Image description

ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালে ৫ আগস্ট ফ্যাসিবাদী শাসন থেকে দেশবাসী মুক্ত হয়েছে। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ অপশাসনের অবসানের পর গণতন্ত্রের পথে যাত্রা করেছে দেশ। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনীতিতে চলছে নানা সমীকরণ। এতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের নিয়ে গঠিত নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যাত্রা শুরুর পর বছরজুড়ে নানা কারণে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দলটি। দলটির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ দাঁড়িয়েছে ‘পদত্যাগ ইস্যু’। দল থেকে শীর্ষ নেতাদের পদত্যাগ থামছে না; সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা দীর্ঘ হচ্ছে। বিষয়টিকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ের গবেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এনসিপি নাম নিয়ে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করা হয়েছিল। অনেক প্রতিশ্রুতি আর আদর্শিক বার্তা দিয়ে গঠিত এনসিপি এখন বিধ্বস্তের পথে।

 

‘দলটির জামায়াতের সঙ্গে জোট তরুণ শীর্ষ নেতাদের অনেকেই মেনে নিতে পারেননি’ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, প্রায় প্রতিদিন দল থেকে পদত্যাগের ঘোষণা আসছে। এতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, দলটি রাজনীতির বিশুদ্ধতা হারাচ্ছে। দলটি শুরু থেকেই একের পর এক ভুল করে আসছে। এখন চরমভাবে ভুলের খেসারত দিচ্ছে দলটি। এতে জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাও ম্লান হচ্ছে। এটি মূলত জাতীয় ক্ষতি হচ্ছে। একটি রাজনৈতিক দল দাঁড়ানোর আগেই ভেঙে যাচ্ছে। নিশ্চয়ই এমন পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন দলের হাইকমান্ডও।

জামায়াতের সঙ্গে জোট করে এনসিপি তাদের কফিনে শেষ পেরেক মেরেছে উল্লেখ করে আলতাফ পারভেজ আরও বলেন, জামায়াতের সঙ্গে জোট করা হবে-এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দলের ভেতরে গণতান্ত্রিক চর্চা করা হয়নি। সবার মতামতকে নিশ্চয় উপেক্ষা করা হয়েছে। যে কারণে নতুন এ দলটির ভেতরে বিপুল হারে পদত্যাগ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হচ্ছে। তারা গণতন্ত্রের কথা বলে; কিন্তু নিজেরাই দলের ভেতর গণতন্ত্রের চর্চা করেনি। 

তিনি বলেন, দলটির একটি অংশ নীতি-নৈতিকভাবে কলুষিত হয়ে পড়েছে। ফলে তারা দুই কারণে একটি বড় দলের সঙ্গে থাকতে চাচ্ছে। বিএনপির সঙ্গে বোঝাপড়া না হওয়ায় তারা মনে করেছে জামায়াত দ্বিতীয় বড় দল। সে কারণে জামায়াতের সঙ্গেই মিলিত হয়েছে। বড় দলের সঙ্গে থাকা মানে, ভবিষ্যতে যেন অনিয়ম-দুর্নীতি থেকে রেহাই পাওয়া যায় এবং নিরাপত্তা পাওয়া যায়। এনসিপির দরকার ছিল নিজের পায়ে দাঁড়ানো। এদের নিজের পায়ে দাঁড়ানো আর সম্ভব হয়ে উঠবে না। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে টিকিয়ে রাখতে হলে অন্য তরুণদের এখনই একত্রিত হওয়া দরকার।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গড়া এনসিপি এখন প্রায় নিষ্ক্রিয়। এনসিপি প্রথম থেকেই অনেক ভুল করে আসছিল। ক্ষমতার লোভ ছিল শুরুতেই। তাছাড়া এ দলের অনেক নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে। একই সঙ্গে দলের শীর্ষ নেতারা দলীয় মনোনয়ন বাণিজ্যেও জড়িত রয়েছে-এমন অভিযোগও আসছে। 

তিনি বলেন, এনসিপির তরুণ নেতারা যদি পুরোনো বন্দোবস্তের দিকে হাঁটেন, অনিয়ম-দুর্নীতি আর মনোনয়ন বাণিজ্য করেন, তাহলে তাদের দিয়ে কী হবে? 

