Image description

ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত স্বজাতির মধ্যেও লুটপাট চালিয়েছেন। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন উপাসনালয় ও দানের সম্পদ দেখভালকারী ঐতিহ্যবাহী সীতাকুণ্ড শ্রাইন কমিটি কবজায় নিয়ে আত্মসাৎ করেন কোটি কোটি টাকা। এ কাজে তাকে সহায়তা করেন আরো দুই সাংবাদিক। তাদের অপকর্মে চরম ক্ষুব্ধ হিন্দু সম্প্রদায়ের স্থানীয় মানুষেরা।

বিভিন্ন নথি বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় হিন্দুদের স্মৃতিবিজড়িত স্থান, সম্পত্তি, ধাম ও মন্দির আছে। এসব স্থাপনা ও সম্পদ দেখভাল করার জন্য ১৯১১ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের অর্ডিন্যান্স অনুসারে গঠন করা হয় সীতাকুণ্ড শ্রাইন কমিটি। ওই সময় একটি গঠনতন্ত্র বা স্কিমও গঠন করে দেওয়া হয়। স্বাধীনতার পর থেকে এটি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আদেশ অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছিল। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় হিন্দু নেতাদের দিয়ে একটি কমিটি করে তা জেলা প্রশাসক ও জজের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়। এ কমিটি মূলত সীতাকুণ্ড, ফটিকছড়ি ও কক্সবাজারের মহেশখালীতে থাকা শত শত একর জমি ও মঠ-মন্দির, আশ্রম রক্ষণাবেক্ষণ করে।

শ্রাইনের দায়িত্বে ছিলেন সভাপতি হিসেবে সাধনময় ভট্টাচার্য ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সুখময় চক্রবর্তী। তারা দুজন ৩২ ধরে বছর এ কমিটি পরিচালনা করছিলেন। তবে তারা নিজেরা দ্বন্দ্বে জড়িয়ে যাওয়ায় শ্রাইনের কাজে স্থবিরতা দেখা দেয়।

২০২৩ সালের শুরুর দিকে সীতাকুণ্ড শ্রাইনের শত শত কোটি টাকার সম্পত্তির ওপর কুনজর পড়েছিল হিন্দুদের বিতর্কিত উগ্রবাদী সংগঠন ইসকনের সঙ্গে জড়িত স্থানীয় দুই সাংবাদিক সৌমিত্র চক্রবর্তী ও কৃষ্ণ চন্দ্র দাশ এবং অ্যাডভোকেট চন্দন দাশের। তারা হিন্দুদের সম্পত্তি অবাধে ভোগ করতে ছক আঁকেন শ্রাইন কমিটি দখলের। পরিকল্পনা অনুযায়ী এ কাজে সিদ্ধহস্ত শ্যামল দত্তের শরণাপন্ন হন সৌমিত্র চক্রবর্তী ও কৃষ্ণ দাশ । তাদের কৌশলের কথা শুনে আগ্রহ দেখান শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদ কায়েমের অন্যতম সহযোগী ভোরের কাগজ সম্পাদক।

শ্রাইন কমিটি কবজা করতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে যান শ্যামল দত্ত। সরকারপ্রধানকে দিয়ে ফোন করান সীতাকুণ্ডের প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের। যেমন পরিকল্পনা তেমন কাজ, শুরু হয় কমিটি দখলের মূল তৎপরতা। শেখ হাসিনার নির্দেশে ওই সময় শ্যামল দত্তকে সহায়তা করেন ডামি নির্বাচনের সাবেক সংসদ সদস্য এসএম আল মামুন, জেলা ও দায়রা জজ আজিজ আহমেদ ভূঁইয়া এবং ডিসি আবুল বাশার মুহাম্মদ ফখরুজ্জামান। তারা বিতর্কিত ও অগ্রহণযোগ্য ব্যক্তি এবং আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের দিয়ে কমিটি ঢেলে সাজান।

