ছে; কিন্তু হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে এও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার শাসনভার গ্রহণ করেছে এবং ‘নিরাপদ, সঠিক ও বিবেচনাপূর্ণ’ রূপান্তরের মাধ্যমে নতুন শাসন কাঠামো তৈরি করা হবে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ভেনেজুয়েলাকে স্থিতিশীল ও শক্তিশালী প্রতিবেশী রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করাই যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য।’ ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘ভেনেজুয়েলাকে আমরা চালাব।’ তবে কীভাবে চালাবেন সেই ব্যাখ্যা তিনি দেননি।

কিন্তু অনেকের কাছেই এই বক্তব্য প্রশ্নবিদ্ধ মনে হয়েছে। ভেনেজুয়েলা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেল রিজার্ভের দেশ। প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল তেল মজুত রয়েছে দেশটির মাটির নিচে। এই তেল খাত বহুদিন ধরে জাতীয়করণ নীতির আওতায় থাকায় মার্কিন কোম্পানিগুলোর প্রবেশাধিকার সীমিত ছিল। কেবল শেভরন একটি বিশেষ ছাড় পেয়ে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এই সামরিক হস্তক্ষেপকে অনেকেই দেখছেন অর্থনৈতিক স্বার্থ, বিশেষ করে তেল নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনার বাস্তবায়ন হিসেবে।

অভিযানের অংশ হিসেবে মাদুরো ও তার স্ত্রীকে নিউইয়র্কের আদালতে তোলা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ‘নারকো-টেরোরিজম’, কোকেন আমদানির ষড়যন্ত্র ও অস্ত্র-সম্পৃক্ত অপরাধের অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। একই মামলায় অভিযুক্ত হয়েছেন মাদুরোর ছেলে, দেশটির কয়েকজন শীর্ষ মন্ত্রী এবং কুখ্যাত অপরাধী গোষ্ঠী ‘ত্রেন দে আরাগুয়ার’ নেতারা। যুক্তরাষ্ট্র এসব অভিযোগের ভিত্তিতে তাদের বিচার চালিয়ে যাচ্ছে, যদিও ভেনেজুয়েলাসহ অনেক দেশ একে ‘রাজনৈতিক অপহরণ’ বলেই মনে করছে।

মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মাদক-সন্ত্রাসবাদ মামলায় নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। তিনি বিচারককে বলেছেন, ‘আমি আমার দেশের প্রেসিডেন্ট।’ তিনি আরও বলেন, তাকে ধরে নিয়ে আসা হয়েছে।

মাদুরোর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসও আদালতে মাদক সম্পর্কিত অভিযোগ থেকে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন।

মাদুরোর মামলার বিচারক অ্যালভিন হেলারস্টাইন তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো পড়ে শোনানোর পর তার বক্তব্য জানতে চান। তখন মাদুরো বলেন, ‘আমি নির্দোষ। এখানে যে অভিযোগগুলোর কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর কোনোটি আমি করিনি।’

শুনানি নিয়ে আদালত আগামী ১৭ মার্চ মাদুরোর পরবর্তী হাজিরার দিন ধার্য করেন। বিচারক অ্যালভিন হেলারস্টাইন এ নির্দেশ দিয়েছেন। গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ম্যানহাটনের আদালতে তাদের হাজির করা হয়।

মাদুরোকে অপহরণের বিষয়ে জাতিসংঘে নিযুক্ত ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রদূত স্যামুয়েল মনকাদা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র অবৈধভাবে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে অপহরণ করেছে। গতকাল জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে দেওয়া বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন।

ভেনেজুয়েলায় হামলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান না জানিয়ে ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে তিনি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

গতকাল জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক বৈঠকে গুতেরেসের বিবৃতি পড়ে শোনানো হয়। এতে গুতেরেস জোর দিয়ে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার ভিত্তি’ হলো আন্তর্জাতিক আইন।

মাদুরোর অনুপস্থিতিতে দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে তাকে স্বীকৃতি না দিলেও পরোক্ষভাবে পর্যবেক্ষণ করছে তার পদক্ষেপ। ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ‘যদি দেলসি সঠিক কাজ না করেন, তার পরিণতি মাদুরোর চেয়ে ভয়াবহ হবে।’ এই মন্তব্য ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভয় ও অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানির ওপর সামরিক বাধা বজায় রেখেছে। দেশটির চারপাশে সমুদ্রপথে মার্কিন নৌবাহিনী টহল দিচ্ছে। এই সামরিক ‘অবরোধ’ বা ‘কোয়ারেন্টাইন’ নীতির মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন চাইছে, ভেনেজুয়েলা যেন তাদের তেল খাত উন্মুক্ত করে মার্কিন বিনিয়োগের জন্য, এবং পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে।

এ ঘটনার আন্তর্জাতিক প্রভাবও গুরুতর। চীন, রাশিয়া এবং ইরান—তিনটি বড় শক্তিই এই অভিযানের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। চীন ও রাশিয়ার ভেনেজুয়েলায় বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ রয়েছে। তারা আশঙ্কা করছে, মাদুরো সরকারের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র ঘনিষ্ঠ প্রশাসন গঠিত হলে সেই বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক প্রভাব বিপন্ন হবে। ইরানও পরিস্থিতিকে নজরদারিতে রেখেছে, কারণ লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় আঞ্চলিক টানাপড়েন বাড়তে পারে।

অন্যদিকে, মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে অবস্থিত কারাগারে মাদুরো ও তার স্ত্রীকে কঠোর নিরাপত্তায় রাখা হয়েছে। প্রতিদিন মাত্র এক ঘণ্টা স্নান ও ব্যায়ামের সুযোগ, ২৩ ঘণ্টা আলাদা সেলে বন্দিত্ব—এই ধরনের বন্দি ব্যবস্থাকে অনেকে ‘মানবাধিকারের লঙ্ঘন’ বলেই মনে করছেন। অতীতে এই কারাগারে বহু বন্দির উপর মানসিক ও শারীরিক নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছিল।

এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে, তা সহজে প্রশমিত হবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি একটি দেশের সরকারকে অপসারণ করে নিজের প্রশাসনিক কাঠামো চাপিয়ে দেওয়ার যে রূপরেখা প্রকাশ করেছে, তা কেবল ভেনেজুয়েলাই নয়, গোটা লাতিন আমেরিকা ও বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের জন্যও এক ধরনের সতর্কবার্তা। এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে কিঞ্চিৎ সমালোচনা হলেও বড় কোনো বিরোধের মুখে ট্রাম্পকে এখনো পড়তে হয়নি।

অন্যদিকে ট্রাম্প আগে থেকেই গ্রিনল্যান্ড দখলের পাঁয়তারা করে আসছেন। ভেনেজুয়েলার ঘটনায় উদ্বেগ বেড়েছে দেশটিতে। দক্ষিণ কোরিয়াও সতর্ক অবস্থায় রয়েছে বলে জানিয়েছে। ট্রাম্পে এই কাণ্ডকে ইসরায়েল উচ্চকণ্ঠে অভিনন্দন জানিয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হবরা আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ। পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশ। কিন্তু ট্রাম্প থামবেন এমন কোনো লক্ষণ তার বক্তব্যে দেখা যায় না।