এনসিপির ভেতরে গণতন্ত্রচর্চা থাকবে না কেন-এমন প্রশ্ন করে তিনি বলেন, দলের মধ্য থেকে যারা বলছে জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনি জোট কিংবা সখ্য হবে, এমনটা বাস্তবায়ন করতে দলের সবার মতামত নেওয়া হয়নি। নতুন ছোট্ট একটা দল, সেখানেও যদি গণতন্ত্রের চর্চা না হয়, সবার মতামতকে প্রাধান্য না দেওয়া হয়, তাহলে এটি রাজনৈতিক দল হয়ে উঠে কী করে? নানা কারণেই দলটির কোনো ভবিষ্যৎ দেখছি না। এ দলটি পার্টি হিসাবে দাঁড়াতে পারবে না। সবার আগে তাদের প্রমাণ করতে হতো দলের নেতাদের সততা, নিষ্ঠা আর গণতন্ত্রের চর্চা। এমনটা যারা প্রমাণ করতে না পারে, তাদের পরাজয় নিশ্চিত।

লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ উর রহমান বলেন, এনসিপির ভেতর গণতন্ত্রের চর্চা ছিল না, এটা বলা যাবে না। গণতন্ত্রচর্চা ছিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়। একটি রাজনৈতিক দল কতগুলো ফান্ডামেন্টালের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। সেই ফান্ডামেন্টাল ভেঙে কেউ এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে কিনা, সে বিষয় নিয়ে প্রশ্ন আসতেই পারে। এনসিপি যখন মধ্যপন্থি দল হিসাবে দলটির চরিত্র নির্ধারণ করতে চায়, তখন কারো সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে মধ্যপন্থি দলটির বিপরীতে ধর্মীয় দলগুলোর জোটে যাওয়া হয়েছে। যেখানে শুধু জামায়াতে ইসলামী নয়, আরও কট্টর ধর্মীয় দল আছে। সেই জোটে যাওয়া এবং সেখানে যে ধরনের আসন সমঝোতা, তা নিয়ে দলের ভেতর ভাঙন শুরু হয়েছে।

দলটির একটি বড় অংশ মনে করছে, এই সিদ্ধান্ত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থি।

জাহেদ উর রহমান আরও বলেন, দলটির ভেতর আদর্শিক মতানৈক্য দেখা দিয়েছে। দলটি এখন ডানপন্থি শক্তিতে পরিণত হয়েছে। এর আগে নিজের শক্তিতেই ক্ষমতার সর্বোচ্চ আসনে বসতে চেয়েছিলেন নেতারা। এখন জোট শক্তির মধ্য দিয়েই দলের শীর্ষ নেতারা দ্রুত সময়ের মধ্যে ক্ষমতা চাচ্ছেন। সংসদে যেতে চাচ্ছেন। অনেকে লিখছেন, এবারই কেন তাদের ক্ষমতায় যেতে হবে, এবারই কেন সংসদে যেতে হবে? যে কোনো মূল্যে শীর্ষ নেতাদের ক্ষমতার যাওয়ার মতো লড়াই আমরা দেখতে পাচ্ছি। এনসিপি বর্তমানে যে বিপর্যয়ের মধ্য দিচ্ছে যাচ্ছে, নির্বাচনের পর তা আরও চরম আকার ধারণ করবে। যদি দেখা যায়, তারা এত কিছুর পরও খুব বেশি ভালো কিছু করেনি, কোনো আসনে জয়ী হতে পারেনি, তখন যারা এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাদের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করা হবে। দলটির ভেতর নারী নেতৃত্ব ছিল উল্লেখযোগ্য। এখন সেই নেতৃত্ব শেষ হয়ে যাচ্ছে। অথচ জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এবং এনসিপিতে নারীরাই সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ছিলেন।