শ্রাইনের বিতর্কিত কমিটি গঠন

গত বছরের ১৪ জানুয়ারি শ্যামল দত্ত সভাপতি ও চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি চন্দন দাশকে সাধারণ সম্পাদক করে সীতাকুণ্ড শ্রাইন কমিটি গঠন করা হয়। এতে সিনিয়র অপূর্ব ভট্টাচার্য ও তাপস রক্ষিতকে সহসভাপতি, প্রণব কুমার দে ও সৌমিত্র চক্রবর্তীকে সহসম্পাদক এবং কৃষ্ণ দাশকে করা হয় সদস্য। এ কমিটি গঠনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন চট্টগ্রাম প্রথম আদালতের যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ খায়রুল আমিন। এছাড়া দুই সিনিয়র সহকারী জজ (সিনিয়র সহকারী জজ চট্টগ্রাম ও সিনিয়র সহকারী জজ কক্সবাজার) (শ্রাইনের সদস্য) এতে নির্বাচন কমিশনার ছিলেন।

কমিটিতে নতুন করে পদ নেওয়া সাংবাদিক কৃষ্ণ দাশ এলাকায় বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যাপকভাবে নিন্দিত হন। তবে সম্প্রতি ভারতীয়রা প্রশ্রাব করলেও বাংলাদেশ বন্যায় ভেসে যাবে বলে মন্তব্য করে সমালোচনার ঝড় তোলেন তিনি।

এছাড়া সাংবাদিক সৌমিত্রের বাবা-মা কলকাতায় থাকেন। তিনি জন্মস্থান হিসেবে মিরসরাই দাবি করলেও পড়াশোনা করেছেন কলকাতায়। মিরসরাইয়ে বাড়ি থাকার কথা বললেও সেখানে কেউ থাকেন না। তিনি সীতাকুণ্ড সদরের বড় বাজার এলাকায় শ্রাইনের কয়েক কোটি টাকার জায়গা দখল করে আলিশান বাড়ি (বহুতল ভবন) নির্মাণ করেছেন।

শ্রাইন সূত্র জানায়, সাধারণ সম্পাদক চন্দন দাশ অ্যাডভোকেট আলিফ হত্যার ঘটনায় আদালত এলাকায় ভাঙচুরের ঘটনায় দায়ের করা মামলার ৭৮ নম্বর আসামি। যুগ্ম-সম্পাদক প্রণব কুমার দে মহেশখালীর সাবেক প্যানেল মেয়র এবং বহু মামলার পলাতক আসামি, আওয়ামী লীগ নেতা ও রাউজানের সাবেক প্যানেল মেয়র অ্যাডভোকেট সমির দাশও পলাতক আছেন। শুধু তাই নয়, আলিফ হত্যার আসামি ইসকনের চিন্ময় কৃষ্ণ দাশের প্রধান আইনজীবী অপূর্ব ভট্টাচার্য, মিরসরাই উপজেলায় আওয়ামী লীগ থেকে ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করা উত্তম শর্মাও পলাতক। তিনি জালিয়াতি করে বাংলাদেশ সেবাশ্রম নামে একটি সংগঠনের ভুয়া প্যাড দিয়ে শ্রাইন কমিটিতে ঢোকেন। আদতে ওই নামে কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশ সেবাশ্রম, তথা ভারত সেবাশ্রমে নেই।

কমিটির সদস্য অশোক চৌধুরী লিংকনও আওয়ামী লীগ নেতা এবং তিনি তীর্থ উন্নয়ন কমিটির নামে ভুয়া প্যাডে সদস্য হন। চসিকের কাউন্সিলর পুলক খাস্তগীর কমিটির সদস্য হলেও জুলাইয়ে ছাত্রহত্যা মামলায় আসামি হিসেবে এখন পলাতক আছেন। অ্যাডভোকেট রাজিব দাশকে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রতিনিধি হিসেবে সদস‍্য করা হয়। তাকে অত‍্যন্ত গোপনে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে কমিটিতে নেওয়া হয় বলে জানা গেছে। তবে কমিটির সহসম্পাদক সাংবাদিক সুব্রত চক্রবর্তী প্রকাশ সৌমিত্র চক্রবর্তী ও সদস্য কৃষ্ণ দাশ এখনো সাংবাদিক পরিচয়ে দোর্দণ্ড প্রতাপের সঙ্গে এলাকা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন।

