Image description

সরকার এ বছর পেপার ও প্যাকেজিং পণ্যকে বর্ষপণ্য ঘোষণা করেছে। এ খাতের উন্নয়নে বিভিন্ন ধরনের নীতিসহায়তা ও প্রণোদনা দেওয়ার চিন্তা করছে সরকার। পেপার ও প্যাকেজিং পণ্যের উন্নয়নে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মেলায় এ খাতের প্রচার-প্রচারণা চালানো হবে। সম্ভাবনা ও প্রতিবন্ধকতা নিয়ে থাকবে সভা-সেমিনারের আয়োজনও।

এ খাতে ঠিক কী কী ধরনের নীতিসহায়তা ও সুযোগ সুবিধা দেওয়া যায়- তা নিয়ে সরকার ও খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বর্ষপণ্য ঘোষণা করায় এ খাতের উদ্যোক্তারাও নতুন স্বপ্ন বুনছেন।

 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, এ খাতকে কী কী নীতিসহায়তা ও সুযোগ সুবিধা দেওয়া যায় সেটি নিয়ে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। রপ্তানি বাড়াতে এ পণ্যে রপ্তানি প্রণোদনা দেওয়া হবে। এছাড়া উৎপাদন বাড়াতে উৎপাদন সহায়তা দেবো। প্রচার-প্রচারণাও এক ধরনের নীতিসহায়তা। খাতটি নিয়ে যত বেশি আলোচনা হবে সেটি এ খাতের জন্য ততটাই সুফল বয়ে আনবে।

এ প্রসঙ্গে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ হাসান আরিফ জাগো নিউজকে বলেন, কী ধরনের নীতিসহায়তা দেওয়া হবে এখনো সেটি ঠিক করা হয়নি। দেশে-বিদেশে আসন্ন যেসব মেলা রয়েছে, সেখানে আমরা পেপার ও প্যাকেজিং পণ্য প্রমোট করবো। এর সম্ভাবনা সংক্রান্ত বিভিন্ন সেমিনারের আয়োজন করবো। এ খাতের উদ্যোক্তা যারা রয়েছেন, তাদের সক্ষমতা যাতে দেশের বাইরে তুলে ধরতে পারেন, সেই সংক্রান্ত মেলায় অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করবো। ইপিবির পক্ষ থেকে এসব উদ্যোগ নেওয়া হবে। সরকারের পক্ষ থেকে এ খাতের জন্য যেসব নীতিসহায়তা দরকার, সরকার সেটি বিবেচনা করবে।

শনিবার (৩ জানুয়ারি) রাজধানীর পূর্বাচলে বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টারে (বিগ ওয়েভ) ৩০তম ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পেপার ও প্যাকেজিং পণ্যকে বর্ষপণ্য হিসেবে ঘোষণা দেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন।

বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, রপ্তানি প্রসার ও প্রণোদনামূলক কর্মকাণ্ড বেগবান করতে প্রতি বছর একটি পণ্যকে ‘প্রডাক্ট অব দ্য ইয়ার’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘোষিত পণ্যের উৎপাদন, বিপণনকে উৎসাহিতকরণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এবার পেপার এবং প্যাকেজিং প্রোডাক্টকে ২০২৬ সালের ‘প্রোডাক্ট অব দ্য ইয়ার’ হিসেবে ঘোষণা করছি।

ক্রেতা-ভোক্তাদের খাদ্য ও নিত্যব্যবহার্য ভোগ্যপণ্য পাকেজিং শিল্পের মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ফ্লেক্সিবল প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন (বিএফপিআইএ)। সংগঠনটির সদস্য শতাধিক। অর্থাৎ ক্রেতা-ভোক্তাদের খাদ্য ও নিত্যব্যবহার্য ভোগ্যপণ্য প্যাকেজিং শিল্পে শতাধিক প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানি রয়েছে।

সংগঠনটি বলছে, প্যাকেজিং শিল্পের বাজার ছয় হাজার কোটি টাকারও বেশি। খাতটিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৫০ হাজার কর্মসংস্থান রয়েছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ফ্লেক্সিবল প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাফিউস সামি আলমগীর জাগো নিউজকে বলেন, পেপার ও প্যাকেজিং শিল্পকে বর্ষপণ্য ঘোষণা করা হোক- সেটি নিয়ে তিন-চার মাস ধরেই আমরা কাজ করছিলাম। সরকার এখন এই পণ্যকে বর্ষপণ্য ঘোষণা করেছে। আমাদের এ খাতের অনেক সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে। খাতটি বেশ বড়। যেহেতু এটি একটি ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প, সেজন্য এটি নজরে কম আসে।

 