অ্যাডভোকেট সুখময় চক্রবর্তী আমার দেশকে বলেন, শেখ হাসিনার প্রভাব দেখিয়ে শ্রাইন কমিটি দখল করেন শ্যামল দত্ত। শ্রাইনের নামে কৃষি ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকে জমানো তিন কোটি টাকার বেশি তুলে আত্মসাৎ করেছে এই কমিটি। সীতাকুণ্ডের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের জন্য অধিগ্রহণ করা জায়গার জন্য আরো এক কোটি ৯৫ লাখ টাকা দিয়েছিল সরকার। সে অর্থও হজম করেছে কমিটি। সীতাকুণ্ডের আস্তানবাড়ী এলাকায় শ্রাইনের ১৮ লাখ টাকার গাছ বিক্রি করলেও সে অর্থের কোনো হিসাব নেই। সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ ধামে প্রতিবছর শিব চতুর্দশী মেলায় দেশ-বিদেশের লাখ লাখ ভক্ত-পুণ্যার্থীর সমাগম হয়। সেখানে অবস্থিত লোকনাথ মন্দির, সম্ভুনাথ মন্দির, ভোলাগিরি মন্দিরসহ শতাধিক মন্দির আছে। এসব ধর্মীয় উপাসনালয়ে প্রচুর অর্থদান করেন ভক্ত-পুণ্যার্থীরা। গত বছরের মেলা থেকে প্রায় ২০ লাখ টাকা আয় হয়েছিল এবং দান বাবদ আরো ৫০ লক্ষাধিক টাকা উঠেছিল, যার কোনো হিসাব নেই।

তিনি আরো বলেন, অযোগ্য ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের দিয়ে শ্রাইন কমিটি করা হয়েছিল। পুরো কমিটির মধ্যে মাত্র একজন সদস্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ডিন। এছাড়া সৌমিত্র চক্রবর্তী ও কৃষ্ণচন্দ্র দুজন ইসকনের লোক হয়েও শ্যামল দত্তের সুপারিশে শ্রাইন কমিটির সহসম্পাদক ও সদস্য হয়েছেন। স্থানীয় প্রভাবশালী পরিবারের দুজনকে সদস্য করার নিয়ম থাকলেও এক্ষেত্রে ব্যত্যয় ঘটেছে। কৃষ্ণ দাসের বাড়ি সন্দ্বীপ, সৌমিত্র চক্রবর্তীর বাড়ি মিরসরাই।

সীতাকুণ্ড মেলা কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক পলাশ চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, শ্রাইন কমিটির সভাপতি, সম্পাদকসহ সাতজন বিভিন্ন মামলার আসামি এবং অনেকেই পলাতক। সাংবাদিক সৌমিত্র চক্রবর্তী ও কৃষ্ণ দাশকে সীতাকুণ্ডের স্থায়ী বাসিন্দা না হলেও কমিটিতে পদ নিয়েছেন। শ্রাইন কমিটির স্কিম অনুযায়ী জন্মসূত্রেই সীতাকুণ্ডের বাসিন্দা হতে হবে।

শ্রাইন কমিটি সংশ্লিষ্ট শিমুল মন্ডল বলেন, শ্যামল দত্ত, সৌমিত্র, কৃষ্ণ, চন্দনরাই মুখ্য। অন্যরা তাদের হাতের পুতুল। ২২ জনের কমিটিতে প্রায় সবাই আওয়ামী লীগ ও বর্তমানে পলাতক আসামি। সীতাকুণ্ডের দত্ত বাড়ীতে শ্রাইনের কয়েক একর সম্পত্তি অ্যাডভোকেট তৃপ্তি দত্ত দখল করে রাখলেও চন্দনসহ সবাই মুখে কুলুপ এঁটেছেন। কারণ দখলকারী চন্দনের আত্মীয়।

শিক্ষক ও শ্রাইন সংশ্লিষ্ট প্রবীণ ব্যক্তিত্ব প্রবীর চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, কমিটিতে দুজনকে কো-অপ্ট সদস্য করা হয়। তারা সুপরিচিত হতে হবে দেশব্যাপী। কিন্তু স্কিম অনুযায়ী তারা গুরুত্বপূর্ণ পদে বসতে পারবেন না। তাদের একজন একেবারেই অপরিচিত মিরসরাইয়ের বাসিন্দা অনিল পাল আর অন্যজন শ্যামল দত্ত। তাদের মধ্যে শ্যামল দত্ত কো-অপ্ট সদস্য ছাড়াও সভাপতি হয়েছেন। তারা সবাই মিলে বেপরোয়া দুর্নীতি ও লুটপাট করছেন। এছাড়া এ কমিটিকে ইসকনের আঁতুড়ঘর বানানো হয়েছে। তাদের কারণে বাধ্য হয়ে অনেক হিন্দু ইসকনের সদস্য হচ্ছেন। বিশেষ করে সীতাকুণ্ডের ঘরে ঘরে নারী এখন ইসকনের দীক্ষা নিচ্ছেন।

সীতাকুণ্ড থানা পূজা কমিটি সভাপতি অমলেন্দু কনক আমার দেশকে বলেন, শ্রাইন কমিটির লুটপাট ও তাদের পালিয়ে বেড়ানোর কারণে এটি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। কোনো কার্যক্রম নেই বললেই চলে।

কমিটি দখল ও লুটপাটের অভিযোগের বিষয়ে শ্রাইন কমিটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট চন্দন দাশ বলেন, কমিটি গঠনে কোনো নিয়ম লঙ্ঘন হয়নি। সুখময় চক্রবর্তীসহ একটি চক্র শ্রাইন কমিটি এবং আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। তাদের পক্ষ থেকে যত অভিযোগ করেছে সবই মিথ্যা।

তবে দুই সাংবাদিককে বেআইনিভাবে সদস্য ও সহসম্পাদক করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এড়িয়ে যান। এ সময় তিনি শ্যামল দত্তের পক্ষে সাফাইও গান।

সাংবাদিক কৃষ্ণ দাশ বলেন, ‘আমার মা-বাবা সন্দ্বীপের অধিবাসী হলেও আমি সীতাকুণ্ডের স্থায়ী বাসিন্দা। সীতাকুণ্ড শ্রাইন কমিটির আমি একজন সদস্য হয়ে টাকা লুটপাটের বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেওয়ার এখতিয়ার আমার নেই। ভারতে প্রস্রাব করে দিলে বাংলাদেশে বন্যা হয়, এ ধরনের কোনো লেখাও আমি লিখিনি।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে সৌমিত্র চক্রবর্তীর মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।

বিতর্কিত শ্রাইন কমিটির বিষয়ে জানতে চাইলে- চট্টগ্রামের ডিসি ফরিদা খানম বলেন, এ কমিটি পাঁচ বছরের জন্য হয়। কেবল দুই বছর অতিবাহিত হয়েছে। এ বিষয়ে প্রশাসক হিসেবে ডিস্ট্রিক্ট জজ কাজ করেন। কমিটির ব্যাপারে বিস্তারিত তিনি বলতে পারবেন।

ডিস্ট্রিক্ট জজ নুরুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি দুদিন আগে বিচারপতি হয়েছেন। বর্তমানে শ্রাইন কমিটির দায়িত্বে আছেন ডিস্ট্রিক্ট জজ মোশারফ হোসাইন। ডিস্ট্রিক্ট জজ মোশারফ হোসাইনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি দুদিনের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত। এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। আমি এ বিষয়ের সম্পূর্ণ অজ্ঞ। দুদিন পর হারুন উর রশীদ ডিস্ট্রিক্ট জজ হিসেবে আসবেন, তার সঙ্গে কথা বলবেন।’

এভাবে একে অন্যের কথা বলে বিতর্কিত শ্রাইন কমিটির অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে বক্তব্য দিতে কেউ রাজি হচ্ছেন না।