সাফিউস সামি আরও বলেন, কিন্তু বিশ্বে প্যাকেজিং সেক্টর অনেক বড় একটি খাত। যেখানে আমরা কিছু কিছু রপ্তানি করছি, তবে সেই তুলনায় নয়। স্থানীয়ভাবে আমরা যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করছি তাদের নীতিসহায়তা প্রয়োজন। আমরা আশা করছি এ বছর এ খাতে আমরা বিভিন্ন নীতিসহায়তা পাবো। এ খাত আরও এগিয়ে যাবে। পণ্যটি দেশের বাইরে কতটা প্রসার ঘটানো যায় ও রপ্তানিতে অবদান রাখতে পারি, সে লক্ষ্যে নানান পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

জাগো নিউজের এক প্রশ্নের উত্তরে বিএফপিআইএর সভাপতি আরও বলেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা পরোক্ষভাবে রপ্তানির সঙ্গে জড়িত। দেশের বাইরে যারা পণ্য রপ্তানি করছে, সেটি যে পণ্যই হোক; সেটি কিন্তু প্যাকেজিং হয়েই যাচ্ছে। আমাদের কাজ বিভিন্ন কোম্পানি প্যাকেজিংয়ের উপকরণ নিয়েই। আবার দেশের বাইরে যে কোনো পণ্য রপ্তানি করতে প্যাকেজিং ও কার্টন করতে হচ্ছে। সেটিও প্যাকেজিং শিল্পের অংশ। ফলে রপ্তানিতেও এ শিল্পের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।

এদিকে, দেশের গার্মেন্টস শিল্পের প্যাকেজিং খাতের সঙ্গে জড়িত বাংলাদেশ গার্মেন্টস এক্সেসরিজ অ্যান্ড প্যাকেজিং ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএপিএমইএ)। পেপার ও প্যাকেজিং শিল্পকে সরকারের বর্ষপণ্য ঘোষণাকে তাৎক্ষণিক স্বাগত জানিয়েছে সংগঠনটি। সরকারের এ ঘোষণা দেশের পেপার ও প্যাকেজিং শিল্পের জন্য একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক বলে আখ্যা দিয়েছে সংগঠনটি।

জানতে চাইলে বিজিএপিএমইএর সভাপতি মো. শাহরিয়ার জাগো নিউজকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে এটি নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করছিলাম। এটি একটি উদীয়মান খাত। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় প্যাকেজিংয়ের চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশ এ খাতে অনেক দূরে রয়েছে। নীতিসহায়তার অভাবে আমরা বিশ্ববাজারে সেভাবে প্রবেশ করতে পারছি না।’

শাহরিয়ার আরও বলেন, ব্লুমবার্গের তথ্যানুযায়ী বিশ্বে প্যাকেজিং পণ্যের ৭০০ বিলিয়ন ডলারের চাহিদা রয়েছে। বর্ষপণ্য ঘোষণা করায় এ খাতের কী কী সমস্যা রয়েছে তা নিয়ে বসে চিহ্নিত করা যাবে ও রপ্তানি কীভাবে বাড়ানো যায়, সেটির বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া যাবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একটি সেলের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট নীতি জারি করতে পারবে।

তিনি বলেন, ব্যাক টু ব্যাকে আমরা দেশে আট বিলিয়ন ডলারের প্যাকেজিং পণ্য রপ্তানি করি। ডিরেক্ট রপ্তানি করি এক দশমিক ছয় বিলিয়ন ডলারের পণ্য। বর্ষপণ্য ঘোষণার এই উদ্যোগ এ খাতের জন্য খুবই ইতিবাচক।

প্রতিবন্ধকতার বিষয়ে জানতে চাইলে বিজিএপিএমইএ সভাপতি বলেন, এ খাতের জন্য প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে এনবিআরের নীতিসহায়তা। ৩০০ জিএসএমের নিচে কোনো পণ্য নিয়ে আসতে পারি না। প্যাকেজিংয়ের জন্য লোয়ার জিএসএমের পণ্য প্রয়োজন। সেটি এনবিআর দিচ্ছে না। এর বাইরেও এনবিআরের বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। উচ্চ ব্যাংকিং সুদের হার ও এ খাতে কোনো স্পেশালিস্ট নেই। স্পেশালিস্ট তৈরি করতে প্যাকেজিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা আমাদের দাবি। সঠিক নীতিসহায়তা পেলে আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে ৫ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য সরাসরি রপ্তানি করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএমএ) সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, পেপার ও প্যাকেজিং পণ্যকে বর্ষপণ্য ঘোষণা করা হলেও সরকার পেপার মিল অ্যাসোসিয়েশনের নেতাদের সঙ্গে বসেনি। এমনকি রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো আয়োজিত বাণিজ্যমেলার ওই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও আমাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।

 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, সরকার সংশ্লিষ্টরা তাদের জানিয়েছেন এ খাতকে এগিয়ে নিতে পরবর্তী বৈঠকে তাদের সঙ্গে বসা হবে। এ খাতের সমস্যা, সম্ভাবনা ও প্রতিবন্ধকতা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জানতে চাইবে সরকার।